জন লকের ‘টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট’: আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রূপরেখা
নোট: রাজনৈতিক তত্ত্ব ও চিন্তার ইতিহাসে জন লক এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। বিশেষত, ১৬৮৯ সালে প্রকাশিত তার ‘টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট’ গ্রন্থটি আধুনিক রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রশাস্ত্রে এক অসামান্য সংযোজন। এই গ্রন্থকে বলা যেতে পারে আধুনিক লিবারেল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ‘বাইবেল’। লক তার এই বইয়ে মানুষের সহজাত অধিকার, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সামাজিক চুক্তি, শাসনের সীমাবদ্ধতা, এবং জনগণের প্রতিরোধ ও অংশগ্রহণের অধিকার নিয়ে বিশদভাবে আলোকপাত করেছেন। তিনি যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন যে, শাসকের ক্ষমতা দেবত্ব বা ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করতে পারে না; বরং তা জনগণের সম্মতি ও সাধারণ কল্যাণের ওপর নির্ভরশীল।
লকের ভাবনা ও তত্ত্ব শুধু আগের শতকগুলোতেই নয়, আজও আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সংবিধান, এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংক্রান্ত আলোচনায় বেশ প্রভাবশালী। তার এই কিতাব জনগণের অধিকার, শাসনের সীমা, আইন ও সরকারের দায়িত্ব নিয়ে চিন্তাভাবনা করার জন্য যুগান্তকারী দৃষ্টিকোণ প্রদান করে। আখড়ার পাঠকদের জন্য এখানে লকের ঐতিহাসিক বইটি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনার চেষ্টা করা হয়েছে। অনুবাদ ও বিশ্লেষণে জেরেমি ক্লেইডোস্টি এবং ইয়ান জ্যাকসন-এর ‘অ্যান অ্যানালাইসিস অব জন লকের টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট’ গ্রন্থের বিভিন্ন অংশের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। এআই-এর সাহায্যে এই অংশগুলো অনুবাদ ও সম্পাদনা করে পূর্ণাঙ্গ লেখাটি প্রস্তুত করেছে আখড়া টিম।
জন লক কে ছিলেন?
‘টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট’ কিতাবের প্রণেতা জন লক ১৬৩২ সালের ২৬ আগস্ট, ইংল্যান্ডের সামারসেট কাউন্টিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন আইনজীবী এবং ইংরেজ গৃহযুদ্ধ চলাকালে সংসদপন্থী সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। এই গৃহযুদ্ধটি রাজতন্ত্রের সমর্থক (যার নেতৃত্বে ছিলেন রাজা প্রথম চার্লস) এবং সংসদপন্থী সমর্থকদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। সংসদপন্থী শিবিরে ভালো অবস্থানের কারণে লকের বাবা তার পুত্রকে লন্ডনের মর্যাদাসম্পন্ন ওয়েস্টমিনস্টার স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে সক্ষম হন।
সেখান থেকে লক অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যান, যেখানে তিনি ১৬৫৬ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৬৫৮ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৬৭৪ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করার পর লক সে সময়ের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ আর্ল অব শ্যাফটসবারির চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন। তিনি চিকিৎসক হিসেবে কাজ করতে ফ্রান্সেও গিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে ইংরেজ সরকারের হয়ে কাজ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কেও কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
ইংল্যান্ডের এই গৃহযুদ্ধটি ১৬৪২ থেকে ১৬৫১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল এবং এর ফলে অনেকেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন—দেশের জন্য কোন ধরনের সরকার সবচেয়ে উপযুক্ত। বিশেষভাবে দু’জন ব্যক্তি, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক রবার্ট ফিলমার এবং দার্শনিক থমাস হবস, প্রায় একই সিদ্ধান্তে উপনীত হন। তাদের বিশ্বাস ছিল, সমাজে সবাইকে শৃঙ্খলার মধ্যে রাখতে কেবল একজন সার্বভৌম রাজাই সক্ষম, এবং (ফিলমারের মতে) সেই রাজার শাসন করার অধিকার ঐশী (যদিও হবস শেষোক্ত এই মতের সাথে দ্বিমত করেন। হবসের চিন্তা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন ‘আখড়া’র বেসিক কনসেপ্ট সিরিজের লেখা: ‘থমাস হবসের লেভিয়াথান’)। লক এই মতের সঙ্গে একমত ছিলেন না। এর বিরোধিতায় তিনি ‘টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট’ গ্রন্থটি রচনা করেন, আনুমানিক ১৬৭৯ থেকে ১৬৮৯ সালের মধ্যে। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় নামবিহীনভাবে, মূলত এ কারণে যে—ওই সময়ের প্রেক্ষিতে তার ধারণাগুলো ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত।
১৬৮৩ সালে খোদ লকের বিরুদ্ধেই ‘রাই হাউস ষড়যন্ত্র’-এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। এটি ছিল তৎকালীন রাজা দ্বিতীয় চার্লসকে হত্যার একটি পরিকল্পনা। যদিও চার্লস ছিলেন একজন প্রোটেস্ট্যান্ট, তবুও তিনি রোমান ক্যাথলিকদের প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল ছিলেন। আসলে তার ভাই জেমস নিজেই একজন ক্যাথলিক ছিলেন। রাই হাউস ষড়যন্ত্রকারীরা ছিলেন প্রোটেস্ট্যান্ট, যারা কঠোরভাবে ক্যাথলিক-বিরোধী ছিলেন এবং আশঙ্কা করছিলেন যে চার্লসের মৃত্যুর পর—যেহেতু তার কোনো উত্তরাধিকারী ছিল না—তার ভাই জেমস সিংহাসনে আরোহণ করবেন এবং এর মাধ্যমে দেশ আবারও একজন রোমান ক্যাথলিক শাসকের অধীনে চলে যাবে। চার্লসকে হত্যা করলে তারা রাজসিংহাসনে ক্যাথলিকদের প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে পারবেন বলে বিশ্বাস করেছিলেন। লকের ভূমিকা ছিল ষড়যন্ত্রে জড়িত অন্যতম প্রধান একজন সদস্যের জন্য থাকার ব্যবস্থা করা। তবে ষড়যন্ত্রটি ব্যর্থ হয়। এরপর চার্লস যখন কট্টর প্রোটেস্ট্যান্টদের বিরুদ্ধে কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেন, তখন লক বাধ্য হয়ে নেদারল্যান্ডসে পালিয়ে যান এবং সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন। ১৬৮৮ সালের কথিত ‘গ্লোরিয়াস রেভল্যুশন’-এর মাধ্যমে তৃতীয় উইলিয়াম ইংল্যান্ডের ক্ষমতা গ্রহণ করা পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন।
লেখকের পটভূমি
জন লক যখন ‘টু ট্রিটিজেস’ রচনা করেছিলেন, তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল খুবই উত্তেজনাপূর্ণ। যদিও গ্রন্থটি কখন লিখিত হয়েছিল—প্রায় ১৬৭৯ থেকে ১৬৮৯ সালের মধ্যে—সেটি স্পষ্ট নয়, তবে এর ঐতিহাসিক পটভূমি সহজে নির্ণয় করা যায়।
প্রথমে চার্লসের মৃত্যুর পর ইংল্যান্ড প্রায় ১৯ বছর রাজাহীন ছিল; তবে ১৬৬০ সালে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন রাজা দ্বিতীয় চার্লসকে সর্বত্র স্বাগত জানানো হয়নি। তার শাসনামলের শেষ দিকে, তার উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। দ্বিতীয় চার্লসের কোনো বৈধ উত্তরাধিকারী ছিল না, যার ফলে তার মৃত্যুর পর তার ভাই দ্বিতীয় জেমসের রাজা হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়—যা অনেকের কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিল। কারণ জেমস ছিলেন কর্তৃত্ববাদী; তিনি সংসদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানাতেন, এবং সবথেকে বড় কথা, তিনি ছিলেন একজন প্রকাশ্য রোমান ক্যাথলিক।
দ্বিতীয় চার্লস মারা গেলে ১৬৮৫ সালে দ্বিতীয় জেমস রাজা হন, তবে তার শাসনকাল তিন বছরের কম স্থায়ী হয়। তিনি ১৬৮৮ সালে দেশত্যাগ করেন, এবং তার স্থলে প্রোটেস্টান্ট উইলিয়াম অব অরেঞ্জ এবং তার স্ত্রী মেরিকে রাজা ও রাণী হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা ইতিহাসে ‘গ্লোরিয়াস রেভল্যুশন’ নামে পরিচিত।
এই কারণেই ‘টু ট্রিটিজেস’-এর প্রকাশকাল হিসেবে ১৬৮৯ সাল গুরুত্বপূর্ণ। দেশকে কীভাবে শাসন করা উচিত—এটি তখন জরুরি প্রশ্ন ছিল, কারণ দ্বিতীয় জেমসের শাসন ব্যর্থ হয়েছিল। লক, যিনি ১৬৮৩ সালে ‘রাই হাউস প্লট’-এ দ্বিতীয় চার্লসকে হত্যার ষড়যন্ত্রের মিথ্যা অভিযোগে দেশ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, ১৬৮৮ সালের ‘গ্লোরিয়াস রেভল্যুশন’ পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসে নির্বাসিত ছিলেন। পরে তিনি ভবিষ্যৎ রাণী মেরির সঙ্গে দেশে ফিরে আসেন। লক ‘টু ট্রিটিজেস’ কখন লিখেছিলেন তা স্পষ্ট না হলেও, ১৬৮৯ সালে বইটির প্রকাশিত হওয়া প্রমাণ করে যে, তখনও ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোটেও স্থিতিশীল ছিল না।
‘টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট’ কী বলেছিল?
যদিও সে সময় বিশ্বের অধিকাংশ দেশই কোনো না কোনো ধরনের রাজতন্ত্রের অধীনে শাসিত ছিল, তবু কেন এটা যুক্তিযুক্ত—এই প্রশ্নটি নিয়ে খুব একটা চিন্তাভাবনা করা হয়নি। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতা কোথায় নিহিত—এই প্রশ্নটি যুক্তরাজ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ সেখানে রাজার ক্ষমতার সীমা নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত সংঘটিত হয়েছিল।
১৬৪৯ সালে রাজা প্রথম চার্লসের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় এবং গৃহযুদ্ধটি সামগ্রিকভাবে ইংল্যান্ডের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ধ্বংসাত্মক প্রমাণিত হয়। যেহেতু ঘটনাটি তখনও মানুষের স্মৃতিতে তাজা ছিল, তাই এটি লকের রাজনৈতিক চিন্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি তৈরি করে। লক যখন ‘টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট’ রচনা করেন, তখন প্রথম চার্লসের পুত্র দ্বিতীয় চার্লস সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন, এবং রাজার কতটুকু ক্ষমতা থাকা উচিত—এই পুরোনো প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে।
অনেকে মনে করেছিলেন, গৃহযুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে একজন শক্তিশালী রাজা অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, ফিলমার ও হবসের মতো চিন্তাবিদরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, রাজা ছাড়া দেশ ভেঙে পড়বে। ‘টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট’ গ্রন্থের শুরুতেই লক রাজার ক্ষমতার উৎস নিয়ে ফিলমারের সঙ্গে বিতর্কে অবতীর্ণ হন। লকের মতে, রাজার শাসন করার অধিকার খোদার কাছ থেকে আসে না; বরং তা আসে যাদের তিনি শাসন করেন—সেই জনগণের কাছ থেকেই।
আর লক কেবল ইংল্যান্ডের জনগণের জন্য কোনটি সর্বোত্তম, তা নিয়েই লেখেননি। তিনি তার যুক্তিকে সার্বজনীন রূপ দেন—অর্থাৎ পৃথিবীর সর্বত্র সব মানুষের অধিকার সম্পর্কেই তার বক্তব্য প্রযোজ্য বলে উপস্থাপন করেন। তিনি বাইবেলের ভাষা, বিজ্ঞানের ভাষা এবং এমনকি হবসের ভাষাও ব্যবহার করেন—যদিও হবসের সব মতের সঙ্গে তিনি একমত ছিলেন না। ‘টু ট্রিটিজেস’-এ লক বাস্তব ইতিহাস নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করেন নাই; বরং সমাজ সম্পর্কে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করতে তিনি একটি কল্পিত ও অনুমাননির্ভর ইতিহাসের আশ্রয় নেন।
লকের মতে, মানুষের জীবন শুরু হয়, তার ভাষায়, ‘প্রাকৃতিক অবস্থা’-তে। তার যুক্তি অনুযায়ী, সমাজের উদ্ভব ঘটেছিল মূলত এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যে, কে কোন সম্পত্তির মালিক হবে। সম্পত্তির ধারণাটি লকের চিন্তায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে, প্রাকৃতিক অবস্থাতে সবকিছুই ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত এবং কেউই কোনো কিছুর মালিক ছিল না। কিন্তু যদি তা-ই সত্য হয়, তবে সম্পত্তির ধারণার জন্ম হলো কীভাবে—এই প্রশ্নটি লক তোলেন।
এর উত্তরে তিনি বলেন: একসময় মানুষ, অন্যের প্রয়োজন মেটানোর মতো যথেষ্ট জিনিস রেখে, যতখুশি ভোগ করতে পারত। মানুষের সংখ্যা কম থাকাকালে এটি কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু জমি ও সম্পদের প্রাপ্যতা যখন ক্রমে কমে আসতে লাগল, তখন সবার জন্য যথেষ্ট রেখে দেওয়ার ধারণাটি আর বাস্তবসম্মত রইল না। লকের মতে, তখন কিছু মানুষ তাদের কাছে যেটুকু ছিল, সেটুকুর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কঠোর পরিশ্রম শুরু করল। উদাহরণ হিসেবে তিনি একজন কৃষকের কথা বলেন—যিনি নিজের শ্রমকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে এত বেশি উৎপাদন করেন, চাষাবাদ ছাড়া স্বতস্ফূর্তভাবে যে উৎপাদন অসম্ভব। এভাবেই মালিকানার ধারণার প্রাথমিক বীজ রোপিত হয়।
কিন্তু সম্পত্তির একটি বড় সমস্যা ছিল—যে কেউ তা চুরি করতে পারত। তাই চোরের হাত থেকে সম্পত্তি রক্ষার জন্য আইন প্রণয়ন জরুরি হয়ে ওঠে। আইন কার্যকর রাখতে হলে তা প্রয়োগ করার ব্যবস্থাও দরকার, ফলে মানুষের জন্য এমন এক ধরনের সরকারব্যবস্থা জরুরি হয়ে ওঠে, যা সকলের নতুন নিয়ম মেনে চলার ব্যাপারটা নিশ্চিত করবে। মানব ইতিহাসের দীর্ঘ সময়জুড়ে এর অর্থ ছিল এমন একজন রাজার উপস্থিতি, যিনি সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারবেন।
লকের মৌলিক অবদান হলো, এই ব্যবস্থাটিকে তিনি এক ধরনের চুক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। মানুষ যদিও তাদের অধিকার পুরোপুরি হারায়নি, তবু রাজার কাছ থেকে সুরক্ষা পাবার বিনিময়ে তারা কিছু অধিকার ত্যাগ করেছিল। রাজা নিশ্চিত করবেন যে মানুষ একে অপরের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করছে—কিন্তু লকের দৃষ্টিতে এর অর্থ এই নয় যে, রাজা আইনের ঊর্ধ্বে। বরং এই চুক্তি দ্বিমুখীভাবে কার্যকর। যদি রাজা আইন মেনে না চলেন, তবে তার পরিবর্তে অন্য কারও শাসন করা উচিত।
গ্রন্থের প্রেক্ষাপট
লিবারেলবাদী রাজনৈতিক দর্শনের সূত্রপাত—যার শেকড় আমরা জন লকের ‘টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট’ গ্রন্থে খুঁজে পাই—একটি নির্দিষ্ট ধারণাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত: ব্যক্তির অধিকার।
যেহেতু সাধারণভাবে সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, মানুষকে ইচ্ছেমতো কাজ করার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া যায় না, তাই স্বাভাবিকভাবেই সরকারের হাতে কিছু ক্ষমতা থাকা দরকার—যাতে নৈরাজ্য সৃষ্টি না হয়; অর্থাৎ এমন একটি সমাজ তৈরি না হয়, যেখানে কোনো সরকার বা আইন নেই। আজ অধিকার ও স্বাধীনতার ধারণা খুবই স্বাভাবিক বলে মনে হলেও, ১৬৮৯ সালে ‘টু ট্রিটিজেস’ প্রকাশিত হওয়ার সময় বিষয়টি মোটেও এমন ছিল না। বাস্তবে অনেক মানুষই মনে করত যে, রাজা আইনের ঊর্ধ্বে। যদিও এই ধারণাটি ইংল্যান্ডের তুলনায় ফ্রান্সে বেশি প্রচলিত ছিল—কারণ ইংরেজরা অনেক আগে থেকেই কিছু ঐতিহ্যগত নাগরিক স্বাধীনতা ভোগ করত (তারা কেবল সেই আইনগুলোর অধীন ছিল, যা সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য সম্মতিসূচকভাবে প্রণীত হতো)।
১৬৪২ থেকে ১৬৫১ সাল পর্যন্ত সংঘটিত ইংরেজ গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল মূলত এই প্রশ্নকে ঘিরে যে, প্রথম চার্লস কর আরোপের বিষয়ে সংসদের কাছে জবাবদিহি করবেন কি না। রাজাদের জবাবদিহির আওতায় আনার ব্যাপারটি তখনকার সময়ের তুলনায় অনেক অগ্রসর একটি ধারণা ছিল। বাস্তবে লকের চিন্তাধারা কার্যকর রূপ পায় আরও পরে—১৭৭৫ থেকে ১৭৮৩ সালের মধ্যে সংঘটিত আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের পর। ততদিনে দার্শনিক ডেভিড হিউমের মতো চিন্তাবিদরা লকের ধারণাগুলোকে আরও বিকশিত করেছিলেন।
লকের এই গ্রন্থের ফলে সম্পত্তি, স্বৈরাচার এবং রাজনৈতিক বিদ্রোহ—এই বিষয়গুলো প্রথমবারের মতো নিছক বিমূর্ত ধারণা হিসেবে নয়, বরং বাস্তব জীবনের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে। সেসময় এগুলো ছিল এমন প্রশ্ন, যা বাস্তব ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত; এবং এই প্রশ্নগুলো বিশেষত ইংল্যান্ডে বহু মানুষের জীবনে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলেছিল। একই সঙ্গে, লক কিছু সাধারণ নীতিমালার ওপর জোর দিয়েছেন, যা বিভিন্ন ধরনের সরকারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক বিশ্বাস কীভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত—তা ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করে। এর ফলে তার ধারণাগুলো সহজেই এমন প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়, যা হয়তো তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র থেকে অনেক ভিন্ন।
আলাপের সাধারণ পরিসর
জন লক ‘টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট’ রচনা করেছিলেন এমন এক সময়ে, যা ছিল রাজনৈতিক বিপ্লব ও বিতর্কে ভরপুর। ফলে এটা স্বাভাবিক বিষয় যে, দার্শনিক হিসেবে স্রেফ তিনি একাই এই প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবিত ছিলেন না। রবার্ট ফিলমার এবং থমাস হবস—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদও একই ধরনের কিছু প্রশ্ন নিয়ে কাজ করেছিলেন, তবে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
ফিলমারের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘প্যাট্রিয়ার্কা’ তার মৃত্যুর পর ১৬৮০ সালে প্রকাশিত হয়; এবং এটি লকের রচনার মতোই তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতার ফসল। সংসদ ও প্রথম চার্লসের মধ্যকার সেই দ্বন্দ্বের পটভূমিতে ‘প্যাট্রিয়ার্কা’ রাজাদের শাসনের পক্ষে একটি বাইবেলভিত্তিক যুক্তি উপস্থাপন করে। ফিলমার পরিবারকে একটি আদর্শ মডেল হিসেবে দেখান, যেখানে পিতা সিদ্ধান্ত নেন এবং মৃত্যুর পর সেই ক্ষমতা তার জ্যেষ্ঠ পুত্রের কাছে হস্তান্তর করেন। যদিও ফিলমারই একমাত্র দার্শনিক নন যিনি রাজাদের ঐশী অধিকার—অর্থাৎ খোদাকর্তৃক নির্বাচিত হওয়ার কারণে এককভাবে শাসন করার অধিকার—সমর্থন করেছিলেন, তবু লক বিশেষভাবে তাকেই লক্ষ্যবস্তু বানান। বাস্তবে ‘টু ট্রিটিজেস’-এর প্রথম প্রবন্ধটি ফিলমারের চিন্তার সরাসরি বিরোধিতায় লেখা।
হবস ছিলেন ফিলমারের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির চিন্তাবিদ। তার ১৬৫১ সালের গ্রন্থ ‘লেভিয়াথান’ ইংরেজ গৃহযুদ্ধের বিশৃঙ্খল সময়ে লেখা হয়। এই গ্রন্থে হবস ‘সামাজিক চুক্তি’ ধারণাটি উপস্থাপন করেন। এই ধারণা অনুযায়ী, একটি সমাজ তখনই সরকার গঠন করে, যখন জনগণ নিজেদের জীবন ও কিছু মৌলিক অধিকার সুরক্ষার জন্য একজন শাসক বা শাসকগোষ্ঠীর অধীনে শাসিত হতে সম্মত হয়। এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে এই ইঙ্গিত যে, যে সরকার তার দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়, তার বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ।
এই ধারণার গুরুত্ব সম্পর্কে যা-ই বলা হোক, কম বলা হবে। সামাজিক চুক্তির ধারণাকেই আধুনিক পাশ্চাত্য রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি হিসেবে দেখা যায়। হবসও ফিলমারের মতো রাজাদের অধিকারের পক্ষে যুক্তি দেন, তবে ধর্মতাত্ত্বিক নয়, বরং ব্যবহারিক দিক থেকে। গৃহযুদ্ধের বিশৃঙ্খলার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে হবস বিশ্বাস করতেন যে, রাজাই সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখেন; আর জনগণের বিদ্রোহই দেশকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়।
লকের দ্বিতীয় প্রবন্ধের শিরোনামেই বলা আছে যে, এর উদ্দেশ্য হলো ‘গণতান্ত্রিক সরকারের প্রকৃত উৎস, বিস্তার এবং উদ্দেশ্য’ বোঝা। রাষ্ট্রের উৎপত্তি, সম্রাটের ক্ষমতা সীমিতকরণের জরুরত, কর্তৃত্বকে আইনের সমার্থক করে তোলার প্রয়োজনীয়তা, এবং রাজনৈতিক ও সম্পত্তির অধিকার রক্ষার গুরুত্ব—এই সবকিছুই লকের মূল চিন্তার প্রতিফলন।
এই প্রবন্ধটি হবসের বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি পাল্টা যুক্তি ছিল না। কারণ হবসও একদিকে মনে করতেন যে ক্ষমতা তখনই বৈধ, যখন তা জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়; এবং অন্যদিকে বিশ্বাস করতেন যে, আইন দ্বারা নিষিদ্ধ নয়—এমন যে কোনো উপায়ে কাজ করার স্বাধীনতা মানুষের থাকা উচিত। তাদের পার্থক্য ছিল মূলত ব্যবহারিক প্রশ্নে।
হবস ‘প্রাকৃতিক অবস্থা’-কে দেখেছিলেন এক সহিংস বাস্তবতা হিসেবে, যেখানে মানুষের জীবন “নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, নোংরা, নিষ্ঠুর ও সংক্ষিপ্ত।” হবসের রচনায় ‘লেভিয়াথান’ বলতে বোঝানো হয়েছে রাজাকে—যিনি মানুষকে একদিকে পরস্পরের হাত থেকে এবং অন্যদিকে নিজেদের ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি থেকেও রক্ষা করেন। তার মতে, মানবসমাজ রাজকর্তৃক প্রদত্ত সুরক্ষার বিনিময়ে নিজেদের প্রাকৃতিক অধিকার রাজার হাতে তুলে দেয়।
একাডেমিক প্রভাবসমূহ
জন লকের ‘টু ট্রিটিজেস’-এর মূল্যায়ন করতে গেলে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মীদের বিশেষ বৌদ্ধিক প্রভাব থেকে এর বক্তব্যকে আলাদা করে দেখা প্রায় অসম্ভব।
লকের শিক্ষা, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং পারিবারিক পটভূমি তাকে এমন একটি রাষ্ট্রতত্ত্ব অনুসন্ধানে প্রণোদিত করেছিল, যা প্রকৃতি ও সমাজ—উভয় থেকেই উদ্ভূত। ধর্মীয় যুক্তির ভিত্তিতে রাজা বা সংসদের ক্ষমতাকে বৈধতা দিতে চাওয়া চিন্তাধারার সামনে তার প্রস্তাবনাগুলো ছিল এক গুরুতর চ্যালেঞ্জ। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে লকের সংশ্লিষ্টতা এবং আর্ল অব শ্যাফটসবারি ও রাষ্ট্রনায়ক লর্ড জন সোমার্সের মতো ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব তাকে র্যাডিক্যাল বা অগ্রসর চিন্তাভাবনা বিনিময়ের সুযোগ করে দেয়।
লক জন্মগ্রহণ করেছিলেন এক পরিবর্তনশীল সময়ে। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর ধারণা দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ইউরোপীয় চিন্তাধারায় প্রাধান্য বিস্তার করে ছিল। কিন্তু লকের সমসাময়িক দার্শনিক রেনে দেকার্তের মতো চিন্তাবিদরা এই শাস্ত্রীয় চিন্তাকে প্রশ্ন করতে এবং নতুনভাবে রূপ দিতে শুরু করেছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে লকের ধারণাগুলোকে হবসের চিন্তার একটি বিকশিত রূপ হিসেবে দেখা যায়—যা একদিকে যুগের ঘটনাপ্রবাহ থেকে এবং অন্যদিকে সময়ের বৌদ্ধিক চেতনা থেকে অনুপ্রাণিত ছিল।
আলোকায়নের যুগের যুক্তিবাদী চেতনা নতুন নতুন ধারণা সামনে নিয়ে আসছিল; এবং মানুষকে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত প্রথা ও বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে উৎসাহিত করছিল। লক হয়তো এমন একটি সমসাময়িক শাসনব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছিলেন, যেখানে সীমিত ক্ষমতাসম্পন্ন একজন রাজা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন—যেমনটি সরকারের ভেতরে থাকা তার কিছু বন্ধু-বান্ধবের চাওয়া ছিল। তবে তার ধারণাগুলোর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সপ্তদশ শতকের ইংল্যান্ডের রাজনীতির সীমানা ছাড়িয়ে আরো বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
মূখ্য বিষয়বস্তু
জন লকের ‘টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট’ গ্রন্থের প্রধান বিষয়বস্তু হচ্ছে: রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎপত্তি, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ক্ষমতার ভূমিকা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, এবং কোন কোন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাকে উৎখাত বা পরিবর্তন করা যেতে পারে। এই প্রধান থিমগুলোর মধ্যে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেমন—সম্পত্তির অধিকার, দাসপ্রথা, পিতৃত্বের ক্ষমতা, এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার বিভাজন।
লকের থিমগুলোর উদ্ভব ও বিকাশকে দুটি ভাগে বোঝা সবচেয়ে সুবিধাজনক:
- প্রথম প্রবন্ধ: এখানে তিনি সম্রাটের পরম ক্ষমতার পক্ষে রাজনৈতিক চিন্তাবিদ রবার্ট ফিলমারের যুক্তিগুলো তুলে ধরেন। ফিলমার এই ক্ষমতাকে, সমগ্র মানবজাতির পিতার ভূমিকা পালনকারী আদমের বাইবেলভিত্তিক কাহিনী থেকে উদ্ভূত হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। নিকোলো মাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’-এ যেভাবে শাসকের ক্ষমতা লাভের বিভিন্ন উপায় তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, লক ঠিক সেভাবেই আদমের পরম ক্ষমতা সংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি এবং কিভাবে এগুলো ধাপে ধাপে ইংরেজ রাজতন্ত্রকে ন্যায্যতা দানকারী যুক্তিকাঠামোতে পৌঁছেছে—তা বিশ্লেষণ করেন, এবং একে ধ্বংসাত্মকভাবে চ্যালেঞ্জ করেন।
- দ্বিতীয় প্রবন্ধ: লক এসব থিমেরই অনেকগুলো নিয়ে আবার আলাপ করেছেন, তবে একটি বিবর্তনমূলক পদ্ধতিতে। তিনি আদিম সমাজব্যবস্থা এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও অর্থ ব্যবস্থার বিকাশ থেকে ধাপে ধাপে রাজনৈতিক ক্ষমতার উত্থানকে ব্যাখ্যা করেন। এই পদ্ধতি পাঠককে লকের মানবপ্রকৃতি, সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কিত অনুমানগুলো সম্পূর্ণভাবে বোঝার সুযোগ দেয়, এবং রাষ্ট্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল তা স্পষ্ট করে।
এই অনুমানগুলো সংজ্ঞায়িত ও ব্যাখ্যা করার পর লক বিশ্লেষণ করে দেখান যে, কিভাবে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইন প্রণয়নকারী শক্তি এবং আইন প্রয়োগকারী শক্তি—এই দুই ভাগে বিভক্ত করা উচিত, রাষ্ট্রের নেতৃত্ব কিভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারে, এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করার জন্য সমাজ কী করতে পারে।
ধারণাগুলোর বিস্তার
যেহেতু লকের মূল থিমগুলো ক্ষমতার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, তাই মানুষের অধিকারকে তার এই টেক্সটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। লক কোনো নিখুঁত স্বাধীন সমাজের পক্ষে ছিলেন না; বরং তিনি সরকার ও জনগণের মধ্যে একটি চুক্তির ধারণা প্রস্তাব করেছিলেন।
বইটির প্রথম প্রবন্ধ ও দ্বিতীয় প্রবন্ধের যুক্তিতর্ক ও আলোচ্য বিষয় ভিন্ন ভিন্ন, যদিও প্রথম প্রবন্ধ দ্বিতীয় প্রবন্ধের আলাপকে সমর্থন যোগায়।
সপ্তদশ শতকের ইংল্যান্ডের মতো গভীরভাবে ধর্মনির্ভর সমাজে, লকের পাঠকদেরকে অবশ্যই ‘খোদার নিয়োগপ্রাপ্ত সম্রাট’ ধারণার সমস্যাজনক দিকগুলোর মুখোমুখি হতে হতো: যদি রাজার ক্ষমতা খোদা থেকে আসে, তাহলে এই ক্ষমতার যেকোনো সীমাবদ্ধতা তো খোদার ইচ্ছার বিপরীত ব্যাপার হওয়ার কথা (এটি নিরঙ্কুশতাবাদ নামে পরিচিত)।
রাজা তার ক্ষমতা বাইবেলে বর্ণিত আদি মানব আদম থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন—ফিলমারের এই বিশ্বাসকে ব্যঙ্গ করে লক ধারণাটিকে প্রত্যাখ্যান করেন। লক যুক্তি দেন যে, আদম কখনো তার বংশধরদের কোনো ক্ষমতা দিয়ে যাননি; এবং ঐতিহাসিকভাবে তার যথার্থ উত্তরাধিকারী চিহ্নিত করা আসলে অসম্ভব।
ধর্মের প্রভাব কম—এমন যুগে ও সমাজে এই ধরনের পর্যবেক্ষণ সম্ভবত অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু লকের সমসাময়িকদের জন্য এই ধারণা, নির্দিষ্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে সরকারকে বৈধ/অবৈধ ঘোষণা করার সুযোগ ও স্বাধীনতা তৈরি করে দেয়। এটি (ক্ষমতার) বৈধতার সীমা, বিশেষত ঠিক কখন রাষ্ট্রের নেতৃত্ব এবং প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবর্তন করা বৈধ—সে বিষয়ে আলোচনার সুযোগ এনে দেয়।
এই নিরঙ্কুশতাবাদকে প্রত্যাখ্যানের পর লক এমন একটি কাল্পনিক বিবরণ দেন যা দেখায়—কিভাবে সমাজ একটি রাজনৈতিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
১৬৮৮ সালের ‘গ্লোরিয়াস রেভল্যুশন’—যেখানে ক্যাথলিক রাজা দ্বিতীয় জেমসকে সরিয়ে প্রোটেস্ট্যান্ট রাজা তৃতীয় উইলিয়াম এবং তার স্ত্রী রানি দ্বিতীয় মেরি ক্ষমতা গ্রহণ করেন—লকের মূল থিমটি বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ‘সচেতনভাবে বাদ দেওয়া’ পটভূমি প্রদান করে। যদি আপনি মনে করেন যে জেমস তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, তাহলে লকের চিন্তাধারা তার উৎখাতকে যৌক্তিকতা প্রদান করে। আবার দেখা যায় যে উইলিয়াম ও মেরি, সংসদের আইনের অধীনে থাকার কারণে, লকের সুশাসনের মডেলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
তবে সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সাথে ‘টু ট্রিটিজেস’-এর সম্পর্ক বইটির কেন্দ্রীয় থিমের সার্বজনীন আবেদনকে হ্রাস করতে পারে নি। সরকার সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করে এবং সরকারের ক্ষমতার উৎস জনগণ—এই ধারণা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও যৌক্তিক উপসংহারে পৌঁছানো যায়: জনগণ যা দিয়েছে, জনগণ সেটা ফেরতও নিতে পারে। ক্ষমতার অপব্যবহার করলে শাসককে পরিবর্তনের অধিকার এখনও গ্রন্থটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ধারণাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
অন্যান্য বিষয়বস্তু
জন লকের ‘টু ট্রিটিজেস’-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গৌণ থিম হলো ঔপনিবেশিকতা এবং দাসপ্রথা, যেগুলো লকের বিস্তৃত যুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।
দাসপ্রথা সংক্রান্ত আলোচনাগুলো আনা হয়েছে মূলত খোদাপ্রদত্ত ক্ষমতা—ঐশী অধিকার বা নিরঙ্কুশতাবাদ তত্ত্বের বিপদগুলো দেখানোর জন্য। লকের বিশ্বাস অনুযায়ী, “একজন মানুষ, যিনি নিজের জীবন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখেন না, তিনি চুক্তি বা নিজের সম্মতির মাধ্যমে নিজেকে কারো দাস বানাতে পারেন না, কিংবা এমন কারো পরম, মনমাফিক ক্ষমতার অধীনে নিজেকে রাখতে পারেন না, যে তাকে যখন ইচ্ছা হত্যা করতে পারে।”
এখানে লক প্রাকৃতিক অধিকার-এর ভিত্তি স্থাপন করছেন—যে ধারণা শেষ পর্যন্ত দাসপ্রথাকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাতিল করে দিয়েছিল। লকের অনেক চিন্তার ক্ষেত্রেই এটা ঘটেছে—তিনি একটি আদর্শ রাষ্ট্রের কথা বর্ণনা করছেন; আর বহু বছর পর সেটা বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
আমেরিকা এবং এখানকার আদিবাসীদের প্রসঙ্গটি লকের এই বিশ্বাসের সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে, রাজনৈতিক সমাজ মূলত সম্পত্তি রক্ষার প্রয়োজনেই সৃষ্টি হয়েছে। সমাজের ক্রমবিকাশ সম্পর্কে তার তাত্ত্বিক ধারণাগুলোর যে বাস্তবিক ভিত্তি রয়েছে, তা প্রমাণ করতেই তিনি এই উদাহরণটি ব্যবহার করেন। তবে তিনি এই উদাহরণের মাধ্যমে এটাও দেখাতে চেয়েছেন যে, ইংল্যান্ডের উপনিবেশ স্থাপনের একটি বৈধ অধিকার ছিল; কারণ, স্থানীয় আদিবাসীদের তুলনায় ইংরেজদের সম্পত্তির ব্যবহারপদ্ধতি ছিল অনেক বেশি দক্ষ এবং সর্বসাধারণের মঙ্গলের জন্য বেশি উপকারী।
পিতৃতন্ত্রকে খণ্ডন করতে গিয়ে লক যেমন ঘন ঘন বাইবেলের উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন, ঔপনিবেশিকতা নিয়ে তার আলোচনা তেমন নয়; বরং তা বেশ প্রাণবন্ত ও সহজপাঠ্য। শ্রম বিনিয়োগের মাধ্যমেই মানুষ সম্পত্তির ওপর অধিকার অর্জন করে—প্রথমে এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করার পর তিনি যুক্তি দেন যে, ঔপনিবেশিক বিস্তার ছিল মূলত অব্যবহৃত বা স্বল্প-ব্যবহৃত জমিতে শ্রম ও মূল্য সংযোজনের একটি উপায়, এবং তাই এটি ছিল একটি ন্যায়সংগত উদ্যোগ।
উপেক্ষিত দিকগুলো
যদিও সামগ্রিকভাবে ‘টু ট্রিটিজেস’ লকের অন্যতম বহুল উদ্ধৃত রচনা এবং এটিকে সাধারণত লিবারেলবাদ ও সার্বজনীন মানবাধিকার বিষয়ক আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তাধারার ভিত্তিপ্রস্তর বলে গণ্য করা হয়, তথাপি গ্রন্থটির দ্বিতীয় প্রবন্ধটিই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ পেয়েছে। প্রথাগতভাবেই প্রথম প্রবন্ধটির প্রতি মানুষের আগ্রহ কম ছিল, তাই অন্যান্য প্রধান রাজনৈতিক গ্রন্থগুলোতে এর উল্লেখ খুব একটা দেখা যায় না। তাছাড়া পিতৃতান্ত্রিক রাজতন্ত্র এবং নিঃশর্ত রাজনৈতিক আনুগত্যের বিরুদ্ধে লকের যুক্তিতর্ক নিয়ে যে সামান্য আগ্রহটুকু ছিল, সময়ের পরিক্রমায় তাও স্বভাবতই ম্লান হয়ে গেছে। কোনো যৌক্তিক ভিত্তির উপর শাসকের ঐশী বৈধতা প্রতিষ্ঠার জটিলতা এবং এর ফলে রাষ্ট্রকর্তৃক নাগরিকদের উপর নিপীড়নের আশঙ্কা—এসবের বিরুদ্ধে লকের দেওয়া যুক্তিগুলো আধুনিক প্রেক্ষাপটে অনুধাবন করা একটু কঠিন; কারণ, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে লিবারেল গণতন্ত্রের প্রাধান্যই বেশি।
তবুও, সময়ের আবর্তে প্রথম প্রবন্ধটির ধ্যান-ধারণাগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েনি। এমনকি বর্তমান যুগের কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রেও এই ধারণাগুলো গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ঐতিহাসিক হার্বার্ট রোয়েনের মতো চিন্তাবিদদের মতে, গবেষণামূলক সাহিত্যে প্রথম প্রবন্ধটি অবহেলিত থেকে যাওয়ার আংশিক কারণ হলো, এর দ্বৈত ভূমিকার সঠিক মূল্যায়ন না হওয়া। এই রচনাটি কেবল রবার্ট ফিলমারের ‘রাজাদের ঐশী অধিকার’ বিষয়ক তত্ত্বের প্রত্যাখ্যান বা খণ্ডন নয়; বরং এটি লকের নিজস্ব এই বিশ্বাসের একটি জোরালো প্রকাশ যে, জ্যেষ্ঠাধিকার বা ‘প্রিমোজেনিচার’ (জ্যেষ্ঠ পুত্র বা নিকটতম পুরুষ উত্তরাধিকারীর কাছে সম্পত্তি ও উপাধি হস্তান্তর করার প্রথা)-এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ক্ষমতার যে কাঠামো, তা মৌলিকভাবেই ভুল। রূপক অর্থে বলা যায়, লকের এই প্রথম প্রবন্ধটি রাজনৈতিক চিন্তাধারার সেই ব্যাধি নির্ণয় করে, যার নিরাময় বা সমাধান তিনি তার দ্বিতীয় প্রবন্ধটিতে প্রদান করেছেন।
বাইবেলের উদ্ধৃতির বিস্তারিত ব্যবহারসমৃদ্ধ প্রথম প্রবন্ধটি যে বহুলাংশে উপেক্ষিত হয়েছে, তা এমন একটি দীর্ঘ সময়কালকেই নির্দেশ করে যখন রাজনৈতিক মূল্যবোধ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিষয়গুলোকে খুব একটা গুরুত্বের সাথে দেখা হতো না। তবে বর্তমানে পশ্চিমা রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরাও রাজনৈতিক ধারণা গঠনে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভূমিকাটি আরও বিশদভাবে বিবেচনা করতে শুরু করেছেন। একই সুরে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বারবারা আর্নেইলের মতো পণ্ডিতরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, আমেরিকা ও সেখানকার আদিবাসীদের নিয়ে লকের সুনির্দিষ্ট বক্তব্যগুলো হয় উপেক্ষিত হয়েছে, নয়তো সেগুলোর ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসন এবং পুঁজিবাদের বিস্তার—উভয়কে বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রন্থটির ঐতিহাসিক ভূমিকা নতুন করে ব্যাখ্যা করার জন্য এই অংশগুলোকে (যা মূলত পঞ্চম অধ্যায়ে রয়েছে) অত্যন্ত উপযুক্ত উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়।
পণ্ডিত ডেভিড হেল্ডের মতো মানবাধিকার তাত্ত্বিকরা—যারা সার্বজনীন মানবাধিকারের পক্ষে অবস্থান এবং স্থানীয় প্রথা ও নৈতিকতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে হিমশিম খান—তারাও এই ধরণের সমালোচনার পথ বেছে নিয়েছেন। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের প্রভাবে এই দ্বন্দ বা টানাপড়েন নিরসনের বিষয়টি লকের সময়ের চেয়েও বর্তমানে অনেক বেশি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর কারণ কী? কারণ, বর্তমানে অধিকাংশ রাষ্ট্রই বিবিধ আন্তর্জাতিক আইনের আওতাভুক্ত। এসব আইন রাষ্ট্রগুলোকে অভ্যন্তরীণভাবে নির্দিষ্ট কিছু মানবাধিকার মানতে বাধ্য করে; পাশাপাশি অন্য কোনো রাষ্ট্রে যখন সেই অধিকারগুলো চরম হুমকির মুখে পড়ে, তখন তা রক্ষায় হস্তক্ষেপ করারও দাবি জানায়।
লকের যুক্তির মূল্যায়ন
যদিও জন লকের ‘টু ট্রিটিজেস অফ গভর্নমেন্ট’ মূলত সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগের ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ও দার্শনিক বিষয়গুলোকেই প্রতিফলিত করে, তবুও প্রকাশের সময়ের তুলনায় বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কে এটিকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক বলে গণ্য করা হয়। এর আংশিক কারণ হলো, অষ্টাদশ শতাব্দীর বিশিষ্ট চিন্তাবিকেরা—যেমন দার্শনিক ডেভিড হিউম এবং রাষ্ট্রনায়ক থমাস জেফারসন—এই গ্রন্থটির কদর বুঝেছিলেন এবং একে ব্যাপকভাবে তুলে ধরেছিলেন। হিউম বলেছিলেন যে, এই গ্রন্থটি সমসাময়িক রাজনৈতিক চিন্তার মূল নির্যাসটুকু ধারণ করেছে; অন্যদিকে জেফারসন লককে আধুনিক যুগের তিনজন শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদের একজন হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
সম্ভাবনা আছে, লক নিজেও হয়তো তার যুক্তিগুলোর পূর্ণ সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে পারেননি। তার রচনা ১৬৮৮ সালের রাজনৈতিক উত্তেজনা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করেছে, যখন ‘গ্লোরিয়াস রেভল্যুশন’-এর পরে উইলিয়াম অরেঞ্জ যুক্তরাজ্যের সিংহাসনে আরোহন করেছিলেন এবং তৃতীয় উইলিয়াম হিসেবে রাজত্ব শুরু করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, ১৬৮৯ সালে গ্রন্থ প্রকাশের সময় ইংরেজ সংসদ ইতিমধ্যেই রাজার ক্ষমতা সীমিত করতে সক্ষম হয়েছিল। অর্থাৎ লক যে শাসনব্যবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন, সেটি তখনই কিছু মাত্রায় বাস্তবিকভাবে বিদ্যমান ছিল। ‘টু ট্রিটিজেস’-এর প্রাথমিক খসড়াগুলো সীমিত রাজতন্ত্র সৃষ্টির আগে লেখা হলেও, এর প্রকাশের সময়কালটি রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে এই শাসনব্যবস্থার অস্তিত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই দিক থেকে দেখা যায়, লক নতুন রাজনৈতিক বিন্যাসকে যুক্তিসঙ্গত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।
তবে জনগণের ইচ্ছা এই নতুন ব্যবস্থায়ও পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। বাস্তবে, সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশকে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের অধিকার দেওয়া হয়নি। এই ব্যবস্থায়ও অনেক ক্ষমতা কেবল রাজার হাতেই রেখে দেওয়া হয়েছিল, এবং সত্যিকারের গণতন্ত্র ইংল্যান্ডে আরো বহু বছর পরে আসে। তাই বোঝা জরুরি যে, লক গণতান্ত্রিক সমাজের পক্ষে ছিলেন না; যদিও গণতান্ত্রিক নীতিগুলোকে লকের সামাজিক চুক্তির যৌক্তিক চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে দেখা যেতে পারে। পরবর্তীতে জঁ-জ্যাক রুসোর মতো চিন্তাবিদরা সরকারকাঠামোতে জনগণের আরও বিস্তৃত অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
কিছু সীমাবদ্ধতা
লকের ‘টু ট্রিটিজেস’ এমন একটি গ্রন্থ, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সময়গত প্রেক্ষাপটে যাকে পুনঃব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যে প্রশ্নগুলো লকের সময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল—যেমন, রাজা ঈশ্বরের ইচ্ছায় শাসন করেন কি না, এবং তিনি শর্তহীন আনুগত্যের দাবিদার কিনা—সেগুলো আর আজকাল তেমন উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক সমস্যা নয়। তবে সরকারকে দায়বদ্ধ হতে হবে এবং স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের বিদ্রোহ করার অধিকার রয়েছে—লকের এই বিশ্বাস এতটাই জনপ্রিয় ধারণায় পরিণত হয়েছে যে, এগুলো আজকের লিবারেল রাষ্ট্রগুলিতে রাজনৈতিক সত্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
অ-শ্বেতাঙ্গ ও অ-খ্রিস্টান পাঠকদের জন্য গ্রন্থের প্রথম অংশটি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। কিন্তু ‘টু ট্রিটিজেস’-এর বাকি অংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার পক্ষে গড়ে ওঠা বিচিত্র সব প্রতিরোধ আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, এটি আমেরিকার সিভিল রাইটস আন্দোলন এবং ১৯৪০-এর দশক থেকে দ্রুতগতিতে শুরু হওয়া বি-উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়াকে বেশ গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। প্রাথমিক জমানার পাঠকরা দ্বিতীয় প্রবন্ধের আমেরিকা সংক্রান্ত আলোচনাকে স্থানীয় জনগণের কল্যাণের নামে ঔপনিবেশিক শাসন জায়েজ করার উপায় হিসেবে দেখলেও, আজ সেই স্থানীয় জনগণই সম্পত্তির অধিকারের প্রতি সম্মান ও সম্প্রদায়ের কল্যাণের ভিত্তিতে লকের গড়ে তোলা ন্যায়বিচারের ধারণাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে।
লকের লিবারেলবাদী ভাবমূর্তির এই পুনর্মূল্যায়ন গ্রন্থটি প্রকাশের সময়কাল থেকে প্রাপ্ত প্রতিক্রিয়াগুলোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অধিকারের রূপরেখা প্রণয়নে এই গ্রন্থটিকে সবসময়ই অত্যন্ত প্রভাবশালী মনে করা হয়েছে; অথচ দমন-পীড়নের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন এবং ‘সার্বজনীন প্রাকৃতিক আইন’-এর কোনো সুসংগত উৎসের অভাব—এই বিষয়গুলোতে গ্রন্থটিকে স্ববিরোধী বলে মনে হয়। কিছু অ-পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সমাজকেন্দ্রিক বা সামষ্টিক চেতনার কারণেও লকের এই কাজ সমালোচিত হয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে, লকের দর্শনে ব্যক্তিগত অধিকারের ওপর অত্যধিক জোর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক কর্তব্যের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বস্তুত, পাশ্চাত্য ঐতিহ্যেও এই সমালোচনার অস্তিত্ব রয়েছে; বিশেষ করে ধর্মপ্রাণ চিন্তাবিদদের মতে, এই ধরণের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ স্বজাতি বা সহ-নাগরিকের প্রতি একজন ব্যক্তির যে কর্তব্য রয়েছে, তাকে উপেক্ষা করে।
সমালোচনা
জন লক ‘টু ট্রিটিজেস অফ গভর্নমেন্ট’ রচনার কথা স্বীকার করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তাছাড়া সেকালের মানদণ্ডে বইটির প্রচারও ছিল অত্যন্ত সীমিত, তাই লকের জীবদ্দশায় এটি নিয়ে তেমন কোনো সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়া বা আলোচনা হয়নি বললেই চলে।
‘টু ট্রিটিজেস’ প্রকাশের মাত্র পাঁচ বছর পর, ১৭০৪ সালে লক মৃত্যুবরণ করেন। ফলে তিনি যদি বিভিন্ন সমালোচনার জবাব দিতে চাইতেনও, তবুও তার হাতে খুব একটা সময় ছিল না। প্রাবন্ধিক চার্লস লেসলি ১৭০৩ সালে রচিত তার ‘দ্য নিউ অ্যাসোসিয়েশন’ গ্রন্থে লকের যুক্তিগুলোকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। লেসলির যুক্তি ছিল, রাজারা শাসন করেন ঐশী অধিকারবলে; এবং তিনি তার কর্মজীবনের একটি বড় অংশ রাজা দ্বিতীয় জেমস ও ইংল্যান্ডের প্রতিষ্ঠিত চার্চের সমর্থনে ব্যয় করেছিলেন। এছাড়া লকের বন্ধু ও সেকালের রাজনৈতিক চিন্তাবিদ জেমস টাইরেলের চিঠিপত্রেও এই গ্রন্থটির কিছু ব্যক্তিগত সমালোচনা পাওয়া যায়। লকের এই রচনা নিয়ে বিদগ্ধ আলোচনা বা গভীর পর্যালোচনা শুরু হয় অনেক পরে, যখন ডেভিড হিউমের মতো চিন্তাবিদেরা ‘টু ট্রিটিজেস’-কে ১৬৮৮ সালের ‘গ্লোরিয়াস রেভল্যুশন’-এর নীতিমালার দলিল হিসেবে বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন।
দার্শনিক হিসেবে লকের অসঙ্গতি বা অসামঞ্জস্যতা এই গ্রন্থটির অন্যতম প্রধান সমালোচনা। লকের সাথে টাইরেলের পত্রালাপ থেকে জানা যায় যে, গ্রন্থটি প্রকাশের পর তিনি (টাইরেল) প্রাকৃতিক আইনের সংজ্ঞাটি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করার অনুরোধ জানিয়ে অন্তত ছয়বার লকের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। থমাস হবসের (যাকে প্রায়শই ‘নাস্তিক’ বলে বিদ্রূপ করা হতো) মতবাদকে চ্যালেঞ্জ জানানোর ক্ষেত্রে এই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হিসেবে দেখা হতো। টাইরেল ভালোভাবেই জানতেন যে, লকের প্রাকৃতিক আইন বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গিতে খোদার অস্তিত্ব অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু লক এই বিষয়ে তার মতামত পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যাখ্যা করতে অক্ষম অথবা অনিচ্ছুক ছিলেন বলে মনে হয়।
দার্শনিক হিসেবে লকের খ্যাতি বারবার সমালোচিত হলেও, রাজনৈতিক ও সম্পত্তির অধিকারের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটানোর ফলে একজন রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হিসেবে তার অবস্থান বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। রাজার ওপর পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতিদানকারী ‘গ্লোরিয়াস রেভল্যুশন’-এর প্রতি লকের সমর্থন শাসনব্যবস্থার একটি টেকসই ও সফল মডেল হিসেবে প্রমাণিত হওয়ার পর তার এই অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়।
প্রতিক্রিয়াসমূহ
মনে হয় লক তার এই গ্রন্থটির সমালোচনার ব্যাপারে বেশ বিমুখ ছিলেন। যেহেতু খুব কম মানুষই জানতেন যে লকই এর লেখক, তাই সরাসরি তাকে প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ খুব কম মানুষেরই ছিল। তবে তার বন্ধু জেমস টাইরেল লকের এই গোপন বিষয়টি ভালোভাবেই জানতেন।
টাইরেল চাইতেন, থমাস হবসের মতবাদের বিরুদ্ধে একটি মোক্ষম প্রতিযুক্তি দাঁড় করাতে ‘টু ট্রিটিজেস’-এর দার্শনিক ভিত্তি যেন আরও মজবুত করা হয়। হবস তার দার্শনিক যুক্তিগুলো দাঁড় করিয়েছিলেন মূলত ‘জৈবিক নির্ধারণবাদ’—অর্থাৎ মানুষের কোনো মুক্ত স্বাধীন সত্তা নেই এবং তারা কেবল শারীরিক চাহিদার অনুবর্তী হয়েই আচরণ করে—এবং গাণিতিক নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে। টাইরেল মনে করতেন, সাধারণ মানুষের ভালো-মন্দের ধারণাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লক যে খোদার প্রসঙ্গ এনেছেন তা কাঙ্ক্ষিত বা ইতিবাচক হলেও, হবসের ‘প্রাকৃতিক অবস্থা’ বিষয়ক অ-ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে খণ্ডন করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী তা ছিল না।
লক ও টাইরেলের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া এমন ছয়টি চিঠির কথা আমরা জানি, যেখানে লক তার ধারণাগুলোর গভীরতর ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এর কোনোটিই টাইরেলকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। লক সর্বোচ্চ এটুকু করতে সম্মত ছিলেন যে, তিনি হবসের সেই অবস্থানের সমালোচনা করবেন যেখানে বলা হয়েছে—রাষ্ট্র না থাকলে মানুষ প্রাকৃতিক আইন মানতে বাধ্য নয়। এছাড়া বাকি বিষয়গুলোতে তিনি টাইরেলকে সাফ জানিয়ে দেন যে, তিনি “আলোচনায় অংশ নিতে অপারগ”। এটি কৌতূহলোদ্দীপক দুটি সম্ভাবনার জন্ম দেয়: হয়তো তিনি হবসের সাথে সরাসরি বিতর্কে জড়ানোর মতো সক্ষমতা নিজের মধ্যে অনুভব করেননি, অথবা সুসংগত দার্শনিক তত্ত্ব নির্মাণের চেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কার্যকরী বা হিতকর তত্ত্ব দাঁড় করাতেই তিনি অধিক মনোযোগী ছিলেন।
ভিন্নমত এবং ঐকমত্য
সমালোচনার প্রতি লকের অনাগ্রহ এবং তাতে সাড়া না দেওয়ার মানে হলো, তার অবস্থানে কোনো বাস্তবিক পরিবর্তন আসেনি। টাইরেলের মতো শুভাকাঙ্ক্ষী বা সহানুভূতিশীল পাঠকদের আরও সুদৃঢ় ও কঠোর দর্শনের প্রত্যাশা পূরণ করা কিংবা বিরুদ্ধমত পোষণকারী সমালোচকদের জবাব দেওয়া—এর কোনোটাই সম্ভব হয়নি। হতে পারে লক মনে করতেন যে, তার অন্যান্য রচনাই তার হয়ে কথা বলার জন্য যথেষ্ট। অথবা, ‘টু ট্রিটিজেস’ রচনার বিষয়টি স্বীকার করা নিয়ে তিনি হয়তো এতটাই শঙ্কিত ছিলেন যে, বড় কোনো বিতর্কে জড়ানোকে তিনি বিপজ্জনক মনে করেছিলেন।
বিষয়টা যা-ই হোক, টাইরেল যেমন মনে করতেন যে লকের কিছু ধারণা আরও বিকশিত হওয়া প্রয়োজন, পরবর্তী সময়ের চিন্তাবিদরাও তেমনি লকের চিন্তাধারাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। তবে লক থেকে শুরু করে আধুনিক লিবারেলবাদী রাষ্ট্র পর্যন্ত (চিন্তার) যে যোগসূত্র, তা আজও অটুট। সরকার ও জনগণের মধ্যে ‘সামাজিক চুক্তি’র যে ধারণা তিনি দিয়েছিলেন, তা চিরন্তন। সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে কেবল সেই চুক্তির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ঔপনিবেশিক সংকটের সময় আমেরিকান কলোনিগুলো যখন ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করেছিল, তখন কুশাসক বা খারাপ সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ করার বিষয়ে লকের ধারণাটি সেই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল।
লককে লিবারেলবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি বা রসদের জোগানদাতা হিসেবেই দেখা উচিত। তার এই ধারণাগুলো থেকে যৌক্তিক উপসংহার টানা এবং সেগুলোর বাস্তবায়নের ভার ন্যস্ত ছিল বিভিন্ন সময়ের ভিন্ন ভিন্ন মানুষের ওপর।
সমকালীন গবেষণায়
লকের চিন্তাধারার আধুনিক সমর্থকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রাজনৈতিক দার্শনিক জন রলস, যিনি একটি অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গঠনের তত্ত্বের জন্য সুপরিচিত; এবং আমেরিকান রাজনৈতিক তাত্ত্বিক রবার্ট নজিক, যিনি লকের মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে সমাজের একটি লিবারটারিয়ান বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। যদিও সমাজে রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত—তা নিয়ে তাদের দুজনের ধারণা এক নয়, তবুও তারা উভয়েই লকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সর্বসাধারণের মঙ্গল এবং স্বৈরাচার বিষয়ক ধারণাগুলোর ওপর নির্ভর করেছেন; এমনকি বাস্তব জগতে এগুলোর প্রয়োগ নিয়ে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন উপসংহারে পৌঁছালেও।
আরও সাম্প্রতিককালে যারা নিজেদের লকের অনুসারী বলে দাবি করেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন সংবিধান বিষয়ক তাত্ত্বিক ডোনাল্ড লুৎজ। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সরকার কীভাবে কাজ করবে—এ বিষয়ে তিনি একজন বিশেষজ্ঞ এবং নতুন সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনি বিভিন্ন রাষ্ট্রকে পরামর্শ দিয়েছেন।
অধিকাংশ আমেরিকান রক্ষণশীলরাও লকের সাথে এবং তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সীমিত সরকারের আহ্বানের সাথে গভীর একাত্মতা বোধ করেন। এমনকি লিবারটারিয়ানরাও এর অন্তর্ভুক্ত, যারা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার এমন একটি চরম সংস্করণের পক্ষপাতী, যেখানে সরকারের কাজ কেবল প্রতিরক্ষা ও মৌলিক আইন প্রয়োগের মতো বিষয়গুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
এই সকল চিন্তাবিদই ‘টু ট্রিটিজেস’-এর সেই অংশগুলো ব্যবহার করেছেন, যা তাদের নিজস্ব অবস্থানকে সবচেয়ে জোরালোভাবে সমর্থন করে। ঐতিহাসিক যুক্তির পরিবর্তে যৌক্তিক দার্শনিক যুক্তির সুচিন্তিত ব্যবহার এবং গ্রন্থটির বিষয়বস্তুর ব্যাপকতার কারণে নতুন নতুন সমস্যা সমাধানে এর প্রয়োগ বেশ নমনীয় ও সহজসাধ্য হয়েছে।
সংক্ষিপ্তসার
রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উৎস, উদ্দেশ্য ও সীমারেখা সম্পর্কে জন লকের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ হলো ‘টু ট্রিটিজেস’। হাতেগোনা যে ক’টি গ্রন্থকে লিবারেলবাদ, সমসাময়িক বিশ্ব-রাজনীতি এবং সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়, এটি সেগুলোর অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায় এবং দর্শনের প্রধান প্রধান গ্রন্থগুলোতে এর উল্লেখ রয়েছে; এমনকি আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মতো বৈপ্লবিক দলিল ও বিবৃতিতে এর ভাবানুবাদ বা সারমর্ম গ্রহণ করা হয়েছে।
যদিও লকের চিন্তাধারার অনেকটাই অন্যদের থেকে আহরিত কিংবা অন্যদের জবাব দিতে গিয়ে উদ্ভূত, তথাপি তিনি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মতাত্ত্বিক, এমনকি চিকিৎসাশাস্ত্রীয় মূল্যবোধগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে রাষ্ট্র সম্পর্কে একটি মৌলিক তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন।
এই মূল্যবোধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাটি হলো—রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস জনগণ; এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যখন শাসকরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে বা জনস্বার্থ উপেক্ষা করে, তখন সেই ক্ষমতা আবার জনগণের কাছেই ফিরে আসে। তার আলোচনার দার্শনিক ও তাত্ত্বিক ভঙ্গি বা সুরের কারণে তার নিজস্ব সময়ের বাইরে অন্যান্য রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেও এই ধারণাগুলো প্রয়োগ করা সহজ হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা একবার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তা কেবল ততক্ষণই বৈধ থাকে, যতক্ষন তা নির্বাহী ও আইনসভা—এই দুই শাখার মধ্যে বিভক্ত থাকে এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি করে—লকের এই জোরালো দাবিটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই বৈপ্লবিক। অষ্টাদশ শতাব্দীর আমেরিকান ও ফরাসি বিপ্লবীদের ওপর এবং সফল বিপ্লবের পর যারা নতুন সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন, তাদের ওপর এই মতবাদ ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।
ভবিষ্যতেও লকের ‘টু ট্রিটিজেস’-এর প্রভাব অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা প্রবল। এই গ্রন্থটি পিতৃতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করে, রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস হিসেবে জনগণকে চিহ্নিত করে, রাজনৈতিক ও সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় সোচ্চার ভূমিকা রাখে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার হলে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ দেখায়। এর মূল কথাই হলো, নাগরিকদের যেন পরিপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক সমমর্যাদা দেওয়া হয়। পরিবেশের মতো নতুন নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা যখন সামনে আসছে, তখন একটি ন্যায়ভিত্তিক, কার্যকর এবং মুক্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থা কীভাবে গড়ে তোলা যায়—সে বিষয়ে লকের রাজনৈতিক ক্ষমতার নীতিগুলো দিকনির্দেশনা প্রদান অব্যাহত রাখবে।