ছবি: নিউইয়র্কের নতুন মেয়র জোহরান কোয়ামে মামদানি
১.
গেল নভেম্বরে নিউইয়র্ক শহরের মেয়র নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন জোহরান মামদানি। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাপী প্রায় সকল গণমাধ্যমে মামদানির বিজয়কে মার্কিন রাজনীতিতে এক নতুন মোড় হিসেবে গণ্য করতে দেখা গিয়েছে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ারও বহু আগ থেকেই সোশ্যাল মিডিয়া থেকে মূলধারার গণমাধ্যম—সর্বত্রই মামদানির নির্বাচনী প্রচারণা, বিভিন্ন বক্তব্য, নির্বাচনী ইশতেহার এবং রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে বিপুল আগ্রহ ও আলাপ-আলোচনা ছিল বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। পাশাপাশি দেখা গিয়েছে নিউইয়র্কবাসীর প্রতিক্রিয়াও। যেন নির্বাচনটা ছিল নেহাত একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। নিউইয়র্কবাসী যেন আগেই তাকে মেয়র হিসেবে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো মামদানির এই জনপ্রিয়তার উৎস কী? আমেরিকার রাজনীতিতে মামদানির এই উত্থানের কারণ ও মর্ম আদতে কী?
জোহরান কোয়ামে মামদানি ১৮ অক্টোবর ১৯৯১ সালে উগান্ডার কাম্পালায় জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে এক বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে, যা তার পরবর্তী রাজনৈতিক চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। জোহরানের পারিবারিক পটভূমি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং সমৃদ্ধ। তিনি এক প্রভাবশালী ভারতীয় বংশোদ্ভূত উগান্ডীয় পরিবার থেকে এসেছেন। তার পরিবার উগান্ডার রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। উগান্ডার স্বৈরশাসক ইদি আমিন কর্তৃক এশীয়দের বিতাড়নের সময় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। পরিবারের এই অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক চেতনায় ঔপনিবেশিকতা এবং বাস্তুচ্যুতির বিষয়গুলো নিয়ে গভীর সংবেদনশীলতা তৈরি করেছে। জোহরান মামদানির পিতা, মাহমুদ মামদানি, একজন বিখ্যাত ভারতীয়-উগান্ডীয় অ্যাকাডেমিশিয়ান ও শিক্ষাবিদ—যিনি রাজনীতি, ইতিহাস এবং সমাজতত্ত্বে বিশেষজ্ঞ। তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং উগান্ডার মাকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন; গবেষণা করেছেন, বিশেষত, আফ্রিকান রাজনীতি এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র নিয়ে। তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে: Imperialism and Fascism in Uganda (1984), Citizen and Subject: Contemporary Africa and the Legacy of Late Colonialism (1996), Neither Settler nor Native: The Making and Unmaking of Permanent Minorities (2020) ইত্যাদি।
অন্যদিকে, তার মা, মীরা নায়ার, আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত একজন ভারতীয়-মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা, যিনি সালাম বম্বে! (১৯৮৮), মনসুন ওয়েডিং (২০০১) এবং দ্য নেমসেক (২০০৬)-এর মতো কাজের জন্য সুপরিচিত। তার বাবা-মা দুজনেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল; তাদের জীবন ও কাজ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নাগরিক অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি দায়বদ্ধতার খুব ভালো উদাহরণ। এমন পিতা-মাতার সান্নিধ্যে জোহরান মামদানি বেড়ে উঠেছেন, যারা একাডেমিক গভীরতা এবং শৈল্পিক অভিব্যক্তির মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে কাজ করেছেন, যা তার প্রারম্ভিক জীবনে রাজনৈতিক সক্রিয়তার বীজ বপন করেছিল।
ছবি: বাবা-মা’র সাথে মামদানি
মামদানির বাবা, ঘানার প্রথম রাষ্ট্রপতি কোয়ামে নক্রুমার সম্মানে জোহরানের মধ্য নাম রেখেছিলেন ‘কোয়ামে’। তার বাবা-মা উভয়েই ভারতীয় বংশোদ্ভূত। তার বাবা খোজ়া সম্প্রদায়ভুক্ত একজন গুজরাটি শিয়া মুসলিম, যিনি মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন এবং প্রধানত উগান্ডায় বেড়ে ওঠেন। তার মা একজন পাঞ্জাবি হিন্দু, যিনি রৌরকেলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ভুবনেশ্বরে বেড়ে ওঠেন। তার দাদা-দাদি বর্তমান তানজানিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন; তার বাবার পরিবার ছিল দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকায় ভারতীয় প্রবাসী কম্যুনিটির অংশ। তার নানা, অমৃত লাল নায়ার, ছিলেন ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস (IAS) এর একজন প্রাক্তন কর্মকর্তা, এবং তার নানি, প্রবীণ নায়ার, ছিলেন একজন সমাজকর্মী এবং ভারতে ‘সালাম বালক ট্রাস্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা।
মামদানির স্ত্রী রামা সাওয়াফ দুওয়াজি একজন সিরিয়ান-আমেরিকান আর্টিস্ট ও ইলাস্ট্রেটর। মামদানির সফল মেয়র নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি নেপথ্যে থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। সোশ্যাল মিডিয়ার দৃশ্যসজ্জা (ভিজ্যুয়াল), আইকনোগ্রাফি ও সার্বিক প্রচারণায় ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টরের ভূমিকা পালন এবং গুরুত্বপূর্ণ সব প্রচারণা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি নিউইয়র্ক সিটির প্রথম ‘জেন-জি’ ও মুসলিম ফার্স্ট লেডি হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। মধ্যপ্রাচ্যের শিল্পকৌশল-প্রভাবিত বিভিন্ন থিম নিয়ে তৈরি সমাজ-সচেতন শিল্পকর্মের জন্য পরিচিত এই নারী, মামদানির নির্বাচনী প্রচারণাকে ফ্রেশ, যুগোপযোগী, জনঘনিষ্ঠ, নতুন প্রজন্মের রুচিঘনিষ্ঠ এক অনন্য ও আধুনিক চেহারা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
ফলে ধর্মীয়, জাতিগত, পেশাগত, এমনকি সামাজিক-সাংস্কৃতিক দিক থেকেও একটি বিরল বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিবেশে মামদানির জন্ম, বেড়ে ওঠা ও বর্তমান জীবনযাপন। এই বিষয়গুলো মামদানির রাজনৈতিক সত্তা ও আদর্শের মৌলিক ভিত্তি গঠনে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে—সেই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
ছবি: রামা দুওয়াজি ও জোহরান মামদানি
২.
১৯৯৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সপরিবারে মামদানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে মামদানি নিজেও একজন অভিবাসী। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন। নাগরিকত্ব লাভের মাত্র সাত বছরের মাথায় একজন মুসলিম অভিবাসীর গোটা নিউইয়র্ক শহরের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ইতিহাসে এই প্রথম এবং বিস্ময়কর নিঃসন্দেহে। কিন্তু, বিস্ময়কর এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে বিগত দুই দশক ধরে মার্কিন রাজনীতির পট-পরিবর্তনের ইতিহাস, যা না বুঝলে মামদানিকে ঠিক বোঝা যাবে না।
মামদানির রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়া এবং শক্তিশালী রিপাবলিকান প্রার্থীকে হারিয়ে নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের বিগত দুই দশকের মার্কিন রাজনীতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নির্দেশক বুঝতে হবে। অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নির্দেশকের মধ্যে, তিনটি প্রধান নির্দেশক বা প্রবণতা বোঝা খুবই জরুরি, যা বর্তমান সময়ে মামদানির মতো নেতার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিয়েছে।
প্রথম রাজনৈতিক নির্দেশকটি হলো, ৯/১১ পরবর্তী মার্কিন মুসলিম নাগরিকদের নতুনভাবে নিজেদেরকে একত্র করা। ২০০১ সালের পর, অর্থাৎ সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সময়কালে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সন্দেহ, নজরদারি, বৈষম্য এবং এর ফলে তৈরি হওয়া সামাজিক বিচ্ছিন্নতার বোধ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মানসে এক ধরনের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। নিউইয়র্কের মুসলিম কমিউনিটি—বিশেষত দক্ষিণ এশীয়, আরব ও আফ্রিকান মুসলিমরা—এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজেদের নাগরিক অধিকার, প্রতিনিধিত্ব এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে আরও সচেতন হয়ে ওঠে। নাগরিক অধিকারভিত্তিক সংগঠন, আইনি সহায়তা গ্রুপ, কমিউনিটি অ্যাডভোকেসি এবং স্থানীয় নির্বাচনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে মুসলিমরা ধীরে ধীরে একটি নতুন ধরনের অধিকার-সচেতন রাজনৈতিক কম্যুনিটি গড়ে তোলে। মুসলিম অভিবাসীদের এই জাগরণ মামদানির মতো মুসলিম অথচ ‘প্রগতিশীল’ রাজনীতিবিদের মূলধারার রাজনীতিতে উঠে আসার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করে। অর্থাৎ, মুসলিমদের উপর রাষ্ট্রীয় নজরদারি এবং বিভিন্ন রকমের রাষ্ট্রীয় ও নীতিগত কঠোরতার প্রতিক্রিয়ায় মুসলিম অভিবাসীদের মধ্যে যে রাজনৈতিক সচেতনতার বিকাশ ঘটছিলো, মামদানির সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের সাথে যুক্ত হতে কোন বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়নি, কেননা তার নিজেরও মুসলিম পরিচয় ছিল। ৯/১১ পরবর্তী মার্কিন দেশের মুসলিমদের নাগরিক-অধিকার ভিত্তিক যে রাজনৈতিক বিকাশ, সেটাই মামদানির প্রাথমিক রাজনৈতিক আদর্শ ও কৌশলের পাটাতন নির্মাণ করে দিয়েছিল।
ছবি: ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার টুইন টাওয়ারে হামলার দৃশ্য
দ্বিতীয় রাজনৈতিক নির্দেশকটি হলো, মার্কিন মুলুকের রাজনীতিতে ২০০৮-পরবর্তী র্যাডিকাল প্রগতিশীল রাজনৈতিক জোট। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দা মার্কিন মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর জীবনে ব্যাপক অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। সাধারণ মানুষের ঋণ, বেকারত্ব, আবাসন সংকট—এসব নিয়ে ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয় ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন, যা নতুন প্রজন্মের মধ্যে এন্টি-কর্পোরেট, এন্টি-এস্টাব্লিশমেন্ট এবং সামাজিক ন্যায়ের রাজনীতিকে শক্তিশালী করে। নিউইয়র্কে ভাড়াটিয়া অধিকার আন্দোলন, পুলিশ সংস্কার আন্দোলন, এবং ধনবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম—এসব মিলিয়ে প্রগতিশীল র্যাডিকাল রাজনীতির একটি নতুন তরঙ্গ তৈরি হয়। মামদানি এই তরঙ্গের একজন শক্তিশালী প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হন। সেকারণেই দেখা যায়, মামদানির রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে রয়েছে হাউজিং জাস্টিস, সুলভ পাবলিক সার্ভিস, শ্রমিক অধিকার ও সম্পদের পুনর্বণ্টনভিত্তিক নীতি। অকুপাই আন্দোলনের সরাসরি নির্বাচনী সাফল্য সীমিত হলেও, এর ফলে উত্থিত নাগরিক চৈতন্য ও রাজনৈতিক দর্শন পরবর্তীতে বার্নি স্যান্ডার্সের তৃণমূলভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজবাদী আন্দোলন (Democratic Socialist Movement), আলেক্সান্দ্রিয়া অকাসিও-করতেজের ‘সানরাইজ মুভমেন্ট’, ‘জাস্টিস ডেমোক্র্যাটস’ বা ‘কারেজ টু চেঞ্জ’ (Sunrise Movement, Justice Democrats, Courage to Change) এবং ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার (DSA) মতো বড় পর্যায়ের রাজনৈতিক সংগঠনের আদর্শের ভিত্তি দেয়। নগর পর্যায়ে ভাড়া স্থিতিশীলকরণ, ফ্রি বাস সার্ভিস, এবং ইউনিভার্সাল চাইল্ডকেয়ার-এর মত নীতিগুলো প্রগতিশীল এই এজেন্ডার অংশ হয়ে ওঠে। মামদানির নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে এই ধারার প্রভাব স্পষ্ট: বাসা ভাড়া বৃদ্ধি স্থগিতকরণ, ফ্রি বাস, সিটি-মালিকানাধীন গ্রোসারি স্টোর এবং আয়কর সীমা বাড়িয়ে সামাজিক সেবার প্রসার—এসবই হচ্ছে ২০০৮-পরবর্তী প্রগতিশীল রাজনীতির নীতি-নির্ধারণীমূলক বিষয়। অকুপাই আন্দোলনের কৃতিত্ব ছিল রাজনীতির ভাষা ও দর্শনের পরিবর্তন; মামদানিরর ক্যাম্পেইন সেই ভাষাকে কার্যকর নির্বাচনী কৌশলে রূপান্তর করেছে।
ছবি: অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলন
মামদানির নির্বাচনী ইশতেহার কিংবা নির্বাচনী প্রচারণায় খুব ভিন্ন বা ফোলানো-ফাঁপানো কোন প্রতিশ্রুতি কিংবা লক্ষ্য হাসিলের কথা কিন্তু নাই। বরং, একদম সহজ, সাধারণ, মৌলিক যে বিষয়গুলো নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনের সাথে সম্পর্কিত, ঠিক সেগুলো নিয়েই মামদানি সাজিয়েছিলেন তার নির্বাচনী প্রচারণা ও ইশতেহার। ২০০৮ সালের মহামন্দা ও ২০১১ সালের অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে মার্কিন দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুতর বাঁকবদলের সূচনা হয়। এই পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে বিচিত্র সব রাজনৈতিক আন্দোলন ও বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ভাষা নির্মিত হয়, আর এই প্রক্রিয়াতে মামদানি বেশ ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে তার নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা এই নয়া রাজনৈতিক দর্শন ও ভাষার ছাপ দেখতে পাই।
তৃতীয় নির্দেশকটি হলো, বহুজাতিক শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক জোট (Multiracial Working-class Coalition Politics)। এটি নিউইয়র্কের আর্থ-সামাজিক কাঠামো ও ঐতিহাসিক সাংগঠনিক ধারার ফল। নিউইয়র্ক বহুপ্রজন্ম ধরেই অভিবাসী-নির্ভর শহর; কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায় প্রায়শই একধরণের সুনির্দিষ্ট দলীয়/এলিটভিত্তিক স্টাটাস-কো বজায় ছিল। চলমান দশকে বিভিন্ন শ্রমজীবী সংগঠন, সম্প্রদায়ভিত্তিক সংগঠন এবং অন্যান্য অধিকারভিত্তিক সংগঠনগুলো একত্র হয়ে বহু-কমিউনিটিভিত্তিক এক ধরনের জোট তৈরি করেছে। ‘ব্লাক লাইভস ম্যাটার’-এর মতো বর্ণভিত্তিক ন্যায়বিচারের আন্দোলন, ‘ফাইট ফর ফিফটিন ডলার্স’-এর মতো শ্রমিক আন্দোলন, এবং নিউইয়র্কভিত্তিক ‘হাউজিং জাস্টিস মুভমেন্ট’ বা ‘টেনান্ট মুভমেন্ট’-এর মিলিত রিহার্সালই এমন এক জোটের ভিত্তিপ্রস্তর গড়ে তোলে। এই জোটের রাজনৈতিক সক্রিয়তার পাটাতনে দাঁড়িয়েই মামদানি তার প্রয়োজনীয় ভোট ব্যাংক ও মাঠ পর্যায়ের সাংগঠনিক সুবিধা পান।
ছবি: ব্লাক লাইভস ম্যাটার
মামদানিকে নির্বাচনী প্রচারণাকালে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা ভিডিও ও রিলসে বলতে দেখা যায় যে, তিনি নিজেও একজন অভিবাসী, তিনি মনে করেন নিউইয়র্ক শহরটাই অভিবাসীদের, এবং এই শহরের জাগতিক উন্নতির পিছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা অভিবাসীরাই। ফলে তিনি অভিবাসীদের অধিকারের জন্য লড়াই করাকে তার রাজনৈতিক আদর্শের অন্যতম প্রধান মূলমন্ত্র হিসেবে বিশ্বাস করেন। শহরের কর্মজীবী শ্রেণির ঐতিহাসিক অনুষঙ্গ, যেমন: নারী ও কৃষ্ণাঙ্গ অধিকারকর্মী শারলি চিশমের (Shirley Chisholm) উত্তরাধিকার বা পরবর্তীকালের স্থানীয় সামষ্টিক আন্দোলনগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার মধ্য দিয়েই মামদানির জয় সম্ভব হয়েছে।
ছবি: ফাইট ফর ফিফটিন ডলার্স
এছাড়া ভাষাভিত্তিক আউটরিচ (বাংলা, স্প্যানিশ, উর্দু, আরবি ইত্যাদি), ডোর-টু-ডোর ক্যাম্পেইন, স্থানীয় ইউনিয়ন ও কমিউনিটির সমর্থন, এবং সোশাল মিডিয়ার শক্তিশালী ব্যবহার—এসব মিলিয়ে পুরনো প্রথাগত রাজনীতিকে নতুন ফর্ম ও কন্টেন্ট দিয়ে প্রতিস্থাপন করে মামদানির রাজনৈতিক উত্থান ঘটে।
মার্কিন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিগত দুই দশকে ঘটা বড় বড় কিছু ঘটনা এবং সেসব ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে নতুন নতুন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির বিকাশ—এই পুরো ট্রেন্ডের সাথে মামদানির রাজনৈতিক উত্থানের গভীর সম্পর্ক আছে। মামদানির রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ, আদর্শ, কলাকৌশল এবং সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা—পুরোটাই গড়ে উঠেছে এই ট্রেন্ডের ভিতর দিয়ে। এসবের মধ্য দিয়েই ৩৪ বছর বয়সী ধর্মে মুসলিম, জাতীয়তায় উগান্ডীয়, বংশে ভারতীয় এবং রাজনৈতিক আদর্শে সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণায় মগ্ন মামদানি হয়ে উঠলেন নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম ও সর্বকনিষ্ঠ মেয়র।
৩.
সব মিলিয়ে, নিউইয়র্ক শহরের মেয়র নির্বাচনে মামদানির বিজয়টি শুধু একটি নির্বাচনী অর্জন নয়; এটি মার্কিন নগর রাজনীতিতে এক গভীর ও প্রতীকী রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করে। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে শহরের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম, প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং নতুন প্রজন্ম-নির্ভর প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে মামদানির নির্বাচিত হওয়া কেবল নিউইয়র্ক না, বরং গোটা আমেরিকার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। দীর্ঘদিন ধরে নিউইয়র্ক শহর ঐতিহ্যগতভাবে প্রতিষ্ঠিত ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্বের দ্বারা পরিচালিত হলেও, মামদানি ঐ ধারাকেও চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এক ভিন্ন ধরনের জনমুখী রাজনীতিকে সামনে নিয়ে এসেছেন, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘Affordability’ বা নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে সাশ্রয়ী করা।
এই নির্বাচনে ভোটদানের হার ছিল অত্যন্ত উচ্চ। বিশেষত তরুণ ভোটার ও কর্মজীবী অভিবাসী সম্প্রদায় এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মামদানির ক্যাম্পেইন ছিল সম্পূর্ণ তৃণমূল-নির্ভর এবং ডোর-টু-ডোর ক্যাম্পেইন; বহুভাষিক আউটরিচ, স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, এবং ছোট-দাতাদের (small donors) মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ—এসবই তাকে এক শক্তিশালী সামাজিক জোট গঠনে সাহায্য করে। এই জোটটি ছিল বহুজাতিক ও বহুপেশাভিত্তিক। দক্ষিণ এশীয়, আফ্রিকান-আমেরিকান, লাতিনো, আরব, ক্যারিবীয় এবং অন্যান্য অভিবাসী সম্প্রদায় তার প্রচারণায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। প্রকৃতপক্ষে তার জয়কে নিউইয়র্কের বহুবর্ণভিত্তিক ও বহুভাষিক শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগঠন ও অভিজ্ঞতার পরিণতি হিসেবেও দেখা যায়। এছাড়া, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত ও ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনে চলমান গণহত্যার প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট কণ্ঠে ফিলিস্তিনির পক্ষে থাকার ফলে মামদানির জনপ্রিয়তা আরো তুঙ্গে ওঠে।
বর্তমান সময়ে যেখানে পুরো বিশ্ব এক গভীর রাজনৈতিক সংকটে পতিত, সেখানে মার্কিন দেশে নিউইয়র্কের মতো শহরে মামদানির মেয়র নির্বাচিত হওয়া সংকটের সমান্তরালে এক নতুন রাজনৈতিক উদ্দীপনার নিদর্শনও বটে। এতদিন পর্যন্ত নিউইয়র্কে প্রগতিশীল আন্দোলন মূলত কাউন্সিল ও অ্যাসেম্বলি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু মামদানির জয়, প্রথমবারের মতো প্রমাণ করলো যে—শহরের শীর্ষ নেতৃত্বেও তৃণমূলের বাম রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। তার জয় প্রমাণ করে যে, এই নির্বাচনে ইসলামফোবিয়া, বর্ণবাদ বা অভিবাসী-বিরোধী প্রচারণা কার্যকর হয়নি—বরং বাস্তব জীবনের সংকট সমাধানের প্রশ্ন কিংবা আর্থ-সামাজিক প্রশ্নগুলোই এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সব মিলিয়ে মামদানির বিজয় আমেরিকার সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক মোড়-ফেরা মুহূর্ত। এটি দেখায় যে বহুজাতিক শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর স্বার্থনির্ভর নতুন রাজনৈতিক জোট এবং প্রগতিশীল আন্দোলনভিত্তিক সংগঠন একত্রে মিলিত হলে নগর-রাজনীতির শক্তির ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে যেতে পারে। এই বৃহৎ প্রত্যাশাগুলোর বাস্তবায়ন তিনি কতোটা করতে পারবেন—সেটা একটা বড় প্রশ্ন। তবে এই প্রশ্নটাকে একপাশে সরিয়ে রেখেও বলা যায়, নিঃসন্দেহে তার বিজয় মার্কিন শহরগুলোর ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি নতুন মডেল প্রতিষ্ঠা করেছে, এবং বিশ্বব্যাপী নতুন প্রজন্মের তরুণ রাজনীতিবিদদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে হাজির হয়েছে।
জোহরান মামদানির বিজয়: মার্কিন রাজনীতিতে নতুন মোড়ের সম্ভাবনা