[আলোচ্য গ্রন্থ: Khaled Abou El Fadl, Islam and the Challenge of Democracy, Princeton University Press, 2004]
খালেদ আবু এল ফাদল ইসলামি আইনশাস্ত্রের নামজাদা আলেম। ইসলামি আইন, শরিয়াসহ ইসলামের নানা শাখা নিয়ে অজস্র কিতাবাদি রচনা করেছেন। ২০০৩ সালে তিনি ‘Islam and the Challenge of Democracy’ নামে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। এই প্রবন্ধকে কেন্দ্র করে বেশ বড়সড় বাহাস তৈরি হয়, যেখানে নাদের হাশেমি, জেরেমি ওয়াল্ড্রন, সাবা মাহমুদ, মোহাম্মদ ফাদেলসহ প্রায় এগারজন স্কলার অংশ নেন। কেউ কেউ ফাদলের অবস্থানের প্রশংসা করেন, কেউ কেউ ক্রিটিক করেন। ফাদল পরে আবার সেগুলোর সম্মিলিত জবাব দেন। এই পুরো বাহাসই পরে কিতাব আকারে প্রকাশিত হয়।
যে বাস্তবতার মধ্যে প্রবন্ধটি লেখা হয়েছিল ও সকলে বাহাসে লিপ্ত হয়েছিলেন, সে সম্পর্কে দুটো নোক্তা দেওয়া প্রয়োজন। কেননা, পুরো বাহাসের নেপথ্যে সেই বাস্তবতা এতো প্রবল ছিল যে, তা পাঠকমাত্রেরই নজরে পড়বে। ২০০১-এর পর দুনিয়াজুড়ে মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের হালচাল নিয়ে বিস্তর কথাবার্তা শুরু হয়। এই কথাবার্তা একেবারে এতদূর পর্যন্ত ঠেকে যে, এমন মতও খুব চাউর হয়ে যায়: ইসলাম আদতে কোনোভাবেই গণতন্ত্রকে সমর্থন করে না; বরঞ্চ, ইসলামি ধর্মতত্ত্বেই লুকিয়ে আছে স্বৈরতন্ত্রের ভূত। অন্যদিকে, যে সকল রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক মুসলমান, সেসব রাষ্ট্রের অনেকগুলোতেই কায়েম ছিল স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। ফাদল যখন প্রবন্ধ লেখেন এবং তার জবাবে বাকিরা বাহাসে লিপ্ত হন, তখন সবার মধ্যে আসলে কোনো না কোনোভাবে এই সঙ্কটকে মোকাবিলা করার কোশেশ ছিল।
ফাদল গণতন্ত্রের পক্ষেই ওকালিত করেন। কিন্তু ইসলামের মধ্যে (অথবা ইতিহাসে) গণতন্ত্র ছিল, বা গণতন্ত্রের আদিরূপ ইসলামে ছিল—এমন কোনো দাবি থেকে খুব সচেতনভাবে তিনি নিজেকে বিরত রাখেন। ইসলামের আদিপর্বের ঐতিহাসিক দুয়েকটা নজির দিয়ে গণতন্ত্রের উপস্থিতি প্রমাণের কোশেশও তিনি করেন না। গণতন্ত্র যে হালজমানার রাষ্ট্র পরিচালনার মডেল এবং এর উৎস যে ইউরোপে হয়েছে, সেটাকে কবুল করেই তিনি দাবি করেন—গণতন্ত্রের যে অন্তর্নিহিত বুদ্ধিবৃত্তিক দিকগুলো রয়েছে, সেগুলো কেবল ইউরোপের একার সম্পত্তি নয়। বরঞ্চ ইতিহাস প্রমাণ করে যে, এগুলোর বিকাশে ইসলামি দর্শন ও মুসলমানদের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি আসলে ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের জায়গা থেকে গণতন্ত্রের সাথে ইসলামের সমন্বয়ের কোশেশ করেন। যেমন, গণতন্ত্রে যে জনগণের সার্বভৌমত্বের কথা বলা হয়, তার সাথে ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ঘোষিত আল্লাহর সার্বভৌমত্ব কী সাংঘর্ষিক? ফাদলের উত্তর হচ্ছে, না।
তিনি কেন ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের জায়গা থেকে এর ব্যাখ্যা করতে গেলেন? কেননা, তিনি মানেন, ধর্ম এখনো গভীরভাবে মানুষের ব্যবহারিক মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করে। অনেকেই মুসলমানদের জীবনে ধর্মের ভূমিকাকে খাটো করে দেখেন বলে সিদ্ধান্ত নেন যে, ধর্মতত্ত্বীয় বাহাসের প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ফাদলের মতে, অজস্র লোকের জীবনে, এমনকি তার কাছেও, খোদা এক নিত্যনৈমিত্তিক বাস্তবতা। ধর্ম এখনো তাদের কাছে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্যতম নিয়ামক। ফলে, ধর্মের ময়দান থেকে এই বোঝাপড়াকে তিনি জরুরি বলে মান্য করেন। কুরআন শরিফ কোনো নির্দিষ্ট ধরনের শাসনব্যবস্থাকে নির্ধারণ করে না দিলেও, ফাদল মনে করেন, কুরআন এমন কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধের কথা বলে, যেগুলো শাসনব্যবস্থার জন্য একেবারে কেন্দ্রীয় বলে বিবেচিত হতে পারে। সামাজিক সহযোগিতা ও পারস্পরিকতার মাধ্যমে ইনসাফ অনুসন্ধান; অ-স্বৈরাচারী ও পরামর্শভিত্তিক শাসনব্যবস্থা পত্তন; এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়াতে ইনসাফ ও দয়াকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা। এই মূল্যবোধগুলো প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক যে কোনো ধরনের শাসনব্যবস্থার পক্ষে মুসলমানদের থাকা উচিত বলে মনে করেন ফাদল। এবং, অবশ্যই তার কাছে বর্তমানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই হচ্ছে তেমন উপযোগী একটি শাসনব্যবস্থা।
ফাদলের কাছে গণতন্ত্রের একেবারে কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার, সরকারের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ এবং মৌলিক মানবাধিকারসমূহের হেফাজত। বাদবাকি অধিকারগুলো—যেমন: সমাবেশের অধিকার, বিরোধী দলের উপস্থিতি ইত্যাদি—সব আসলে এই কেন্দ্রীয় বিষোয়গুলোর উপজাত। যখন কেন্দ্রীয় বিষয়গুলোর সাথে বোঝাপড়া হয়ে যাবে, তখন বাকি প্রশ্নগুলোর সমাধান সহজেই করা যাবে। তবে, এই পুরো প্রক্রিয়াটা যে মোটেই সহজকম্ম নয়, এবং অন্যের অভিজ্ঞতা হুবুহু কপি-পেস্ট করার মামলা নয়—সেটাও তিনি বলেন। তিনি বরঞ্চ তার কাজকে কেবল একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ বলেই মান্য করেন।
তার ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তিগুলো দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি মৌলিক ধারণার উপরে। এক. মানুষ হচ্ছে দুনিয়ার বুকে খোদাতা’লার খলিফা; দুই. খোদার সাথে এই সম্পর্কটাই ব্যক্তিক দায়িত্বের ভিত্তি; তিন. খলিফা হিসাবে এই দায়িত্ব পালন মানবাধিকার ও সমতার ভিত্তি প্রদান করে; চার. ইনসাফ প্রদান ও খোদার সৃষ্টিকে দেখভাল করার মৌলিক বাধ্যবাধকতা মানবজাতি, বিশেষত মুসলমানদের রয়েছে; পাঁচ. খোদায়ি আইন ও মানুষের করা (ভুল হওয়ার সম্ভাবনাসহ) তফসিরের মধ্যে মৌলিক ফারাক রয়েছে; ছয়. রাষ্ট্রের কোনোভাবেই খোদার সার্বভৌমত্ব ও মহিমাকে মূর্ত করে তোলার ভান করা উচিত নয়। গণতন্ত্রের পক্ষে হাজির তার সকল যুক্তি দাঁড়িয়ে আছে এই পাটাতনের ওপর।
এই ধারণাগুলো একে-অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে ফাদলের চিন্তাজগতে, এবং তার মূল যুক্তিকাঠামোর মেরুদণ্ড হচ্ছে এগুলোর সংশ্লেষ। একটু ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। ফাদল বলেন, খোদাতা’লা সমগ্র মানবজাতিকে মর্যাদা দিয়েছেন দুনিয়াতে তার খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করে। এই খলিফার দায়িত্ব হলো সৃষ্টিজগতের দেখভাল করা এবং আরও ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক দুনিয়া নির্মাণ করা। কিন্তু, এই ‘খলিফা’ তো দোষত্রুটির উর্ধ্বে নয়—দোষ-গুণ মিলিয়েই সে মানুষ, খোদার খলিফা। খলিফা হিসেবে মানুষের এই সহজাত বৈশিষ্ট্য ফাদলের বিচারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, তিনি যখন শরিয়া ও ফিকহ নিয়ে আলাপ করেন, এবং আল্লাহর সার্বভৌমত্ব নিয়ে আলোচনা করেন তখন এটা তার আলাপের পূর্বানুমান ও শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। তার মতে, ‘শরিয়া’ হলো একটি ঐশী আদর্শ, এবং ‘ফিকহ’ হলো সেই আদর্শকে বোঝা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মানুষের প্রচেষ্টা। ফিকহ কখনোই নিখুঁত নয়, কারণ এটি মানুষের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল। মানুষের ব্যাখ্যা স্বভাবতই সীমাবদ্ধ, আপেক্ষিক ও ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। যেহেতু শরিয়া কেবল মানুষের ব্যাখ্যার মাধ্যমেই প্রকাশ পায়, তাই রাষ্ট্র যখন কোনো আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন সেটি আর আল্লাহর আইন থাকে না, তা হয়ে যায় রাষ্ট্রের আইন। কারণ সেটি মানবীয় ব্যাখ্যার ফল। তার কাছে রাষ্ট্রের আইনকে সরাসরি ‘আল্লাহর আইন’ বলা একটি গভীর ধর্মতাত্ত্বিক ভুল। রাষ্ট্রপ্রণীত কোনো আইন ব্যর্থ হলে তো সেটিকে আল্লাহর আইনের ব্যর্থতা হিসেবে মানতে হবে। এটা ইসলামি ধর্মতত্ত্বে অসম্ভব ও অগ্রহণযোগ্য।
এটা মাথায় রেখেই তিনি ‘আল্লাহর সার্বভৌমত্ব’ (‘হাকিমিয়্যাহ’ বা ডিভাইন সভ্রেনটি বা) ধারণাকে পুনর্ব্যাখ্যা করেন, এবং ‘আল্লাহর সার্বভৌমত্ব’ ও গণতন্ত্রের শ্লোগান ‘জনগণের সার্বভৌমত্ব’ (পপুলার সভ্রেনটি) যে একে অপরের মুখোমুখি নয়, সেটাও দাবি করেন। আবু এল ফাদল ‘আল্লাহর সার্বভৌমত্ব’ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ধারণাকে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করে বলেন, যারা দাবি করে যে একমাত্র আল্লাহই আইনপ্রণেতা, তারা এক ধরনের ‘মারাত্মক ভ্রান্তি’ প্রচার করে। কারণ এতে ধরে নেওয়া হয় যে, কিছু মানুষ সরাসরি ও নিখুঁতভাবে আল্লাহর ইচ্ছা বুঝতে পারে এবং তা নির্ভুলভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম। তিনি হযরত আলির (রা.) একটি ঘটনা দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। হযরত আলির বিরুদ্ধে খারেজিরা অভিযোগ তুলেছিল যে তিনি আল্লাহর আইনের শাসন না মেনে মানুষের বিচার ও কর্তৃত্ব মেনে নিয়েছেন। এই অভিযোগ শোনার পর হযরত আলি লোকজনকে তার চারপাশে জড়ো হতে বলেন এবং একটা কুরআন শরিফ সামনে আনেন। তারপর তিনি কুরআন শরিফের দিকে ইশারা করে তাকে মানুষদের উদ্দেশে কথা বলতে বলেন এবং আল্লাহর আইন সম্পর্কে জানাতে বলেন। এতে উপস্থিত লোকেরা বিস্মিত হয়ে বলে ওঠে, “আপনি কী করছেন? কুরআন তো কথা বলতে পারে না, এটা তো মানুষ নয়!” তখন হযরত আলি বলেন, ঠিক এটিই আমার বক্তব্য। লিখিত কুরআন আসলে কালি ও কাগজ মাত্র, এটি নিজে থেকে কথা বলে না। বরং মানুষই নিজেদের সীমিত বুদ্ধি ও মতামতের মাধ্যমে কুরআনকে অর্থ দেয় এবং তা কার্যকর করে। এই উদাহরণ দিয়ে ফাদল বলেন, “একজন বিশ্বাসীর কাছে আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং আকাশ-জমিনের একমাত্র মালিক। কিন্তু রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আইন প্রণয়নের প্রশ্নে যদি বলা হয় যে একমাত্র আল্লাহই আইনদাতা, তাহলে তা ইসলামি ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিতে একটি বিপজ্জনক ও অগ্রহণযোগ্য কল্পনা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এই ধরনের দাবি ধরে নেয় যে, কিছু মানুষ আল্লাহর ইচ্ছার পূর্ণ ও নির্ভুল জ্ঞান রাখে এবং তারা কোনো মানবিক ব্যাখ্যা বা পক্ষপাত ছাড়াই ঐশী ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে পারে।” (পৃ. ৯)
ফাদল এই ব্যাখ্যাকে আরও সম্প্রসারিত করে বলেন, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব নিয়ে যেসব দাবি করা হয়, সেগুলো প্রায়ই ধরে নেয় যে ঐশী বিধান মানুষের সব ধরনের সামাজিক ও পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, এবং শরিয়া একটি সম্পূর্ণ নৈতিক বিধানব্যবস্থা—যা জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতির জন্যই নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়। ফাদলের কাছে, বিষয়টি এমন নয়। তিনি বলেন, সম্ভবত আল্লাহ মানুষের জীবনের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চান না; বরঞ্চ কিছু ন্যূনতম নৈতিক মানদণ্ড—যেমন মানবিক মর্যাদা ও কল্যাণ রক্ষা—মেনে চলার শর্তে মানুষকে নিজের জীবন নিজে পরিচালনার যথেষ্ট স্বাধীনতা তিনি দিয়েছেন। কুরআনিক বর্ণনুসারে, আল্লাহ মানুষকে সম্মানিত করেছেন মানব বুদ্ধির বিস্ময়কর ক্ষমতার কারণে, যা আসলে ঐশী গুণাবলিরই এক প্রকাশ। বলা যায়, মানুষের এই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা ও মানুষ নিজেই যেহেতু এক ধরনের ঐশী প্রতীক, তাই সেই প্রতীকের মর্যাদা ও অখণ্ডতা রক্ষা করাই একটি নৈতিক দায়িত্ব। এখানেই হযরত আলির মূল বক্তব্য তিনি তুলে ধরেন, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মানুষের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়ার কোনো অজুহাত হতে পারে না। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মানুষকে তার নৈতিক দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে না। বরঞ্চ ফাদল বলেন, “মানুষ যখন আল্লাহর সৌন্দর্য ও ইনসাফের কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করে, তখন সে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে না; বরঞ্চ তাকে সম্মানই করে। একইভাবে, আল্লাহর গুণাবলির প্রতিফলন ঘটায় এমন নৈতিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ করাও আল্লাহকে সম্মান জানানোরই একটি উপায়।” (পৃ. ৯)
ফলে তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, মানব অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধির ভূমিকাকে খারিজ করে আইনের উৎস হিসাবে কেবল ঐশী গ্রন্থের কথা বলে আসলে দিনশেষে ‘আল্লাহর সার্বভৌমত্ব’ ধারণাকে স্বৈরতন্ত্রে পরিণত করা হয়। আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে তিনি জনগণের সার্বভৌমত্ব ও ‘খলিফা’ হিসেবে মানুষের স্বাধীনতা ও স্বাধীন চিন্তার অন্তরায় বলে মনে করেন না। আবু এল ফাদল যুক্তি দেন যে কোনো রাষ্ট্র যদি দাবি করে সে ‘আল্লাহর আইন’ বাস্তবায়ন করছে, তবে তাকে অবধারিতভাবে এমন একটি অবস্থানে যেতে হয় যেখানে সে নিজেকে ঐশী পূর্ণতার প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করে। ধর্মতাত্ত্বিকভাবে এটি অত্যন্ত সমস্যাজনক এবং এক ধরনের মূর্তিপূজার শামিল (form of idolatry) হতে পারে। এই কারণেই তিনি মনে করেন, গণতন্ত্র ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কেননা গণতন্ত্র একদিকে মানুষের বিশেষ মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেয়, অন্যদিকে রাষ্ট্রকে কোনো ঐশী বৈধতার দাবিদার হতে দেয় না।
ফাদল আরেকটি গুরুতর বিষয় হাজির করেন একইভাবে। তিনি বলেন, ইসলামি আইনতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও গভীর আলোচনাগুলোর একটি হলো, আল্লাহর অধিকার ও মানুষের অধিকারের পার্থক্য। আল্লাহর অধিকার (হুকুকুল্লাহ) বলতে সেই সব অধিকারকে বোঝায়, যেগুলো আল্লাহ নিজের জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন। অর্থাৎ, এসব অধিকার লঙ্ঘনের শাস্তি কী হবে—তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই, এবং এসব অপরাধ ক্ষমা করার অধিকারও কেবল আল্লাহর। এসব অধিকার সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর কর্তৃত্ব ও বিচারাধীন, এবং মানুষ এখানে কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না; বরং আল্লাহ যেসব সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছেন, মানুষকে সেগুলোর অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু যেসব অধিকার আল্লাহ নিজে স্পষ্টভাবে নিজের জন্য সংরক্ষণ করেননি, সেগুলো মানুষের অধিকার (হুকুকুল ইবাদ) হিসেবে বিবেচিত হয়। আর মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ক্ষমা করার অধিকারও মানুষেরই থাকে। অর্থাৎ, আল্লাহর অধিকার লঙ্ঘিত হলে তা ক্ষমা করেন আল্লাহ নিজে—তাও যথাযথ তওবা বা অনুশোচনার মাধ্যমে। কিন্তু মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হলে তা ক্ষমা করতে পারেন কেবল সেই ব্যক্তি, যার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। ইসলামি আইনশাস্ত্রের ঐতিহ্যে মুসলিম ফকিহদের বরাতে তিনি বলেন, যদিবা কখনো আল্লাহর অধিকার ও মানুষের অধিকার পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠে, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের অধিকারকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এর যুক্তি হলো, মানুষ তার অধিকার নিয়ে এই পৃথিবীতেই বেঁচে থাকে এবং সেই অধিকার রক্ষা করাই তার বাস্তব প্রয়োজন। অন্যদিকে আল্লাহ মানুষের কল্যাণের জন্যই নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন, এবং প্রয়োজনে আল্লাহ পরকালে নিজ অধিকার নিজেই প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। তবে, তিনি এখানে অধিকারের ধারণাকে ইসলামি ঐতিহ্য থেকে আরও সম্প্রসারিত করতে চান। আগে যেখানে ‘অধিকার’ তৈরি হতো ‘একটি নির্দিষ্ট অন্যায় সংঘটিত হওয়ার পর’, সেখানে এখন তিনি অধিকারকে ‘মানুষের স্বাভাবিক ও জন্মগত সম্পত্তি’ হিসেবে কল্পনা করার কথা বলেন। অর্থাৎ, অধিকারকে এমন কিছু হিসেবে দেখতে হবে যা কোনো ক্ষতির শিকার হওয়ার আগেই মানুষের রয়েছে। ফাদল বলেন, “মানুষের অধিকার যে দুনিয়াতে আল্লাহর অধিকারের ওপর অগ্রাধিকার পায়, এই ধারণার অর্থ কখনোই এই নয় যে আল্লাহর অধিকার অস্বীকার করা হচ্ছে। বরং এর অর্থ হলো, আল্লাহ চাইলে পরকালে তার অধিকার নিজেই প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম, কিন্তু দুনিয়াতে আমাদের দায়িত্ব হলো মানুষের এমন অধিকারগুলো চিহ্নিত ও প্রতিষ্ঠা করা, যা একটি ন্যায়ভিত্তিক জীবন নিশ্চিত করে এবং একই সঙ্গে আল্লাহর ঘোষিত অধিকারের প্রতি যথাসম্ভব সম্মান প্রদর্শন করে। এই প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার রক্ষার প্রতি অঙ্গীকার মানে আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস বা অবাধ্যতা নয়। বরং তা হলো মানব বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়া, আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা, করুণাকে বাস্তবায়ন করা এবং সর্বোপরি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রসর হওয়ার এক অপরিহার্য শর্ত।” (পৃ. ২৮)
ছবি: খালেদ আবু এল ফাদল
এখানে ফাদল আরেকটি অপ্রচলিত মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, অনেক সময় অনুমান করা হয় যে, ইসলামে ব্যক্তিগত অধিকারের বিকাশে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে ইসলামের প্রাক-আধুনিক ফিকহি ঐতিহ্য। কিন্তু আদতে তা নয়, বরঞ্চ তার মতে, সবচেয়ে গুরুতর প্রতিবন্ধকতা এসেছে আধুনিক মুসলিম সমাজ থেকেই। তিনি মনে করেন যে, গত শতকের দ্বিতীয়ার্ধে অনেক মুসলমান পণ্ডিত এমন ভিত্তিহীন ধারণা তৈরি করেছেন যে, ইসলামি আইন মূলত দায়িত্বকেন্দ্রিক, অধিকারকেন্দ্রিক নয়; এবং ইসলামে অধিকারের ধারণা সমষ্টিগত (collectivist), ব্যক্তিগত (individualist) নয়। তার মতে, মূলত পশ্চিমা বা অ-পশ্চিমা সংক্রান্ত পূর্বানুমানগুলোকে জল-অচল সম্পর্কিত করে ভাবার কারণে এই ধারণাগুলো তৈরি হয়েছে। এই ধরনের ব্যাখ্যাকারীরা ইহুদি-ঈসায়ি বা পশ্চিমা ‘অধিকার’-এর ধারণার সঙ্গে আটকে গিয়ে ধরে নিয়েছেন যে, ইসলাম অবশ্যই এর থেকে আলাদা হতে হবে। ফলে, তারা যেহেতু অধিকারের কথা বলে, আমাদেরকে অবশ্যই ‘অন্য’ কিছু বলতে হবে।
অনেকেই রাশিদ আল ঘানুচ্চি, ইউসুফ আর কারজাভিদের মতো পণ্ডিতদের সাথে ফাদলের আলাপকে তুলনা করলে, ফাদল সচেতনভাবে তাদের অবস্থানের চেয়ে নিজের অবস্থানের ফারাক পষ্ট করেন। তিনি বলেন, বাকিদের মতো তিনি মনে করেন না যে, ইসলামই গণতন্ত্র সবার আগে প্রতিষ্ঠা করেছে, এবং ইসলামের প্রথম যুগের কিছু অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গণতন্ত্রের একরৈখিক কোনো আখ্যানে তার আস্থা নেই। গণতন্ত্র ইসলামের ট্র্যাডিশনাল বোঝাপড়ার প্রতি যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়, তাকে মোকাবিলা করার সিরিয়াস কোনো কোশেশও তাদের নেই বলে মনে করেন তিনি। বাকিরা যেখানে ইসলামি রাষ্ট্রের পক্ষে ওকালতি করেন, খোদার নামে শরিয়া আইন প্রয়োগের কথা বলেন, ফাদল উলটো মনে করেন, এমন কোনো ধরনের রাষ্ট্র আদতে মূর্তিপূজার শামিল (form of idolatry)। তারা ব্যক্তির অধিকারের পক্ষে ফাদলের মতো অতোটা সোচ্চারও নন।
আগেই বলেছি, ফাদলের প্রবন্ধের ওপর বেশ সিরিয়াস বাৎচিত ও বাহাস শুরু হয়। নাদের হাশেমি ও জেরেমি ওয়াল্ড্রন ফাদলের অবস্থানের প্রশংসা করেন। অন্যদিকে, মোকতেদার খান শরিয়াকে ‘কেন্দ্রে’ রাখার সমালোচনা করে বলেন, এতে মুসলিম ফকিহদের একনায়কত্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তিনি বরঞ্চ মদিনার চুক্তির দিকে জোরারোপ করেন। অন্যদিকে, মোহাম্মদ এইচ ফাদেল মনে করেন, আবু এল ফাদল ‘ঐতিহ্য’ (tradition) থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছেন। আবার, কেভিন রেইনহার্ট, সাবা মাহমুদ এবং উইলিয়াম বি কুয়ান্টের যুক্তি হলো: রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ঐতিহাসিক শক্তি এবং পশ্চিমা লিবারেলবাদের আধিপত্য ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক ফলাফল নির্ধারণে বেশি প্রভাবশালী।
ছবি: নাদের হাশেমি
এখানে দুজনের বিষয়ে একটু বিস্তারিত আলাপ করা যেতে পারে: একজন প্রশংসা করেছেন, আরেকজন সমালোচনা করেছেন। ফাদলের আলাপের ভূয়সী প্রশংসা করেন নাদের হাশেমি। নাদের হাশেমি কেন প্রশংসা করলেন, এটা তার কাজ থেকেই আন্দাজ করা যায়। তিনি লিবারেল গণতন্ত্রের সাথে ধর্মের, বিশেষত ইসলামের, সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেছেন। ধর্মীয় রাজনীতির সাথে লিবারেল গণতান্ত্রিক বিকাশের জল-অচল সম্পর্ককেই প্রশ্নবিদ্ধ করার কোশেশ করেছিলেন তিনি। তার প্রশ্নই ছিল, মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় লিবারেল গণতন্ত্র কীভাবে ফাংশন করবে, যে গণতন্ত্রের জন্য কিনা একরনের সেকুলারবাদের জরুরত রয়েছে। তার তিনটা প্রধান যুক্তি ছিল। প্রথমত, ধর্ম যে সমাজে পরিচয়ের অন্যতম প্রধান নির্ধারক, সেখানে সেকুলারবাদের একধরনের ধর্মভিত্তিক তত্ত্ব গড়ে তোলা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় রাজনীতির দরজা বাদ দিয়ে লিবারেল গণতন্ত্রের দিকে যাওয়া সম্ভব হবে না। ফলে, সরকারব্যবস্থায় ধর্মের নরম্যাটিভ ভূমিকা নিয়ে দরকষাকষি ও মুলামুলি এই বিকাশের অন্তর্নিহিত অংশ। তৃতীয়ত, গণতন্ত্রীকরণ ও লিবারেলকরণের জন্য ধর্মকে একেবারে খারিজ না করে ধর্মীয় ধারণাগুলোর নানাবিধ ব্যাখ্যা ও তফসির করা জরুরি। নাদের হাশেমি তার কাজে যে ধরনের বোঝাপড়া তৈরির কথা বলেছিলেন, ফাদলের প্রবন্ধ যেন তারই এক দুর্দান্ত নজির। ফলে তিনি এর প্রশংসা করেন।
অন্যদিকে, বেশ কড়া সমালোচনা আসে প্রখ্যাত নৃবিজ্ঞানী সাবা মাহমুদের কাছ থেকে। সাবা মাহমুদ প্রশ্ন করেন, লিবারেলবাদই কি ইসলামের একমাত্র দিশা/পন্থা? ইউরোপীয় মূল্যবোধের সাথে খাপ খাচ্ছে কিনা—ইসলামকেই কেন নিজের ব্যাপারে সেটা প্রমাণ করার দায়িত্ব নিতে হবে? তিনি ইন্ডিভিজুয়ালিজমের বাইরে ইসলামের ইতিহাসে থাকা সামষ্টিক অধিকারের প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেন। পাশাপাশি, লিবারেলবাদের ভেতরে থাকা সহনশীলতারও একটি সহিংস ইতিহাস ও যাত্রার দিকে ইঙ্গিত করেন। ফাদলের প্রবন্ধকে দার্শনিক চর্চার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ মান্য করেই সাবা মাহমুদ আরেকটি সমালোচনা করেন—ফাদল মুসলমান দুনিয়ার আরেকটি বাস্তবতাকে আমলে নেননি। মুসলমান দুনিয়ায় যে সকল প্রবল স্বৈরাচারী শাসক শাসন ক্ষমতায় রয়েছে, তারা কোনো না কোনোভাবে লিবারেল মার্কিন সরকারের মদদপ্রাপ্ত।
ছবি: সাবা মাহমুদ
পশ্চিমা মূল্যবোধের সার্বজনীনতাকে ক্রিটিক করতে গিয়ে ইসলামি মূল্যবোধকে প্রান্তিক হিসাবে উপস্থাপন করাকে ফাদল বিপজ্জনক বলে মনে করেন। ইসলামের স্বাতন্ত্র্যের উপর অতিরিক্ত জোরারোপ করতে গিয়ে খোদ ইসলামের অভিজ্ঞতার যে সার্বজনীনতা রয়েছে, সেটাই উপেক্ষিত থেকে যেতে পারে। পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হিসাবে ইসলামকে দাঁড় করিয়ে দেওয়াটাকে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখেন না। সেখানে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের (cultural relativism) বিপদও দেখেন। ফাদল উলটো অভিযোগ করেন, সাবা মাহমুদ ও অন্যান্যদের খেয়াল থাকে না যে, মুসলিম দুনিয়ার শাসকরা সামষ্টিক অধিকারের ধুয়ো তুলেই নাগরিকদের উপর ক্রমাগত নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র ও সমাজের নিপীড়ন থেকে ব্যক্তিকে হেফাজত করাকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
বইয়ের হদিস
Khaled Abou El Fadl, Islam and the Challenge of Democracy, Princeton University Press, 2004
Nader Hashemi, Islam, Secularism, and Liberal Democracy: Toward a Democratic Theory for Muslim Societies, Oxford University Press, 2009
লেখক পরিচিতি: সহুল আহমদ, লেখক ও গবেষক। ই-মেইল: sohul.munna118@gmail.com
ইসলাম ও গণতন্ত্র: একটি বাহাসের সন্ধানে