যুবসমাজকে অজ্ঞদের বিভ্রান্তি, চরমপন্থিদের কঠোরতা, মিথ্যাবাদীদের জালিয়াতি আর জাহেলদের ভুল ব্যাখ্যা থেকে দূরে রাখার স্বার্থে কিছু বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি। এর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আল্লাহর নাজিল করা বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রশাসন সংক্রান্ত আয়াতগুলো। এগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা নির্ধারণ করাই এই প্রবন্ধের প্রধান উদ্দেশ্য।
এই প্রবন্ধে আমি ‘হাকিমিয়্যাহ’ (আল্লাহর সার্বভৌমত্ব) নিয়ে চারটি ধাপে আলোচনা করেছি:
এক. ‘হাকিমিয়্যাহ’ শব্দের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ।
দুই. আল্লাহ তাআলার ক্ষেত্রে ‘হুকুম’ (শাসন) শব্দের অর্থ।
তিন. মানুষের ক্ষেত্রে ‘হুকুম’ শব্দ প্রয়োগের বিধান।
চার. ‘হাকিমিয়্যাহ’ শব্দের ভুল ব্যাখ্যা ও তার খণ্ডন।
আল্লাহই সামর্থ্যদাতা ও সাহায্যকারী।
‘হাকিমিয়্যাহ’ শব্দের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
আভিধানিক অর্থ
‘হাকিমিয়্যাহ’ শব্দটি ‘হুকুম’ (حُكْمٌ) থেকে এসেছে, যার মূল ধাতু হলো (ح-ك-م)। এর প্রাথমিক অর্থ হলো: ‘মানা করা’ বা ‘নিষেধ করা’। ইবনু ফারিস বলেন: “ح , ك, م—এই তিনটি বর্ণ একটি মৌলিক অর্থ প্রকাশ করে, আর তা হলো—নিষেধ করা বা বাধা দেওয়া। ‘হুকুম’ মানে হচ্ছে জুলুম থেকে বিরত রাখা। পশুর মুখে যে দড়ি দেওয়া হয়, তাকে ‘হুকুম’ বলা হয়, কারণ তা তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আরবরা বলে: حكمتُ الدابةَ وأحكمتُها—অর্থাৎ, আমি পশুটিকে নিয়ন্ত্রণ করলাম ও সম্পূর্ণভাবে বাধা দিলাম। একইভাবে যখন কাউকে অপকর্ম থেকে হাতে ধরে বাধা দেওয়া হয়, তখন বলা হয়: حكمتُ السفيهَ وأحكمتُهُ—অর্থাৎ, আমি মূর্খ লোকটাকে নিয়ন্ত্রণ করলাম এবং তাকে সম্পূর্ণভাবে বিরত রাখলাম।”
‘হুকুম’ শব্দটির আরেকটি অর্থ হলো এলেম (জ্ঞান) ও হেকমত (প্রজ্ঞা)। আল্লাহ তাআলা বলেন: “وَآتَيْنَاهُ الْحُكْمَ صَبِيًّا—আমি তাকে শৈশবেই হেকমত দান করেছিলাম।” (সুরা মারইয়াম, আয়াত ১২)
আরও বলা হয়: ‘حكم له’ অর্থাৎ, তার পক্ষে রায় দিল, এবং ‘حكم عليه’ অর্থাৎ, তার বিরুদ্ধে রায় দিল। এখানে ‘হুকুম’ মানে বিচার, ফায়সালা বা সিদ্ধান্ত প্রদান।
এছাড়াও ‘হুকুম’ শব্দের মধ্যে একটি কারিগরি পরিপক্বতা বা নিখুঁত হওয়ার অর্থ আছে। যেমন বলা হয়: ‘أحكمتُ الشيءَ’—আমি বিষয়টিকে নিখুঁতভাবে গঠন করলাম; আর ‘استحكم’ মানে—সেটি পরিপূর্ণ ও দৃঢ়রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে
- ইবনু ফারিস, মাকায়িসুল লুগাহ, ২/৯১
গেল।
পারিভাষিক অর্থ
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় ‘হাকিমিয়্যাহ’ বলতে বোঝানো হয়—সকল বিধান ও হুকুমের একমাত্র উৎস হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা। এই অর্থটি কোরআনে বহু আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। যেমন:
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ، يَقُصُّ الْحَقَّ وَهُوَ خَيْرُ الْفَاصِلِينَ
অর্থ: হুকুম তো একমাত্র আল্লাহরই, তিনিই সত্যকে ব্যাখ্যা করেন এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী। (সুরা আনআম, আয়াত ৫৭)
উসুলবিদগণ এই বিষয়ে একমত যে, ‘হাকিম’ তথা চূড়ান্ত বিধানদাতা কেবল আল্লাহ, তার কোনো শরিক নেই।
আল্লামা আমদি (রহ.) বলেন:
اعْلَمْ أَنَّهُ لَا حَاكِمَ سِوَى اللَّهَ تعالى، وَلَا حُكْمَ إِلَّا مَا حَكَمَ بِهِ
অর্থ: জেনে রাখো—আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কেউ হাকিম নন, আর হুকুম কেবল সেটিই—যা তিনি বিধিবদ্ধ করেছেন।
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন:
أَمَّا اسْتِحْقَاقُ نُفُوذِ الْحُكْمِ فَلَيْسَ إِلَّا لِمَنْ لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ، فَإِنَّمَا النَّافِذُ حُكْمُ الْمَالِكِ عَلَى مَمْلُوكِهِ لَا مَالِكَ إِلَّا الْخَالِقُ فَلَا حُكْمَ وَلَا أَمْرَ إِلَّا لَهُ
অর্থ: কার হুকুম কার্যকর হবে—এই প্রশ্নে আসল কথা হলো, হুকুম কেবল তারই কার্যকর হয়, যিনি সৃষ্টি করেন এবং যার একচ্ছত্র মালিকানা রয়েছে। মালিক তো কেবল স্রষ্টা, সুতরাং হুকুম ও আদেশও একমাত্র তারই।
আল্লাহ তাআলার ক্ষেত্রে ‘হুকুম’ শব্দের অর্থ
কোরআনে তিন অর্থে আল্লাহ তাআলার জন্য ‘হাকিম’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে:
১. ‘আল হুকমুত তাশরিয়ি’ বা শরিয়তি হুকুম: আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন—
مَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءُ سَمَّيْتُمُوهَا أَنتُمْ وَءَابَاؤُكُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ بِهَا مِن سُلْطَانٍ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
- ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব, ১২/১৪০-১৪২
- আল আমদি, আল ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম, ১/৭৯
- আল গাজ্জালি, আল মুসতাসফা, পৃ. ৬৬
অর্থ: তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাসনা করো, তারা তো কেবল কিছু নামমাত্র—যা তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষেরা রেখে এসেছো। আল্লাহ তো এর কোনো দলিল নাজিল করেননি। হুকুম কেবল আল্লাহরই, তিনি আদেশ করেছেন যেন শুধু তাকেই উপাসনা করো। এটাই হচ্ছে সঠিক দীন। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ জানে না। (সুরা ইউসুফ, আয়াত ৪০)
এই আয়াতে যে ‘হুকুম’-এর কথা বলা হয়েছে, তা শরিয়তি হুকুম—যা সরাসরি আকিদা ও তওহিদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ‘ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ’—এই বাক্য দ্বারা আল্লাহ তাআলা সমস্ত মিথ্যা উপাস্য ও তাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত বিধানব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছেন।
অর্থাৎ আকিদা, এবাদত ও সামাজিক সম্পর্ক—এ সবকিছুর বৈধতা-অবৈধতা নির্ধারণ করার একচ্ছত্র অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলারই। কেননা তিনিই সকল সৃষ্টির মালিক এবং সব কিছুর জ্ঞান একমাত্র তার কাছেই।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ ۚ أُحِلَّتْ لَكُم بَهِيمَةُ الْأَنْعَامِ إِلَّا مَا يُتْلَىٰ عَلَيْكُمْ غَيْرَ مُحِلِّي الصَّيْدِ وَأَنتُمْ حُرُمٌ ۗ إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ
অর্থ: হে ঈমানদারগণ, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করবে। যা তোমাদের নিকট বর্ণিত হচ্ছে তা ছাড়া গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু তোমাদের জন্য হালাল করা হলো, তবে ইহরাম অবস্থায় শিকার করাকে বৈধ মনে করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছে হুকুম করেন। (সুরা মায়িদা, আয়াত ১)
এখানে ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা হুকুম করেন’—এই কথার অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা তার সৃষ্টিজগতে যেকোনো কিছুকে বৈধ বা অবৈধ করেন তার প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও হেকমতের আলোকে। তিনি যা হালাল করতে চান, হালাল করেন; আর যা হারাম করতে চান, তা হারাম করেন—কোনো বাধা ছাড়াই। কাজেই তোমরা তার সঙ্গে করা চুক্তি পালন করো, তার বিধান ভঙ্গ কোরো না, এবং তার শরিয়তের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা কোরো না।
আল্লাহর এই শরিয়তি হুকুম মানবজাতির প্রতি একটি দায়িত্ব। যে তার বিধান মেনে চলে, হুকুম মান্য করে—সে সফল ও সুখী হয়। আর যে তা অস্বীকার করে, মুখ ফিরিয়ে নেয়—সে এই দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন:
فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَىٰ () وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ
অর্থ: এরপর আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সৎপথের নির্দেশ আসলে যে আমার প্রদর্শিত সৎপথের অনুসরণ করবে সে বিপথগামী হবে না ও দুঃখকষ্ট পাবে না। আর যে আমার স্মরণ
- মুহাম্মদ সাইয়িদ তানতাবি, আত তাফসিরুল ওয়াসিত, ৭/৩৬৩
- আল মারাগি, তাফসিরুল মারাগি, ৬/৪৪
থেকে বিমুখ থাকবে, নিশ্চয় তার জীবন-যাপন হবে সংকুচিত এবং আমরা তাকে কেয়ামতের দিন উত্থিত করব অন্ধ অবস্থায়। (সুরা ত-হা, আয়াত ১২৩-১২৪)
২. ‘আল হুকমুল কাদরি আল কাওনি’ বা সৃষ্টিজগতের ওপর কর্তৃত্বের হুকুম
এটি সেই হুকুম, যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা তার সৃষ্ট জগতে নিয়মনীতি ও ‘সুন্নাতুল্লাহ’ (আল্লাহর নীতি) নির্ধারণ করেন। এই বিধান চলে আল্লাহর ইচ্ছায়, এবং তা যখনই তিনি চান, তখনই বাস্তবায়িত হয়। কোনো মানুষ এর এক রত্তিও বদলাতে পারে না বা এ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا نَأْتِي الْأَرْضَ نَنقُصُهَا مِنْ أَطْرَافِهَا ۚ وَاللَّهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهِ ۚ وَهُوَ سَرِيعُ الْحِسَابِ
অর্থ: তারা কি দেখে না যে, আমরা এ জমিনকে চতুর্দিক থেকে সংকুচিত করে আনছি? আর আল্লাহই আদেশ করেন, তার আদেশ রদ করার কেউ নেই এবং তিনিই দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। (সুরা রাদ, আয়াত ৪১)
আরও বলেন:
قُلِ اللّٰهُ اَعۡلَمُ بِمَا لَبِثُوۡا ۚ لَهٗ غَیۡبُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ اَبۡصِرۡ بِهٖ وَ اَسۡمِعۡ ؕ مَا لَهُمۡ مِّنۡ دُوۡنِهٖ مِنۡ وَّلِیٍّ ۫ وَّ لَا یُشۡرِكُ فِیۡ حُكۡمِهٖۤ اَحَدًا
অর্থ: আপনি বলুন, তারা কত কাল অবস্থান করেছিল তা আল্লাহই ভালো জানেন, আসমান ও জমিনের গায়েবের জ্ঞান তারই। তিনি কত সুন্দর দ্রষ্টা ও শ্ৰোতা! তিনি ছাড়া তাদের অন্য কোনো অভিভাবক নেই। তিনি নিজ হুকুমে (কর্তৃত্বে) কাউকে শরিক করেন না। (সুরা কাহাফ, আয়াত ২৬)
এখানে ‘হুকুমে কাউকে শরিক করেন না’—এই বাক্যটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সৃষ্টিজগতের ওপর আল্লাহ তাআলার এই কর্তৃত্বে কোনো মানব, ফেরেশতা বা নবী-রসুলের শরিকানা নেই। যেমন মৃত্যু, জীবন, রোগ, সুস্থতা, বৃষ্টি, খরা—এসব বিষয় আল্লাহর নির্ধারিত কাওনি হুকুম অনুযায়ীই ঘটে। মানুষ ইচ্ছা করলেও এতে কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না।
৩. ‘আল হুকমুল উখরওয়ি’ বা আখেরাতের হুকুম
আখেরাতের হুকুম বলতে বোঝায়—কেয়ামতের দিন মানুষ যখন আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের কর্মফল নির্ধারণ করবেন। যিনি নেক আমল করেছেন, তিনি প্রতিদান ও পুরস্কার পাবেন; আর যে জুলুম করেছে, অবাধ্যতা করেছে, সে শাস্তি ভোগ করবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
ثُمَّ رُدُّوۡۤا اِلَی اللّٰهِ مَوۡلٰىهُمُ الۡحَقِّ ؕ اَلَا لَهُ الۡحُكۡمُ ۟ وَ هُوَ اَسۡرَعُ الۡحٰسِبِیۡنَ
অর্থ: তারপর তাদেরকে প্রকৃত রব আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তিত করা হবে। জেনে রাখুন, হুকুম তো তারই এবং তিনি সবচেয়ে দ্রুত হিসেব গ্রহণকারী। (সুরা আনআম, আয়াত ৬২)
তিনি আরও বলেন:
قُلِ اللّٰهُمَّ فَاطِرَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ عٰلِمَ الۡغَیۡبِ وَ الشَّهَادَۃِ اَنۡتَ تَحۡكُمُ بَیۡنَ عِبَادِكَ فِیۡ مَا كَانُوۡا فِیۡهِ یَخۡتَلِفُوۡنَ
অর্থ: বলুন, হে আল্লাহ, আসমানসমূহ ও জমিনের স্রষ্টা, গায়েব ও উপস্থিত বিষয়াদির জ্ঞানী, আপনিই আপনার বান্দাদের মধ্যে সে বিষয়ের ফয়সালা (হুকুম) করে দিবেন যাতে তারা মতবিরোধ করছে। (সুরা জুমার, আয়াত ৪৬)
অর্থাৎ, আল্লাহই সেই পরম বিচারক যিনি সব গোপন ও প্রকাশ্য জানেন, আর তিনি তার বান্দাদের মধ্যে যাবতীয় মতবিরোধের বিচার করে থাকেন। কেয়ামতের দিন এই বিচার হবে চূড়ান্ত ও অবধারিত, সেখানে কারও সুপারিশ, প্রতারণা বা প্রভাব কাজ করবে না।
মানুষের ক্ষেত্রে ‘হুকুম’ শব্দ প্রয়োগের বিধান
এতক্ষণের আলোচনায় এ ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়েছে যে, প্রকৃত হুকুমদাতা (হাকিম) একমাত্র আল্লাহ, এবং ‘হাকিমিয়্যাহ’ শব্দও কেবল আল্লাহর সাথে খাস (নির্দিষ্ট) করা হয়েছে, যেমন এরশাদ আছে:
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ
অর্থ: হুকুম একমাত্র আল্লাহর। (সুরা ইউসুফ, আয়াত ৪০)
এখন প্রশ্ন হলো—মানুষের ক্ষেত্রেও কি ‘হুকুমদাতা’ বা ‘হাকিমিয়্যাহ’ শব্দের প্রয়োগ বৈধ?
উত্তর হচ্ছে—হ্যাঁ, বৈধ। কোরআনের বহু আয়াতে মানুষের জন্যও ‘হুকুমদাতা’ বা ‘হাকিমিয়্যাহ’ শব্দ প্রয়োগের দৃষ্টান্ত আছে। যেমন আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন:
یٰدَاوٗدُ اِنَّا جَعَلۡنٰكَ خَلِیۡفَۃً فِی الۡاَرۡضِ فَاحۡكُمۡ بَیۡنَ النَّاسِ بِالۡحَقِّ وَ لَا تَتَّبِعِ الۡهَوٰی فَیُضِلَّكَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ؕ اِنَّ الَّذِیۡنَ یَضِلُّوۡنَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ لَهُمۡ عَذَابٌ شَدِیۡدٌۢ بِمَا نَسُوۡا یَوۡمَ الۡحِسَابِ
অর্থ: হে দাউদ, আমরা আপনাকে জমিনে খলিফা বানিয়েছি, অতএব আপনি লোকদের মধ্যে সুবিচার [হুকুম] করুন এবং খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না, কেননা এটা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ থেকে ভ্ৰষ্ট হয় তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি, কারণ তারা বিচার দিনকে ভুলে আছে। (সুরা স-দ, আয়াত ২৬)
তিনি আরও বলেন:
وَ دَاوٗدَ وَ سُلَیۡمٰنَ اِذۡ یَحۡكُمٰنِ فِی الۡحَرۡثِ اِذۡ نَفَشَتۡ فِیۡهِ غَنَمُ الۡقَوۡمِ ۚ وَ كُنَّا لِحُكۡمِهِمۡ شٰهِدِیۡنَ
فَفَهَّمۡنٰهَا سُلَیۡمٰنَ ۚ وَ كُلًّا اٰتَیۡنَا حُكۡمًا وَّ عِلۡمًا ۫ وَّ سَخَّرۡنَا مَعَ دَاوٗدَ الۡجِبَالَ یُسَبِّحۡنَ وَ الطَّیۡرَ ؕ وَ كُنَّا فٰعِلِیۡنَ
অর্থ: আর স্মরণ করুন দাউদ ও সুলায়মানকে, যখন তারা বিচার [হুকুম] করছিলেন শস্যক্ষেত্র সম্পর্কে; তাতে রাতে প্ৰবেশ করেছিল কোনো সম্প্রদায়ের মেষ; আর আমি তাদের বিচারকার্য [হুকুম] প্রত্যক্ষ করছিলাম।
আমি সুলায়মানকে এ বিষয়ের (সঠিক) বুঝ দিয়েছিলাম আর (তাদের) প্রত্যেককে আমি দিয়েছিলাম বিচারশক্তি [হুকুম] ও জ্ঞান। আমি পর্বত ও পাখিদেরকে দাঊদের অধীন করে দিয়েছিলাম, তারা দাউদের সাথে আমার মাহাত্ম্য ও পবিত্রতা ঘোষণা করত। (এসব) আমিই করতাম। (সুরা আম্বিয়া, আয়াত ৭৮–৭৯)
আল্লাহ তাআলা তার নবীকে উদ্দেশ করে বলেন:
اِنَّاۤ اَنۡزَلۡنَاۤ اِلَیۡكَ الۡكِتٰبَ بِالۡحَقِّ لِتَحۡكُمَ بَیۡنَ النَّاسِ بِمَاۤ اَرٰىكَ اللّٰهُ ؕ وَ لَا تَكُنۡ لِّلۡخَآئِنِیۡنَ خَصِیۡمًا
অর্থ: অবশ্যই আমি সত্য সহকারে আপনার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি, যেন আপনি আল্লাহ আপনাকে যা জানিয়েছেন, সে অনুসারে মানুষের মধ্যে বিচার [হুকুম] করতে পারেন। আর আপনি বিশ্বাসভঙ্গকারীদের সমর্থনে তর্ক করবেন না। (সুরা নিসা, আয়াত ১০৫)
প্রশ্ন উঠতে পারে: কোরআনের যে আয়াতগুলো আপনি পেশ করেছেন, তাতে তো হুকুম বা ফয়সালার ক্ষমতা কেবল আল্লাহর নবী-রসুলদের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে। তাদের ওপর তো ওহি নাজিল হতো, তারা কোনো ভুল করলে আল্লাহ তাআলা সরাসরি সংশোধন করে দিতেন। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ব্যাপারটা তো ভিন্ন, তারা ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়, তাদের বেলায় কি ‘হুকুম’ শব্দ প্রয়োগের দৃষ্টান্ত আছে?
এর উত্তর হলো: হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। কোরআন মাজিদের বহু আয়াতে নবী-রসুল ছাড়াও সাধারণ মানুষের প্রতি হুকুম ও ফয়সালার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। যেমন ইহরামের অবস্থায় কেউ শিকার করলে তার বিচার কী হবে—তা নিয়ে আল্লাহ বলেন:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَقۡتُلُوا الصَّیۡدَ وَ اَنۡتُمۡ حُرُمٌ ؕ وَ مَنۡ قَتَلَهٗ مِنۡكُمۡ مُّتَعَمِّدًا فَجَزَآءٌ مِّثۡلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ یَحۡكُمُ بِهٖ ذَوَا عَدۡلٍ مِّنۡكُمۡ هَدۡیًۢا بٰلِغَ الۡكَعۡبَۃِ اَوۡ كَفَّارَۃٌ طَعَامُ مَسٰكِیۡنَ اَوۡ عَدۡلُ ذٰلِكَ صِیَامًا لِّیَذُوۡقَ وَبَالَ اَمۡرِهٖ ؕ عَفَا اللّٰهُ عَمَّا سَلَفَ ؕ وَ مَنۡ عَادَ فَیَنۡتَقِمُ اللّٰهُ مِنۡهُ ؕ وَ اللّٰهُ عَزِیۡزٌ ذُو انۡتِقَامٍ
অর্থ: হে ঈমানদারগণ, ইহরামে থাকাকালে তোমরা বন্য শিকারকে হত্যা করো না। জেনে বুঝে তোমাদের কেউ তা হত্যা করলে তার বিনিময় হচ্ছে সেই পশুর সমতুল্য কোনো গৃহপালিত পশু। যে ব্যাপারে তোমাদের মধ্যের ন্যায়পরায়ণ দুজন লোক ফায়সালা [হুকুম] করে দেবে, তা কাবাতে কোরবানির জন্য পাঠাতে হবে। কিংবা তার কাফফারা হল কয়েকজন মিসকিনকে খাদ্যদান অথবা তদনুরূপ রোজা পালন, যেন সে স্বীয় কৃতকর্মের ফল ভোগ করে, পূর্বে যা হয়ে গেছে আল্লাহ তা ক্ষমা করেছেন; কেউ আবার (পাপকাজ) করলে আল্লাহ তার কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণে পূর্ণ সক্ষম। (সুরা মায়িদা, আয়াত ৯৫)
একইভাবে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার সমাধানে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন:
وَ اِنۡ خِفۡتُمۡ شِقَاقَ بَیۡنِهِمَا فَابۡعَثُوۡا حَكَمًا مِّنۡ اَهۡلِهٖ وَ حَكَمًا مِّنۡ اَهۡلِهَا ۚ اِنۡ یُّرِیۡدَاۤ اِصۡلَاحًا یُّوَفِّقِ اللّٰهُ بَیۡنَهُمَا ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ عَلِیۡمًا خَبِیۡرًا
অর্থ: আর যদি উভয়ের মধ্যে বিরোধ আশংকা কর, তাহলে তোমরা ওর (স্বামীর) পরিবার হতে একজন এবং এর (স্ত্রীর) পরিবার হতে একজন বিচারক [হাকাম] নিযুক্ত করো; যদি তারা মীমাংসা চায় তাহলে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে মিল করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু জানেন, সকল কিছুর খবর রাখেন। (সুরা নিসা, আয়াত ৩৫)
আরবিতে ‘হুকুমদাতা’ শব্দের বহুবচন ‘হুক্কাম’। কোরআনে এই শব্দ সাধারণ বিচারকদের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে। এরশাদ আছে:
وَ لَا تَاۡكُلُوۡۤا اَمۡوَالَكُمۡ بَیۡنَكُمۡ بِالۡبَاطِلِ وَ تُدۡلُوۡا بِهَاۤ اِلَی الۡحُكَّامِ لِتَاۡكُلُوۡا فَرِیۡقًا مِّنۡ اَمۡوَالِ النَّاسِ بِالۡاِثۡمِ وَ اَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ
অর্থ: তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পদের কিয়দংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকগণকে ঘুষ দিয়ো না। (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৮)
এছাড়াও কোরআনে আল্লাহ নিজেকে ‘অনেক হুকুমদাতার একজন’ বলেছেন, তবে অবশ্যই তার ওপরে কোনো হুকুমদাতা নেই, তিনিই শ্রেষ্ঠ, কিন্তু এই ‘অনেকের একজন’ বলা প্রমাণ করে যে, ‘হুকুমদাতা’ বিষয়টা আল্লাহর উলুহিয়্যাতের (ইলাহ হওয়া) মতো অদ্বিতীয় নয়। রসুল (স)-কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন:
وَ اتَّبِعۡ مَا یُوۡحٰۤی اِلَیۡكَ وَ اصۡبِرۡ حَتّٰی یَحۡكُمَ اللّٰهُ وَ هُوَ خَیۡرُ الۡحٰكِمِیۡنَ
অর্থ: আর আপনার প্রতি যে ওহি নাজিল হয়েছে আপনি তার অনুসরণ করুন এবং আপনি ধৈর্য ধারণ করুন যে পর্যন্ত না আল্লাহ ফয়সালা করেন, আর তিনিই হাকিমদের (ফয়সালাকারী) মধ্যে সর্বোত্তম। (সুরা ইউনুস, আয়াত ১০৯)
হযরত নুহ (আ) দোয়া করেন, সেই দোয়ায় তিনি আল্লাহকে ‘হাকিমদের শ্রেষ্ঠ হাকিম’ সম্বোধন করেন:
وَ اِنَّ وَعۡدَكَ الۡحَقُّ وَ اَنۡتَ اَحۡكَمُ الۡحٰكِمِیۡنَ
অর্থ: নিশ্চয় আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য, আর আপনি তো বিচারকদের [হাকিম] মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক। (সুরা হুদ, আয়াত ৪৫)
এসব আয়াত প্রমাণ করে ও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, ‘হাকিম’ শব্দটি আল্লাহর জন্য ব্যবহার করা যেমন বৈধ, তেমনই মানুষের জন্য ব্যবহার করাতেও কোনো সমস্যা নেই। তবে এ দুই ক্ষেত্রে অর্থ ভিন্ন, আর এর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। যেমন অনেক শব্দ আছে, যেগুলো একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং তাতে কোনো সমস্যা হয় না।
সোজা কথায়—‘হাকিমিয়্যাহ’ শব্দটি ‘হাকিম’র সাথে সম্পর্কযুক্ত একটি ধারণা। এর দ্বারা কখনও আল্লাহকে বোঝানো হয়, আবার কখনও মানুষকে। মানুষ ‘হাকিম’ হলে কখনও তার নাম হয় ইমাম, কখনও খলিফা, কখনও আমির, কখনও বাদশাহ, আবার কখনও রাষ্ট্রপ্রধান। নাম আলাদা হলেও মূল ধারণা একটাই—আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী মানুষের নেতৃত্ব দেওয়া এবং দীনের আলোকে দুনিয়ার রাজনীতি পরিচালনা করা।
‘হাকিমিয়্যাহ’ শব্দের ভুল ব্যাখ্যা ও তার খণ্ডন
ভুল ব্যাখ্যার উৎপত্তি
‘হাকিমিয়্যাহ’ শব্দটি ইসলামি ইতিহাসে চতুর্দশ হিজরি শতকের আগে পরিচিত ছিল না। সর্বপ্রথম এ শব্দটি ব্যবহার করেন সাইয়িদ আবুল আলা মওদুদি (১৯০৩-১৯৭৯)। পরে তা প্রচার করেন সাইয়িদ কুতুব (১৯০৬-১৯৬৬)। এরপর থেকে এ শব্দটি জামায়াতে ইসলামি ও অন্যান্য এই ধারার অন্য ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তারা এর মাধ্যমে বোঝাতে চান—হুকুম, শরিয়ত এবং কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত; সমস্ত আইন-কানুন ও শাসনব্যবস্থা কেবল আল্লাহর কাছ থেকেই গ্রহণ করতে হবে। তাদের মতে, ‘হাকিমিয়্যাহ’ একমাত্র আল্লাহর জন্য, মানুষের জন্য তা কখনও বৈধ নয়, সে যেই হোক না কেন। যেমন সাইয়িদ আবুল আলা মওদুদি বলেন:
এই শব্দটি—অর্থাৎ হাকিমিয়্যাহ—দিয়ে বোঝানো হয় সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব ও পূর্ণ ক্ষমতাকে (Sovereign Power বা সার্বভৌম ক্ষমতা), যেমন আজকাল রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রচলিত রয়েছে।
এরপর বলেন:
আইন প্রণীত হয় হুকুমের মালিকের ইচ্ছায়, আর মানুষের জন্য তা মান্য করা ফরজ হয়। কিন্তু যে সত্তা হাকিমিয়্যাহর অধিকারী, তার ওপরে আর কোনো আইন চলে না, কিংবা তার জন্য কারও আনুগত্য আবশ্যক হয় না। তিনি নিজেই সত্তাগতভাবে পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী, এবং তিনি যা সিদ্ধান্ত দেন, তার ব্যাপারে তাকে প্রশ্ন করা বৈধ নয়।
সবশেষে তিনি তার চূড়ান্ত মত জানান:
إنَّه لا يجوز لأحد غير الله أن ينفذ حكمه في عباد الله، إنه ليس هذا الحق إلا الله وحده
আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য বৈধ নয় যে সে আল্লাহর বান্দাদের ওপর নিজের হুকুম কার্যকর করবে। এই অধিকার একমাত্র আল্লাহরই।
- সাইয়িদ আবুল আলা মওদুদি, তাদউইন আদ দাস্তুর আল ইসলামি, পৃ. ১৮
- প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯
-
প্রাগুক্ত, পৃ. ২১
ছবি: সাইয়িদ আবুল আলা মওদুদি ও সাইয়িদ কুতুব
সাইয়িদ কুতুবও মওলানা মওদুদির মতো একই অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন:
হুকুম কেবল আল্লাহরই, এটি তার একক অধিকার। কারণ হাকিমিয়্যাহ তার উলুহিয়্যাতের (ইলাহি সত্তা) অন্যতম বিশেষত্ব। যে-ই এই অধিকার দাবি করবে, সে বাস্তবে আল্লাহর উলুহিয়্যাতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যকে তার সঙ্গে ভাগাভাগি করার দাবি তুলবে। এ দাবি যে-ই করুক, সে একজন ব্যক্তি, কিংবা কোনো শ্রেণী, কোনো দল, কোনো সংগঠন, কোনো জাতি, এমনকি সমগ্র মানবজাতি—যদি তারা একটি বিশ্বব্যাপী ব্যবস্থার আকারেও তা প্রতিষ্ঠা করে—তবু একই কথা প্রযোজ্য হবে। আর যে আল্লাহর প্রধানতম এই বৈশিষ্ট্যের বিরোধিতা করবে ও সেটার হক দাবি করবে, সে স্পষ্ট কুফরি করবে। তার কুফর হবে এতটাই প্রকাশ্য, যা ‘দীনের মৌলিক স্বীকৃত বিষয়সমূহ’ অস্বীকার করার সমান ব’লে গণ্য হবে, এমনকি কেবল এই একটি কোরআনের নির্দেশনার ভিত্তিতেই।
তিনি আরও বলেন:
এই অধিকার দাবি করার জন্য সব সময় ফেরাউনের মতো প্রকাশ্যে বলতে হয় না—مَا عَلِمْتُ لَكُم مِّنْ إِلَهٍ غَيْرِي (আমি তোমাদের জন্য আমার বাইরে আর কোনো ইলাহের ব্যাপারে জানি না; ২৮:৩৮), অথবা أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَى (আমি তোমাদের সর্বোচ্চ রব; ৭৯:২৪)। ফেরাউন এভাবে প্রকাশ্যে বলেছিল। কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর বিধানকে হাকিমিয়্যাহ থেকে সরিয়ে দেয় এবং অন্য কোনো উৎস থেকে আইন প্রণয়ন করে—তাহলেই সে আল্লাহর হক নস্যাৎ করছে এবং আল্লাহর সঙ্গে এ অধিকার নিয়ে বিরোধিতা করছে।
আরেকটু অগ্রসর হয়ে সাইয়িদ কুতুব বলেন:
যেই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত হয় যে হাকিমিয়্যাহর মালিক—অর্থাৎ আইন ও কর্তৃত্বের উৎস—আল্লাহ তাআলা ছাড়া অন্য কেউ হবে, তখনই শিরক সংঘটিত হয়। সে সিদ্ধান্ত হোক গোটা জাতির, কিংবা সমগ্র মানবজাতির—তবু তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও হাতে হাকিমিয়্যাহ সোপর্দ করার শামিল।
ওপরের আলোচনার ভিত্তিতে স্পষ্ট হয় যে, তাদের (মওলানা মওদুদি ও সাইয়িদ কুতুবের অনুসারীদের) কাছে ‘হাকিমিয়্যাহ’ দীনের উসুল ও আকিদার মূল অংশ। সুতরাং হাকিমিয়্যাহ বাস্তবায়ন না করা বা তা অস্বীকার করা তাদের মতে স্পষ্ট কুফর। তারা এর প্রমাণ হিসেবে আল্লাহর এ বাণীকে সামনে আনেন:
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلْكَـٰفِرُونَ
অর্থ: আর যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার ভিত্তিতে শাসন (হুকুম) করে না—তারাই কাফের। (সুরা মায়িদা, আয়াত ৪৪)
এই আয়াতের তফসিরে সাইয়িদ কুতুব বলেন:
এই আয়াতের বক্তব্য অত্যন্ত দৃঢ়, চূড়ান্ত এবং কঠোর। এর মধ্যে যে ‘من’ শর্তযুক্ত শব্দটি এসেছে, সেটি ব্যাপক অর্থ বহন করে—অর্থাৎ এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, সময় বা পরিস্থিতির সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সর্বকালের জন্য সাধারণ নিয়ম হিসেবে প্রযোজ্য। সুতরাং যে-ই আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার ভিত্তিতে শাসন করবে না, সে যেকোনো জাতির, যেকোনো যুগের হোক না কেন—সবার জন্যই একই বিধান। আর এর মূল কারণ হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে শাসনকার্য (হুকুম) পরিচালনা করে না, সে মূলত আল্লাহর উলুহিয়্যাতকে প্রত্যাখ্যান করে।
সুতরাং উলুহিয়্যাতের (ইলাহি সত্তার) অন্যতম বৈশিষ্ট্য ও অপরিহার্য দাবি হলো তাশরিয়ি হাকিমিয়্যাহ—অর্থাৎ আইন প্রণয়নের ক্ষমতা।
তাই, যে ব্যক্তি আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তা ছাড়া অন্য বিধান দিয়ে শাসনকার্য (হুকুম) পরিচালনা করে, সে একদিকে আল্লাহর উলুহিয়্যাত ও তার বৈশিষ্ট্যকে প্রত্যাখ্যান করছে; অন্যদিকে নিজের জন্য সেই উলুহিয়্যাতের হক ও বৈশিষ্ট্য দাবি করছে। এটা যদি কুফর না হয়, তাহলে কুফর বলতে আর কী বোঝায়?
আর মুখে ঈমান ও ইসলাম স্বীকার করার দাবি কতটুকুই-বা মূল্য রাখে, যদি বাস্তব কর্ম (যা কথার চেয়ে অনেক স্পষ্ট) জবানের চেয়ে স্পষ্টভাবে কুফর প্রকাশ করে?
এ পর্যায়ে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তাদের (মওলানা মওদুদি ও সাইয়িদ কুতুবের অনুসারীদের) কাছে হাকিমিয়্যাহ (আল্লাহর সার্বভৌমত্ব) মানে মানুষের শাসন (হুকুম) অস্বীকার করা; বরং তা উৎখাতের জন্য বিপ্লব করা। আর তাই
- সাইয়িদ কুতুব, ফি যিলালিল কুরআন, ৪/১৯৯০
- প্রাগুক্ত, ২/৮৯৮
ইসলামের রাজনৈতিক তত্ত্বকে তারা দাঁড় করিয়েছেন এই ভিত্তির ওপর যে, মানুষের হাত থেকে সমস্ত কর্তৃত্ব ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হবে; এবং কোনো মানুষকে এ অধিকার দেওয়া হবে না যে সে আরেকজন মানুষের ওপর আদেশ জারি করবে, আর অপর ব্যক্তি তার আনুগত্য করবে।
পর্যালোচনা ও খণ্ডন
আপাতচোখে সঠিক মনে হলেও, মওলানা মওদুদি ও সাইয়িদ কুতুবের চিন্তার ভিত্তিটাই মূলত ভুল ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা এখানে পর্যালোচনা করে দেখাব গলতি ঠিক কোন জায়গায়, কেন তাদের ব্যাখ্যাটা ভুল:
১. ‘হাকিম’ শব্দের বহুমাত্রিক ব্যবহার অস্বীকার করা: আল্লাহর জন্য যেমন ‘হাকিম’ (শাসক বা বিধানদাতা) শব্দের ব্যবহার সঠিক, তেমনই মানুষের ক্ষেত্রেও এই শব্দ প্রয়োগে আপত্তির কিছু নেই। কারণ এটি শব্দগতভাবে একটি مشترك لفظي (বহু অর্থবোধক শব্দ)—অর্থাৎ এমন শব্দ, যা ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। সুতরাং আল্লাহর ক্ষেত্রে যখন বলা হয় তিনি ‘হাকিম’, তখন তার অর্থ হলো পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত সার্বভৌমত্ব; আর মানুষের ক্ষেত্রে এই শব্দের ব্যবহার মানে কেবল সীমিত দায়িত্বে নিয়োজিত শাসনকর্তা—যা পূর্বের আলোচনায় এসেছে যে, কখনও শাসনকার্য আল্লাহর প্রতি আরোপ করা হয় (মূল ও সর্বজনীন অর্থে), আবার কখনও মানুষের প্রতি আরোপ করা হয় (অর্পিত দায়িত্ব ও সীমিত অর্থে)।
এখানে আমাদের যে বিষয়টি জোর দিয়ে বলতে হবে তা হলো—মানুষ হাকিম (শাসক) কোনোভাবেই মাসুম বা ভুলত্রুটিমুক্ত নন; তিনি একজন সাধারণ মানুষ, যিনি আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ (সমাজের নীতিনির্ধারক, জ্ঞানী ও নেতৃবর্গ)-এর সিদ্ধান্ত এবং সাধারণ মানুষের মতামত বা বায়আত (আনুগত্যের অঙ্গীকার)-এর মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। সমসাময়িক পরিভাষায় এটিকে সরাসরি ভোট বা গণভোট বলা যায়।
তবে শাসনকার্যের বৈধতা কেবল তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন তা কিছু মৌলিক শর্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। সেসব শর্ত হলো—
- আদল বা ন্যায়বিচার: শাসনব্যবস্থা এমন হতে হবে যেখানে নাগরিকদের অধিকার সমভাবে নিশ্চিত হয়, কারও প্রতি পক্ষপাত বা বৈষম্য যেন না থাকে।
- শুরা বা পরামর্শ: রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত জনগণের পরামর্শ ও অংশগ্রহণ ছাড়া একতরফাভাবে গ্রহণ করা যাবে না।
- ইজতিহাদ: শাসককে সময় ও সমাজের প্রয়োজন অনুসারে নতুন আইন ও বিধি প্রণয়ন করতে হবে; তবে এই আইন অবশ্যই শরিয়তের সর্বজনীন নীতিমালার আওতার মধ্যে হতে হবে, যাতে আংশিক বিষয়গুলোও কোরআন ও সুন্নাহভিত্তিক নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
এই নীতিমালার ভিত্তিতে শাসক যখন তার নাগরিকদের মধ্যে বিচারকার্য ও শাসন পরিচালনা করেন, তখন তা হয় হক ও ইনসাফের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত শাসন। আর এই পুরো প্রক্রিয়া আল্লাহর সার্বিক হাকিমিয়্যাহর সাথে কোনো সংঘাত তৈরি করে না। বরং এটা স্পষ্ট করে দেয় যে—মানুষের হাতে যে শাসন অর্পিত, তা আল্লাহর সার্বিক শাসনেরই একটি সীমিত প্রতিফলন; এতে আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার কোনো ক্ষতি হয় না।
ফলে, যারা দাবি করে যে মানুষের হাতে শাসনক্ষমতা অর্পণ করা মানে আল্লাহর হাকিমিয়্যাহ অস্বীকার—তাদের এ বক্তব্য ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক প্রমাণিত হলো।
২. ইজতিহাদের দ্বার রুদ্ধ করা: এই মতবাদের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—মানুষকে আল্লাহর বিপরীতে দাঁড় করানো, এবং ক্রমাগত আল্লাহপ্রদত্ত শরিয়তের সাথে মানুষের তৈরি পদ্ধতির তুলনা চালিয়ে যাওয়া। অথচ এটা তো একেবারেই স্পষ্ট যে—যদি আমরা এ ধরনের ধারণাকে মেনে নিই, তবে এর সরাসরি ফলাফল হবে ‘ইলমুর রাসিখিন’ বা গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞাধারী জ্ঞানীদের জন্য ইজতিহাদের দ্বার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ, কোরআন-সুন্নাহর মূলনীতির ভেতরে থেকে নতুন নতুন বাস্তব পরিস্থিতিতে সমাধান খোঁজার যে দরজা ইসলাম খোলা রেখেছে, তা চিরতরে তালাবদ্ধ হয়ে যাবে।
কিন্তু শরিয়তের অসংখ্য দলিল ইজতিহাদ, চিন্তাভাবনা ও গভীরভাবে অনুধাবনের প্রতি আহ্বান জানায়। হাদিসেই আমরা দেখি—আল্লাহর রসুল (স) যখন হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রা)-কে ইয়ামেনে বিচারক ও শাসক হিসেবে পাঠালেন, তখন তাকে জিজ্ঞাসা করলেন:
‘যখন তোমার কাছে বিচারকার্য আসবে, তুমি কীভাবে সিদ্ধান্ত দেবে?’
মুআয (রা) উত্তর দিলেন: ‘আল্লাহর কিতাবের আলোকে।’
রসুল (স) জিজ্ঞাসা করলেন: ‘যদি আল্লাহর কিতাবে না পাও?’
মুআয (রা) বললেন: ‘তাহলে রসুলের সুন্নতের মাধ্যমে।’
রসুল (স) বললেন: ‘আর যদি রসুলের সুন্নতেও না পাও, একই সাথে কিতাবেও না থাকে?’
মুআয (রা) উত্তর দিলেন: ‘তাহলে আমি আমার নিজের রায় ও ইজতিহাদ প্রয়োগ করব, এবং সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব।’
এ কথা শুনে রসুল (স) তার বুকে হাত রাখলেন এবং খুশি হয়ে বললেন: ‘সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আল্লাহর রসুলের প্রেরিত দূতকে এমন সিদ্ধান্তে পরিচালিত করেছেন, যা আল্লাহর রসুলকে সন্তুষ্ট করে।’
এখান থেকে স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহর রসুল (স) নিজে এমন একজন সাহাবিকে বিচারক ও শাসক বানিয়ে ইয়েমেনে পাঠিয়েছিলেন, যিনি সেইসব ক্ষেত্রে ইজতিহাদ করার সক্ষমতা রাখতেন যেখানে কোরআন ও সুন্নাহতে সরাসরি কোনো নির্দেশনা নেই। রসুল (স) শুধু যে এটি অনুমোদন করেন তা-ই নয়, বরং তার জন্য দোয়া করেন এবং এই পদ্ধতির প্রতি রেজামন্দি প্রকাশ করে তার তারিফ করেন।
তাহলে যারা বলে—মানুষের ইজতিহাদ ও আইন প্রণয়ন আল্লাহর হাকিমিয়্যাহর বিপরীত, তাদের এই দাবি ভিত্তিহীন। বরং বাস্তব প্রমাণ উলটো দিকে যায়। যদি তাদের বক্তব্যকে মেনে নেওয়া হয়, তবে এর পরিণতি হবে—মানবমস্তিষ্ককে চিন্তাশক্তি প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত করা, এবং সামাজিক জীবনকে সমৃদ্ধ করার যে বুদ্ধিবৃত্তিক
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৫৯২
দায়িত্ব ইসলাম মানুষের হাতে সোপর্দ করেছে, সেটি সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর করে দেওয়া।
৩. ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার বানানো: ‘হাকিমিয়্যাহ’ ধারণাকে এভাবে উপস্থাপন করার মূল উদ্দেশ্য আসলে ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় আরোহণ করা। এর ফলে সাধারণ রাজনৈতিক মতবিরোধ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে রূপান্তর করা হয় একধরনের ধর্মীয় সংঘাতে।
এভাবে দ্বন্দ্বকে ধর্মীয় রূপ দেওয়ার পরিণতি ভয়াবহ—কারণ এতে জনসাধারণের চেতনা বিকৃত করা হয়, তাদেরকে বিভ্রান্ত ও সংবেদনহীন করে রাখা হয়; যেন তারা ভাবতে থাকে ক্ষমতায় বসা মানেই ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা। বাস্তবে এটি জনগণের বিশ্বাসকে হাতিয়ার বানিয়ে ক্ষমতার মসনদে পৌঁছার একটি কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।
৪. শাসকের জবাবদিহিতার জায়গা না রাখা: তারা বলে থাকে—‘মানুষের হাতে ক্ষমতা দেওয়া কুফর।’ অথচ এ বক্তব্য ইসলামের মূলনীতির সাথেই সাংঘর্ষিক। কারণ ইসলামের মূলনীতি বলছে—মুসলিম শাসকের ওপর নজরদারির দায়িত্ব সমাজের; তার নিয়োগ ও অপসারণের অধিকারও জনগণের হাতে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট দলিল হলো খলিফাতুল মুসলিমিন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা)–এর প্রথম ভাষণ। খেলাফত গ্রহণের পর তিনি বলেছিলেন:
إني قد وليت عليكم، ولست بخيركم، فإن أحسنت فأعينوني، وإن أسأت فقوموني
অর্থ: আমি তোমাদের শাসক নিযুক্ত হয়েছি, অথচ আমি তোমাদের সেরা নই। যদি আমি সঠিক কাজ করি তবে আমাকে সহযোগিতা করো, আর যদি আমি ভুল করি তবে আমাকে সংশোধন করো।
এ বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয়—ইসলামি খেলাফতে ক্ষমতা শাসকের একক কর্তৃত্ব নয়; বরং এটি জনগণের আমানত। শাসক ভুল করলে জনগণের দায়িত্ব তাকে সংশোধন করা, নীরব দর্শক হয়ে অন্যায় মেনে নেওয়া নয়।
৫. নতুন আইন প্রণয়নের সুযোগ না রাখা: রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এমন বহু বিষয় থাকে যেগুলো নিয়ে কোরআন বা সুন্নাহতে সরাসরি কোনো নির্দেশ পাওয়া যায় না। তখন প্রশ্ন আসে—শাসক এসব বিষয়ে কী করবেন?
এখানেই ইসলামের আইনশাস্ত্র একটি সুস্পষ্ট পথ দেখায়। শরিয়তের বিধান প্রমাণ করার উৎস শুধু কোরআন ও সুন্নাহতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর পর আসে—
- ইজমা (সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত)
- কিয়াস (সাদৃশ্য নির্ভর যুক্তি)
- ইস্তিহসান (বিবেক ও ন্যায়ের দাবি অনুযায়ী শ্রেয়তর সমাধান বেছে নেওয়া)
- মাসালিহ মুরসালা (সরাসরি কোনো দলিল নাই, কিন্তু জনস্বার্থ ও সামষ্টিক কল্যাণ রক্ষার জন্য গ্রহণ করা বিধান)
- ইবনে কাসির, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬/৩০১
- উরফ বা রেওয়াজ (সমাজে প্রচলিত প্রথা, যা শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক নয়)
- ইস্তিসহাব (পূর্বের অবস্থা বহাল রাখা, যতক্ষণ না বিপরীত প্রমাণ আসে)
- শর‘উ মান কাবলানা (আগের শরিয়তের বিধান, যা বর্তমান শরিয়তের সাথে বিরোধপূর্ণ নয়)
এই সব উৎস থেকেই মুসলিম শাসক আইন প্রণয়নের নির্দেশনা গ্রহণ করবেন। ফলে, নতুন পরিস্থিতি ও নতুন রাষ্ট্রীয় চাহিদায় কোরআন-সুন্নাহর নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সঠিক সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়।
৬. খারেজিদের মতাদর্শ জিন্দা করা: খারেজিরা সুরা মায়েদার ৪৪ নং আয়াত দিয়ে দলিল দেয় যে—
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلْكَـٰفِرُونَ
অর্থ: যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুসারে শাসন (হুকুম) করে না—তারাই কাফের।
এর প্রেক্ষিতে আমরা বলব—ঈমানের ভিত্তি হলো তিনটি:
- তাসদিক বিল কলব (অন্তর থেকে সত্যায়ন করা)
- ইকরার বিল লিসান (মুখের স্বীকারোক্তি)
- আমল বিল আরকান (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা সম্পাদিত কাজ)
তবে ‘অন্তর থেকে সত্যায়ন করা’ হলো ঈমানের আসল ভিত্তি, বাকি দুইটা নয়। আর এটিই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের (বিশেষত আশআরিদের) সর্বজনীন মত। এর বাইরে যে মতবাদ বলে—‘যে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসন করল না, সে মুসলমান হলেও কাফের’—এটি মূলত খারেজিদের মতবাদ।
অথচ ইসলামের প্রকৃত ইমামগণ তাদের এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বহু দিক থেকে এর ভ্রান্তি প্রমাণ করেছেন। ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি (রহ) সুরা মায়েদার এই আয়াতের তফসিরে স্পষ্টভাবে খারেজিদের এই ব্যাখ্যা খণ্ডন করেন। তিনি লেখেন:
খারেজিরা বলে থাকে—যে কেউ আল্লাহর অবাধ্য হলো (অর্থাৎ কবিরা গোনাহ করল), সে কাফের। কিন্তু ইমামদের সর্বসম্মত মত হলো, বিষয়টি এমন নয়। খারেজিরা তাদের বক্তব্য প্রমাণে এই আয়াতকে দলিল বানিয়েছে। তারা বলেছে: এ আয়াত স্পষ্ট করে জানাচ্ছে, যে কেউ আল্লাহর নাজিলকৃত হুকুম ছাড়া অন্য নিয়মে ফয়সালা করবে, সে কাফের। আর কোনো মুসলিম গোনাহে লিপ্ত হলে সেও আল্লাহর নাজিলকৃত হুকুম-বহির্ভূত আচরণ করে। সুতরাং, গোনাহ করাই কাফের হওয়া আবশ্যক করে।
- আল গাজ্জালি, আল মুসতাসফা, পৃ. ১৩৭-১৭৩; আল আমদি, আল ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম, ১/১৯৫, ৩/১৭৩; ৪/১৩৭
- কেননা, একজন ব্যক্তি যদি কাফের পরিবারে থাকার কারণে নিজের ঈমান প্রকাশ করতে না পারে, কিংবা কেউ যদি তাকে জোরপূর্বক শিরকি কথা বা কাজ করতে বাধ্য করে, তবু সে ঈমানদার হিসেবেই গণ্য হবে। আবার কেউ অন্তর দিয়ে ঈমান এনে মুখেও স্বীকার করল, কিন্তু কোনো আমল করল না, এতে সে অবশ্যই গোনাহগার হবে, কিন্তু ইসলাম থেকে খারিজ হবে না। অন্যদিকে একজন মুখে স্বীকার করল, অন্যান্য মুসলমানের সাথে মিলেমিশে আমলও করল, কিন্তু অন্তর দিয়ে স্বীকার করল না—সেই ক্ষেত্রে সে মোনাফেক হিসেবে গণ্য হবে। এখান থেকে বোঝা যায়—অন্তর থেকে সত্যায়ন না করলে বাকি দুই ভিত্তি কোনো ফলাফল দেয় না। তাই এটিই আসল।—অনুবাদক
কালামশাস্ত্রবিদ ও মুফাসসিরগণ এই আয়াতকে কেন্দ্র করে খারেজি ও তাদের সমচিন্তার বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভুল ব্যাখ্যার জবাব দিয়েছেন:
প্রথম জবাব: এই আয়াত আসলে ইহুদিদের প্রসঙ্গে নাজিল হয়েছে, তাই এর নির্দেশ কেবল তাদের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু এ ব্যাখ্যা দুর্বল। কারণ, কোরআন ব্যাখ্যার মূলনীতি হলো—আম শব্দ (عموم اللفظ) দিয়ে হুকুম নির্ধারণ করা হবে, বিশেষ শানে নুজুল দিয়ে সীমাবদ্ধ করা যাবে না।
অনেকে এই দুর্বলতাকে ঢাকতে চেষ্টা করেছেন। তারা বলেছেন—‘এই আয়াতের শুরু থেকে যাদের নিয়ে আলোচনা চলছিল, অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা, তাদের মধ্যে যারা আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী শাসন করে না, তারাই কাফের।’ কিন্তু এই ব্যাখ্যাও দুর্বল।
কারণ, আল্লাহর বাণীতে বলা হয়েছে—وَمَنْ لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ—এখানে ‘من’ হরফটি শর্তের আকারে এসেছে, আর আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী এই হরফটি শর্তের আকারে এলে সব সময় ব্যাপক বা আম অর্থ বহন করে। তাই এটিকে কেবল ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া মানে কোরআনের মাঝে বাড়তি কিছু ঢুকিয়ে দেওয়া, [একই সাথে কোরআনের ব্যাপকতাকে সীমিত করা]—যা একেবারেই জায়েজ নয়।
দ্বিতীয় জবাব: আতা (রহ.) বলেছেন—‘এটা কুফর দুনা কুফর’ (অর্থাৎ স্পষ্ট কুফর নয়, বরং কুফরের নীচের একটি স্তরবিশেষ কিংবা ছোট কুফর)।
তাউস (রহ) বলেন—‘এটা এমন কুফর নয় যা মানুষকে মিল্লাত (মুসলিম জাতি) থেকে বের করে দেয়; যেমনটা আল্লাহ ও আখেরাতকে অস্বীকার করার ফলে হয়।’
অর্থাৎ তারা আয়াতটিকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘কুফরুন নি‘মাহ’ (আল্লাহর নিয়ামত অস্বীকার করা) হিসেবে, ‘কুফরুদ দীন’ (ধর্ম-অস্বীকার) হিসেবে নয়।
তবে এ ব্যাখ্যাও দুর্বল। কারণ, ‘কুফর’ শব্দটি যদি কোনো শর্ত বা সীমাবদ্ধতা ছাড়া (মুতলাক) ব্যবহার করা হয়, তখন তা স্বাভাবিকভাবে দীন অস্বীকারকেই নির্দেশ করে।
তৃতীয় জবাব: ইবনুল আনবারি বলেন—আয়াতটির অর্থ এমনও হতে পারে: যে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী শাসন করে না, সে আসলে এমন একটি কাজ করছে যা কাফেরদের কাজের সাথে মিলে যায়; তাই সেও কাফেরদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
কিন্তু এই ব্যাখ্যাও দুর্বল। কারণ কোরআনের বাণীর প্রকাশ্য অর্থ (ظاهر) এভাবে একপাশে সরিয়ে অন্য ব্যাখ্যা দাঁড় করানো গ্রহণযোগ্য নয়।
চতুর্থ জবাব: আবদুল আজিজ ইবনে ইয়াহইয়া আল কিনানি বলেন—আল্লাহর কালামে যে বলা হয়েছে: بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ (যা আল্লাহ নাজিল করেছেন), এটি صيغة عموم (সিগাতু উমুম) বহন করছে। অর্থাৎ, এখানে
- কুফর দুই প্রকার: আকিদার কুফর ও নেয়ামতের কুফর। নেয়ামতের কুফর হলো ছোট কুফর, এটি ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। এ ব্যাপারে ইমাম বুখারি তার সহিহ বুখারির ‘কিতাবুল ঈমান’ অধ্যায়ের باب كفران العشير وكفر دون كفر পরিচ্ছেদে আলোচনা করেছেন।
ব্যবহৃত শব্দ সর্বজনীনতার অর্থ প্রকাশ করে। তাই এর মানে দাঁড়ায়—আল্লাহ যা কিছু নাজিল করেছেন, তার সবকিছুর ওপরই এ বিধান প্রযোজ্য, শুধু কোনো বিশেষ বিষয় বা নির্দিষ্ট অংশের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। তার মতে এই আয়াতের অর্থ হলো: ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর নাজিলকৃত প্রত্যেক বিধানের বিপরীতে চলে, সে-ই প্রকৃত কাফের।’
এ বক্তব্য আংশিকভাবে সঠিকও বটে। কারণ কাফের সেই, যে আল্লাহর নাজিলকৃত সবকিছুর বিপরীতে অবস্থান নেয়—অর্থাৎ বিশ্বাসে, স্বীকারে এবং কর্মে সর্বত্র আল্লাহর বিধান অস্বীকার করে। অন্যদিকে ফাসিক (অবাধ্য মুসলিম) তো আল্লাহর সব হুকুম অস্বীকার করে না; বরং আংশিক ক্ষেত্রে—কর্মে ব্যত্যয় ঘটায়; কিন্তু মনের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকৃতিতে সে আল্লাহর বিধান মেনে নেয়।
তবে এই ব্যাখ্যাতেও দুর্বলতা আছে। কেননা, যদি এ আয়াতকে ধরা হয় কেবল সেই ব্যক্তিদের জন্য, যারা আল্লাহর প্রতিটি বিধানের বিপরীতে চলে, তাহলে ইহুদিদের ওপর এই সতর্কবার্তা প্রযোজ্য হতো না। অথচ সকল মুফাসসির একমত যে, এ আয়াত মূলত ইহুদিদের ক্ষেত্রেই নাযিল হয়েছে—যখন তারা তওরাতে বিধৃত ব্যভিচারীর জন্য আল্লাহর রজমের (পাথর নিক্ষেপ) হুকুম পরিবর্তন করেছিল। সুতরাং স্পষ্ট হলো, আয়াতের এই ব্যাখ্যা টেকসই নয়।
পঞ্চম জবাব: হযরত ইকরিমা (রহ) বলেছেন—‘যে আল্লাহর নাজিলকৃত হুকুম অনুযায়ী শাসন করে না, সে কাফের’—আল্লাহর এই কালামের উদ্দেশ্য হলো সেই ব্যক্তি, যে একই সাথে মুখে ও অন্তরে আল্লাহর হুকুমকে অস্বীকার করে।
কিন্তু যে ব্যক্তি অন্তরে ভালোভাবে স্বীকার করে যে এটি আল্লাহর হুকুম, মুখেও স্বীকার করে যে এটি আল্লাহর হুকুম, তবুও বাস্তবে এর বিপরীত কাজ করে—সে এখনও আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী চলছে বলে ধরা হবে; কেবল বাস্তব কর্মে সেটি ছেড়ে দিয়েছে। তাই তার ক্ষেত্রে এই আয়াতের (কাফের সাব্যস্ত হওয়ার) বিধান প্রযোজ্য নয়।
এটাই সঠিক ব্যাখ্যা—এবং আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
ফলে যে ব্যক্তি আল্লাহর শরিয়তকে অন্তরে ও মুখে অস্বীকার করে, অথবা মনে করে আল্লাহর বিধান ভুল, অথবা উপহাস করে, অথবা প্রত্যাখ্যান করে—সে নিঃসন্দেহে কাফের।
কিন্তু যে মুসলিম আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে আল্লাহর শরিয়ত সত্য, অন্তরে অস্বীকার করে না, মুখেও অস্বীকার করে না, অথচ শাসনে গাফলতি করে বা তা পুরোপুরি মানে না—সে মুসলিমই থাকবে, তবে সে হবে ‘আসি’ বা গোনাহগার। এই গোনাহগার মুসলিম যদি তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন। আর যদি তওবা ছাড়া মারা যায়, তবে তার ব্যাপার আল্লাহর হাতে—আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করবেন, চাইলে শাস্তি দেবেন।
- ফখরুদ্দিন রাজি, আত তাফসিরুল কাবির, ১২/৬
জাওহারা গ্রন্থের লেখক কী চমৎকার বলেছেন:
ومن يمت ولم يتب من ذنبه
فأمره مفوض لربه
যে জন গোনাহ করে তওবা ছাড়া
ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে,
তার পরিণতি সঁপে দেওয়া হয়
তার রবেরই হাতে
৭. আল্লাহর রসুলের (স) নির্দেশনা-পরিপন্থী কাজ করা: যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী কাজ করে না, তাদের কাফের বলা আল্লাহর রসুল (স)-এর দিক-নির্দেশনার পরিপন্থি। কারণ, হুজাইফা ইবনে ইয়ামান (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রসুল (স) বলেন:
আমার পরে এমন কিছু শাসক (আমির) আসবে, যারা আমার দিকনির্দেশনা মেনে চলবে না, আমার সুন্নতের অনুসরণও করবে না। তাদের মধ্যে এমন লোক থাকবে, যাদের হৃদয় হবে শয়তানের মতো, যদিও বাহ্যিক রূপটা হবে মানুষের।
আমি জিজ্ঞেস করলাম: হে আল্লাহর রসুল, আমি যদি সে সময়টা পাই, তাহলে কী করব?
তিনি (স) বললেন: তুমি তোমার শাসকের কথা শুনবে ও মানবে। যদি সে তোমার পিঠে আঘাত করে, তোমার ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেয়, তবু শুনবে ও আনুগত্য করবে।
এই হাদিস স্পষ্ট করে দেয়:
- মুসলিম শাসক যদি কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ না করে, তবু তাকে তাৎক্ষণিকভাবে কাফের ঘোষণা করা যাবে না।
- বরং তার অন্যায় ও জুলুম সত্ত্বেও মুসলিম উম্মাহর ঐক্য নষ্ট না করার তাগিদে তার আনুগত্য বজায় রাখতে হবে—যদি না সেই শাসক নিজেকে স্পষ্ট ‘কাফের’ ঘোষণা করে।
আয়াতের প্রকৃত অর্থ
প্রশ্ন আসে, —‘যে আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী শাসন করে না, সে কাফের’—এই আয়াতের লক্ষ্যবস্তু কারা? কোনো বিশেষ জাতিগোষ্ঠী, না সমগ্র মানবজাতি?
এর জবাবে প্রথমেই বলব—এই আয়াতের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ইহুদিরা। এর প্রমাণ খোদ আয়াতের শানে নুজুল
- ইবরাহিম লাক্কানি, জাওহারাতুত তাওহিদ, পৃ. ১৯
- সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৮৪৭
(কনটেক্সট) ও পূর্বাপর।
সহিহ হাদিসে এসেছে, এই আয়াত নাজিল হয়েছিল এক নির্দিষ্ট ঘটনার পর। ইহুদিদের মধ্যে ব্যভিচারের একটি ঘটনা ঘটে। তওরাত কিতাবে ব্যভিচারের জন্য শাস্তি ছিল রজম (পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড)। কিন্তু তারা নিজেদের মনমতো সেই বিধান পরিবর্তন করে ফেলে, এবং মনে মনে চায় যে রসুল (স) তাদের জন্য অন্য কোনো বিধান দিয়ে দিক।
সহিহ মুসলিমে হাদিসটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
বারা ইবনু আযিব (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একবার নবী (স)-এর সামনে দিয়ে একজন ইহুদিকে কালি মেখে এবং বেত্ৰাঘাত করতে করতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তখন তিনি তাদের ডেকে বললেন, ‘তোমরা কি তোমাদের কিতাবে ব্যভিচারের শাস্তি এমনই পেয়েছো?’
তারা বলল, ‘হ্যাঁ।’
এরপর তিনি তাদের মধ্য থেকে একজন আলেমকে (র্যাবাই) ডেকে আনলেন এবং বললেন, ‘তোমাকে সে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, যিনি মুসা (আ)-এর প্রতি তওরাত কিতাব নাজিল করেছিলেন, তোমরা তোমাদের কিতাবে ব্যভিচারীর শাস্তি এমনই পেয়েছো?’
তখন ইহুদি আলেম বললেন, ‘না।’ তিনি আরও বললেন, ‘আপনি যদি আমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে এভাবে না বলতেন, তবে আমি আপনাকে জানাতাম না যে, এর প্রকৃত শাস্তি রজম। কিন্তু আমাদের সমাজের অভিজাত ব্যক্তিদের মাঝে এর ব্যাপক প্রচলন হয়ে গেছে। তাই অভিজাত কেউ এ কাজে জড়িয়ে গেলে আমরা তাকে ছেড়ে দিতাম। আর যখন সামাজিকভাবে দুর্বল কাউকে (এ কাজের দায়ে) পাকড়াও করতাম, তখন তার ওপর হদ (শরিয়তের প্রকৃত শাস্তি) বাস্তবায়ন করতাম। শেষমেশ আমরা বললাম, তোমরা সকলেই এসো, আমরা সবাই মিলে এ ব্যাপারে একটি শাস্তি নির্ধারণ করে নিই, যা অভিজাত শ্রেণি ও অনভিজাত শ্রেণি—সকলের ওপরই প্রযোজ্য হবে। সুতরাং আমরা ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে পাথর নিক্ষেপের পরিবর্তে কালি লাগানো এবং বেত্ৰাঘাত করাকেই স্থির করে নিলাম।’
তখন রসুল (স) বললেন, ‘হে আল্লাহ, তারা যখন আপনার বিধানকে মেরে ফেলেছে, তখন আমিই প্রথম আপনার বিধানকে পুনর্জীবিত করলাম।’
এরপর তিনি তাদেরকে পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দেন। অবশেষে ওই ইহুদিকে পাথর মারা হয়। তখন يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لاَ يَحْزُنْكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ (হে রসুল, যারা কুফরি কাজে দ্রুতগামী, তাদের কার্যকলাপ যেন আপনাকে চিন্তিত না করে)—এই আয়াত থেকে, إِنْ أُوتِيتُمْ هَذَا فَخُذُوهُ (তোমরা এ রকম নির্দেশপ্রাপ্ত হলে তা গ্রহণ করো)—এই আয়াত পর্যন্ত নাজিল হয়।
সেই ইহুদি পণ্ডিত (অন্যদের) বলে: তোমরা মুহাম্মদ (স)-এর কাছে যাও, যদি তিনি তোমাদেরকে
- সুরা মায়েদা, আয়াত ৪১
কালি লাগানো এবং বেত্ৰাঘাতের নির্দেশ প্রদান করেন, তবে তোমরা তা কার্যকর করবে; আর যদি তিনি রজমের নির্দেশ দেন তবে তা প্রত্যাখ্যান করবে। তখন আল্লাহ তাআলা এ মর্মে নাজিল করেন:
وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
অর্থ: যারা আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারা কাফের।
وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
অর্থ: যারা আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারা জালেম।
وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ: যারা আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারা ফাসেক।
এ সবগুলো আয়াত কাফেরদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়।
এখানে স্পষ্ট যে ইহুদিদের প্রতি এমন প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তাআলা ‘কাফের’, জালেম’ ও ‘ফাসেক’ শব্দ ব্যবহার করেছেন, যখন তারা তওরাতে উল্লিখিত ব্যভিচারের পুরো শাস্তিটাই বাতিল করেছিল, এবং পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ডের বিধানকে কালি মাখা ও বেত্রাঘাতে বদলে দিয়েছিল।
এই আয়াতগুলোর সিয়াক-সাবাকও (পূর্বাপর) এটাই প্রমাণ করে—যাদের উদ্দেশ্য করে ‘কাফের’, জালেম’ ও ‘ফাসেক’ বলা হচ্ছে, এমন নয় যে আল্লাহর একটি-দুটি হুকুম বাস্তবায়ন না করার কারণে তাদের কাফের বলা হচ্ছে, বরং তারা ‘অন্তর থেকে সত্যায়ন না করা’র কারণে আগে থেকে কাফের ছিল। আল্লাহ তাআলা নিজেই এর সাক্ষ্য দিচ্ছেন:
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ مِنَ الَّذِينَ قَالُوا آمَنَّا بِأَفْوَاهِهِمْ وَلَمْ تُؤْمِن قُلُوبُهُمْ ۛ وَمِنَ الَّذِينَ هَادُوا ۛ سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ سَمَّاعُونَ لِقَوْمٍ آخَرِينَ لَمْ يَأْتُوكَ ۖ يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ مِن بَعْدِ مَوَاضِعِهِ ۖ يَقُولُونَ إِنْ أُوتِيتُمْ هَٰذَا فَخُذُوهُ وَإِن لَّمْ تُؤْتَوْهُ فَاحْذَرُوا ۚ وَمَن يُرِدِ اللَّهُ فِتْنَتَهُ فَلَن تَمْلِكَ لَهُ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا ۚ أُولَٰئِكَ الَّذِينَ لَمْ يُرِدِ اللَّهُ أَن يُطَهِّرَ قُلُوبَهُمْ ۚ لَهُمْ فِي الدُّنْيَا خِزْيٌ ۖ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ
অর্থ: হে রসুল, যারা মুখে বলে, ‘বিশ্বাস করেছি’ কিন্তু অন্তরে বিশ্বাসী নয় এবং যারা ইহুদি, তাদের মধ্যে যারা অবিশ্বাসে তৎপর, তাদের আচরণ যেন আপনাকে দুঃখ না দেয়। ওরা মিথ্যা শ্রবণে অত্যন্ত আগ্রহী, যে সম্প্রদায় আপনার কাছে আসেনি, ওরা তাদের পক্ষ থেকে কান পেতে (গোয়েন্দাগিরি করে) থাকে। ওরা (তওরাতের) বাক্যগুলোকে তার নিজ স্থান থেকে পরিবর্তন করে। ওরা বলে, ‘এ ধরনের (বিকৃত বিধান) দিলে গ্রহণ করো এবং তা (বিকৃত বিধান) না দিলে বর্জন করো।’ আল্লাহ যাকে ফেতনায় ফেলতে চান, তার জন্য আল্লাহর কাছে আপনার কিছুই করার নেই। ওই সকল লোকের হৃদয়কে আল্লাহ বিশুদ্ধ করতে চান না। তাদের জন্য আছে দুনিয়ায় অপমান আর আখেরাতে ভয়ানক শাস্তি। (সুরা মায়েদা, আয়াত ৪১)
- সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪, ৪৫ ও ৪৭
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭০০ ও ৪৩৩২
سَمّٰعُوۡنَ لِلۡكَذِبِ اَكّٰلُوۡنَ لِلسُّحۡتِ ؕ فَاِنۡ جَآءُوۡكَ فَاحۡكُمۡ بَیۡنَهُمۡ اَوۡ اَعۡرِضۡ عَنۡهُمۡ ۚ وَ اِنۡ تُعۡرِضۡ عَنۡهُمۡ فَلَنۡ یَّضُرُّوۡكَ شَیۡئًا ؕ وَ اِنۡ حَكَمۡتَ فَاحۡكُمۡ بَیۡنَهُمۡ بِالۡقِسۡطِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ یُحِبُّ الۡمُقۡسِطِیۡنَ
অর্থ: ওরা বেশিবেশি মিথ্যে শুনতে আগ্রহী, হারাম ভক্ষণকারী; ওরা যদি আপনার কাছে আসে তাহলে (ইচ্ছে হলে) তাদের বিবাদ নিষ্পত্তি করুন, নয়তো অস্বীকার করুন। অস্বীকার করলে তারা আপনার কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না। যদি বিচার করেনই, তাহলে ইনসাফের সাথে ওদের করুন; আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালোবাসেন। (সুরা মায়েদা, আয়াত ৪২)
وَ كَیۡفَ یُحَكِّمُوۡنَكَ وَ عِنۡدَهُمُ التَّوۡرٰىۃُ فِیۡهَا حُكۡمُ اللّٰهِ ثُمَّ یَتَوَلَّوۡنَ مِنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِكَ ؕ وَ مَاۤ اُولٰٓئِكَ بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ
অর্থ: আর কীভাবে ওরা আপনাকে ফয়সালাকারী বানায়? অথচ ওদের কাছে রয়েছে তওরাত, যাতে আছে আল্লাহর বিধান, এরপরও ওরা মুখ ফিরিয়ে নেয়। ওরা আসলে বিশ্বাসীই নয়। (সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৩)
اِنَّاۤ اَنۡزَلۡنَا التَّوۡرٰىۃَ فِیۡهَا هُدًی وَّ نُوۡرٌ ۚ یَحۡكُمُ بِهَا النَّبِیُّوۡنَ الَّذِیۡنَ اَسۡلَمُوۡا لِلَّذِیۡنَ هَادُوۡا وَ الرَّبّٰنِیُّوۡنَ وَ الۡاَحۡبَارُ بِمَا اسۡتُحۡفِظُوۡا مِنۡ كِتٰبِ اللّٰهِ وَ كَانُوۡا عَلَیۡهِ شُهَدَآءَ ۚ فَلَا تَخۡشَوُا النَّاسَ وَ اخۡشَوۡنِ وَ لَا تَشۡتَرُوۡا بِاٰیٰتِیۡ ثَمَنًا قَلِیۡلًا ؕ وَ مَنۡ لَّمۡ یَحۡكُمۡ بِمَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰهُ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الۡكٰفِرُوۡنَ
অর্থ: নিশ্চয় আমি তওরাত নাজিল করেছি, তাতে ছিল হেদায়াত ও নুর; নবীগণ, যারা ছিলেন অনুগত, তারা ইহুদিদেরকে তদনুসারে হুকুম দিতেন। আর রব্বানি ও বিদ্বানগণও (তদনুসারে হুকুম দিতেন), কারণ তাদেরকে আল্লাহর কিতাবের রক্ষক করা হয়েছিল। এবং তারা ছিল এর ওপর সাক্ষী। সুতরাং তোমরা মানুষকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো। এবং আমার আয়াত নগণ্য মূল্যে বিক্রয় করো না। আর যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে ফয়সালা করে না, তারাই তো কাফের। (সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪)
وَ كَتَبۡنَا عَلَیۡهِمۡ فِیۡهَاۤ اَنَّ النَّفۡسَ بِالنَّفۡسِ ۙ وَ الۡعَیۡنَ بِالۡعَیۡنِ وَ الۡاَنۡفَ بِالۡاَنۡفِ وَ الۡاُذُنَ بِالۡاُذُنِ وَ السِّنَّ بِالسِّنِّ ۙ وَ الۡجُرُوۡحَ قِصَاصٌ ؕ فَمَنۡ تَصَدَّقَ بِهٖ فَهُوَ كَفَّارَۃٌ لَّهٗ ؕ وَ مَنۡ لَّمۡ یَحۡكُمۡ بِمَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰهُ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الظّٰلِمُوۡنَ
অর্থ: আমি তাদের জন্য তাতে (তওরাতে) বিধান দিয়েছিলাম যে, জানের বদলে জান, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, আর দাঁতের বদলে দাঁত। আর জখমের বদলে অনুরূপ জখম। কেউ ক্ষমা করে দিলে তাতে তারই পাপ মোচন হবে। আল্লাহ যা নাজিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিচার ফায়সালা করে না তারাই জালেম। (সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৫)
وَ قَفَّیۡنَا عَلٰۤی اٰثَارِهِمۡ بِعِیۡسَی ابۡنِ مَرۡیَمَ مُصَدِّقًا لِّمَا بَیۡنَ یَدَیۡهِ مِنَ التَّوۡرٰىۃِ وَ اٰتَیۡنٰهُ الۡاِنۡجِیۡلَ فِیۡهِ هُدًی وَّ نُوۡرٌ ۙ وَّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَیۡنَ یَدَیۡهِ مِنَ التَّوۡرٰىۃِ وَ هُدًی وَّ مَوۡعِظَۃً لِّلۡمُتَّقِیۡنَ
অর্থ: আমি তাদের (নবীগণের) পরে মরিয়মের ছেলে ঈসাকে, তার সামনে তওরাত কিতাবের যা কিছু ছিল তার সত্যায়নকারী হিসেবে পাঠিয়েছি। তাকে ইঞ্জিল কিতাব দিয়েছিলাম, যাতে ছিল সত্য পথের দিশা (হেদায়াত) ও নুর। এবং সেটি ছিল পূর্ববর্তী কিতাব তওরাতের সত্যায়নকারী এবং খোদাভীরুদের জন্য সঠিক পথের দিশা ও নসিহত। (সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৬)
এই পুরো প্রসঙ্গ দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়—আয়াতগুলো কোন প্রেক্ষাপটে কাদের উদ্দেশ্য করে নাজিল হয়েছিল। মোটাদাগে এখানে ইহুদিদের তিনটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়, যা যেকোনো ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে গিয়ে তাদের কাফের প্রমাণ করে:
- অন্তর থেকে ঈমান না আনা।
- খেয়াল ও স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে তাদের ওপর নাজিলকৃত আল্লাহর কিতাবকে বিকৃত করা ও অবিকৃত আইনকে বর্জন করা।
- আল্লাহর হুকুম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া।
মধ্যমপন্থি অবস্থান
প্রশ্ন আসতে পারে: যদি এই আয়াত আসলে ইহুদিদের ব্যাপারে নাজিল হয়ে থাকে, তবে অন্য শরিয়তের অনুসারীদের (অন্য জাতি বা ধর্মাবলম্বীদের) ক্ষেত্রেও কি আয়াতের বিধান একইভাবে প্রযোজ্য হবে, যদি তারাও আল্লাহর বিধান ছেড়ে অন্যভাবে শাসন শুরু করে?
এর জবাবে একদল আলেম বলেছেন—হ্যাঁ, ইহুদি বাদে অন্যদের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। কারণ কোরআনের বিধান নির্ধারিত হয় শব্দের নির্বিশেষ/ব্যাপক (আম) হওয়ার মাধ্যমে, নাজিলের কারণ দিয়ে নয়। তাছাড়া নীতিগতভাবে আমাদের আগে যে শরিয়ত ছিল সেটাও আমাদের জন্য শরিয়ত—যদি না শরিয়তে মুহাম্মদিতে তার বিপরীত কোনো বিধান থাকে। তাই যদি কেউ আল্লাহর নাজিলকৃত হুকুমের বিপরীত ফয়সালা করে, সে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এবং আল্লাহর হুকুম অস্বীকারের নিয়তেই তা করে থাকে, তবে বিজ্ঞ মুফতিগণ তার ব্যাপারে ফতোয়া দিতে পারেন।
অন্য একদল আলেম বলেছেন—না, এই আয়াতের বিধান শুধু ইহুদিদের জন্য। অন্যদের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রয়োগের জন্য আলাদা দলিল লাগবে, অথবা ইহুদিদের সাথে প্রতিতুলনা (কিয়াস) করতে হবে।
যাইহোক, এই আয়াত মুসলমানদের কাফের বলে ফতোয়া দেওয়ার স্পষ্ট কোনো দলিল নয়। তাই মুসলমান যদি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসন না-ও করে, শুধু এই আয়াত দিয়ে তাকে কাফের প্রমাণ করা যাবে না। কারণ, কোনো দলিলের মধ্যে ভিন্ন সম্ভাবনার সুযোগ থাকলে, তা আকিদা নির্ধারণে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। আকিদা সম্পর্কিত বিষয়ে কেবল ‘কতয়িউস সুবুত’ (অকাট্য ও সুস্পষ্ট) দলিল গ্রহণযোগ্য; ‘যন্নিউস সুবুত’ (বিভিন্ন অর্থের সম্ভাবনাময় ও অস্পষ্ট) দলিলের মাধ্যমে কাউকে কাফের বলা যায় না।
লেখক পরিচিতি: ড. আব্দুল ফাত্তাহ আল-আওয়ারি (জ. ১৯৬৮) হলেন মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিশিষ্ট ইসলামী স্কলার এবং শিক্ষাবিদ। তিনি মূলত কুরআনের তাফসির (ব্যাখ্যা) এবং আল-আজহারের একাডেমিক কার্যক্রমে তার ভূমিকার জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত। তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি (উসুলুদ্দিন) অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি আল-আজহারের ‘মাজমা আল-বুহুস আল-ইসলামিয়া’ (Islamic Research Academy)-এর একজন সম্মানিত সদস্য। এটি মিশরের সর্বোচ্চ ইসলামী গবেষণা পর্ষদ, যা সমসাময়িক বিভিন্ন জটিল বিষয়ে ইসলামী সমাধান ও ফতোয়া প্রদান করে। তার পড়াশোনা ও গবেষণার মূল ক্ষেত্র হলো আল-কুরআনের তাফসির। তিনি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী তাফসিরের সাথে আধুনিক প্রেক্ষাপটের সমন্বয় ঘটাতে পারদর্শী। তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: তাফসির আয়াত আল-আহকাম, কিমাত আল-তুরাস আল-আরাবি, কাসাসুল কুরআন ইত্যাদি।
তর্জমা: মওলবি আশরাফ লেখক, অনুবাদক ও সম্পাদক। পড়াশোনা কওমি মাদরাসায়, ২০১৬ সালে জামিয়া ইসলামিয়া বাইতুল ফালাহ মোহাম্মদপুর থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। এরপর মা’হাদ আবুল হাসান আলী নদভীতে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও মারকাজুল কোরআনে ইসলামি আইনশাস্ত্র নিয়ে পড়েন। বর্তমানে শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিতে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে পড়ছেন। প্রধান আগ্রহ ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন, শিল্পসাহিত্য ও রাজনৈতিক দর্শনে। প্রকাশিত বই: অয়ং ভয়ং রবীন্দ্রনাথং ও অন্যান্য (২০২৩), গণঅভ্যুত্থান-উত্তর ইসলাম, রাজনীতি ও সমাজভাবনা (২০২৫) ও শিশুতোষ বই সাপের তওবা (২০২৫)। এছাড়া আরও পাঁচটি অনুবাদগ্রন্থ ও সাতটি সম্পাদিতগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে। ই-মেইল: mawlawiashraf@gmail.com
হাকিমিয়্যাহ প্রশ্ন