জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘অন লিবার্টি’: নাগরিক স্বাধীনতার এক চিরঞ্জীব ইশতেহার
নোট: জন স্টুয়ার্ট মিল ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্রিটিশ দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। আধুনিক ‘লিবারেল গণতন্ত্র’-এর অন্যতম প্রধান স্থপতি মনে করা হয় তাকে। ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত তার সবচেয়ে বিখ্যাত বই ‘অন লিবার্টি’ মূলত নাগরিক স্বাধীনতার এক শক্তিশালী ইশতেহার।
গত ৮ মে চলে গেল তার মৃত্যুবার্ষিকী; আসছে ২০ মে তার জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষ্যে এই ধ্রুপদী বইয়ের সংক্ষিপ্ত পাঠপরিচিতি আমরা পাঠকদের সামনে হাজির করলাম। এটি মূলত অ্যাশলি ক্যাম্পি ও লিন্ডসে স্কোর্জি-পোর্টার লিখিত ‘অ্যান অ্যানালাইসিস অব জন স্টুয়ার্ট মিলস অন লিবার্টি’ পুস্তিকার সহজ অনুবাদ।
জন স্টুয়ার্ট মিল কে ছিলেন?
জন স্টুয়ার্ট মিল ঊনবিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট দার্শনিক এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। বর্তমান বিশ্বের ‘লিবারেল গণতন্ত্র’ বা যেসব রাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের স্বাধীনতা রক্ষার নিশ্চয়তা দেয়, তাদের মূল কাঠামোটি বুঝতে মিলের চিন্তাধারা আজও একইরকম গুরুত্বপূর্ণ।
১৮০৬ সালে লন্ডনের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে মিল জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবারটি তৎকালীন প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী মহলে সুপরিচিত ছিল। তার পিতা ছিলেন স্কটিশ দার্শনিক জেমস মিল, যিনি ‘উপযোগবাদ’ (ইউটিলিটারিয়ানিজম) নামক মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। এই মতবাদ অনুযায়ী, কোনো কাজের ভালো-মন্দ বিচার করা হয় তা সুখ বয়ে আনছে কি না তার ভিত্তিতে; অর্থাৎ, যা সুখ দেয় তা সঠিক, আর যা দুঃখের কারণ হয় তা ভুল।
মিলের শিক্ষা জীবন গড়ে উঠেছিল তার বাবার অত্যন্ত কঠোর শাসনে। মাত্র তিন বছর বয়সে তাকে প্রাচীন গ্রিক ভাষা শেখানো শুরু হয় এবং সমবয়সীদের সাথে মেলামেশা বা বন্ধুত্ব করা তার জন্য নিষিদ্ধ ছিল। শৈশবের এই কঠোর নিয়মকানুন তার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং ২০ বছর বয়সে তিনি মানসিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন। এরপর তিনি রোমান্টিক কবি ও চিন্তাবিদদের লেখার দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি উপযোগবাদের সাথে শিল্প ও সৌন্দর্যের রোমান্টিক ভাবধারাকে যুক্ত করেন এবং ‘স্বাধীনতা’ বলতে আসলে কী বোঝায়, সে বিষয়ে এক মৌলিক তত্ত্ব প্রদান করেন।
তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- এ সিস্টেম অফ লজিক (১৮৪৩)
- প্রিন্সিপলস অফ পলিটিক্যাল ইকোনমি (১৮৪৮)
- ইউটিলিটারিয়ানিজম
- কনসিডারেশনস অন রিপ্রেজেন্টেটিভ গভর্নমেন্ট (১৮৬১)
- দ্য সাবজেকশন অফ উইমেন (১৮৬৯)
তবে তার সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ হলো ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত ‘অন লিবার্টি’।
মিল হ্যারিয়েট হার্ডি টেলর নামের এক বিবাহিত নারীর প্রেমে পড়েন এবং ১৮৫১ সালে হ্যারিয়েট বিধবা হওয়ার পর বিয়ে করার আগ পর্যন্ত তাদের দীর্ঘ ২০ বছর অপেক্ষা করতে হয়। ১৮৫৮ সালে ‘অন লিবার্টি’ বইটি সম্পাদনায় মিলকে সাহায্য করার সময় হ্যারিয়েট আকস্মিকভাবে মারা যান। এর পরের বছরই মিল বইটি প্রকাশ করেন।
১৭ বছর বয়স থেকে মিল ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’তে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে অবসর নিয়ে তিনি ফ্রান্সে চলে যান। সেখানে তিনি লেখালেখি এবং স্ত্রীর কবর দেখাশোনা করে সময় কাটাতেন। ১৮৬৫ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন এবং দাসপ্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। ৬৬ বছর বয়সে ফ্রান্সের আভিগনন শহরে তার মৃত্যু হয় এবং স্ত্রীর কবরের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়।
লেখকের পটভূমি
‘অন লিবার্টি’ গ্রন্থটি মূলত উনবিংশ শতাব্দীর এক বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের ফসল। ফরাসি এবং আমেরিকান বিপ্লবের পরবর্তী দশকগুলোতে সামাজিক পরিবর্তনকে একটি সুনির্দিষ্ট রূপ ও অর্থ দেওয়ার চেষ্টায় তৎকালীন পণ্ডিতেরা যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন, এটি তারই প্রতিফলন। সেই সময়ের বিতর্কগুলোর মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল—সমাজকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চালিকাশক্তি হিসেবে কোন ধরনের তত্ত্ব কার্যকর হতে পারে।
মিল নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে কাজ করা ‘সংসদীয় র্যাডিক্যাল’দের সাথে এবং তার বাবার উপযোগবাদী মতাদর্শের সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। একইসাথে তিনি লেখক কার্লাইল এবং কবি স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ ও উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের রচনার মাধ্যমে ইংরেজি ‘রোমান্টিক আন্দোলন’-এর কবিতা ও সাহিত্যতত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।
এছাড়া তিনি ফরাসি দার্শনিক ক্লদ অঁরি দ্য রুভরো’র চিন্তাধারার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ‘সেন্ট-সাইমোনিয়ান’ স্কুলের প্রগতি, শিল্পায়ন ও সমাজতন্ত্রের ইউটোপিয়ান ধারণা এবং তার সহকর্মী অগাস্ট কোঁৎ-এর চিন্তা দিয়েও প্রভাবিত হয়েছিলেন।
রোমান্টিক ব্যক্তিবাদীদের অবস্থান ছিল এমন যে—একটি শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা অভিজাত গোষ্ঠী সামাজিক প্রগতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে। সেন্ট-সাইমোনিয়ানদের কাছে এই শিক্ষিত ও স্বপ্নদর্শী মানুষরাই ছিলেন সমাজের উন্নতির চাবিকাঠি, কারণ তারা সমসাময়িক যুগের সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে গিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা রাখেন। এই সমস্ত চিন্তাধারা মিলের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
‘অন লিবার্টি’ কী বলেছিল?
মিল পাশ্চাত্য চিন্তাধারার অন্যতম কঠিন ও চিরস্থায়ী একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন: একটি মুক্ত সমাজে একজন ‘মুক্ত মানুষ’ হওয়ার প্রকৃত অর্থ কী?
রাষ্ট্র বা সমাজের অন্যান্য সদস্যদের হস্তক্ষেপ কখন ‘বৈধ’ বলে গণ্য হবে, তা নির্ধারণে মিলের মানদণ্ডটি হলো ‘ক্ষতি তত্ত্ব’ (হার্ম প্রিন্সিপল)। এই নীতি অনুযায়ী, রাষ্ট্র বা সমাজ কোনো ব্যক্তির ওপর তখনই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে, যদি সেই ব্যক্তির আচরণ অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেবল কারও ‘নিজের মঙ্গলের জন্য’ তার ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে, এমন দাবি যথেষ্ট নয়।
মিলের চিরায়ত উদারপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির মূলে রয়েছে বাকস্বাধীনতা: অর্থাৎ, সরকারের কোনো প্রকার সেন্সরশিপ ছাড়াই জনসমক্ষে আমাদের যেকোনো মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকতে হবে। তিনি যুক্তি দেন যে, কোনো মতকেই নিষিদ্ধ করা উচিত নয়, কারণ ভালো ধারণাগুলো টিকে থাকার এবং ভুল ধারণাগুলো দূর হওয়ার একমাত্র উপায় হলো উন্মুক্ত বিতর্কের মাধ্যমে সেগুলোকে যাচাই করা।
‘অন লিবার্টি’ বইটিতে প্রত্যেকের ভিন্নভাবে চিন্তা করার অধিকারের পক্ষে জোরালো সমর্থন জানানো হয়েছে এবং ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার’ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। এই সমস্যাটি তখন দেখা দেয় যখন স্বাধীনতা শুধু আইনি বলপ্রয়োগের কারণে নয়, বরং জনমতের প্রবল চাপের মাধ্যমে হুমকির মুখে পড়ে।
অবশ্য ‘অন লিবার্টি’ লিবারেল গণতন্ত্রের কোনো নিখুঁত নীলনকশা নয়। তা সত্ত্বেও, এটি একটি সহনশীল সমাজ গঠনের জন্য এক উচ্ছ্বসিত আহ্বান, যেখানে প্রতিটি মানুষ একটি নিরাপদ, নৈতিক ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারবে।
গ্রন্থের প্রেক্ষাপট ও সাধারণ পরিসর
মিল ১৮৫০-এর দশকের ইংল্যান্ডে বসে বইটি লিখেছিলেন। সে সময় দেশটি তার দ্রুত শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। শিল্প বিপ্লবের ফলে আসা সামাজিক ও অর্থনৈতিক আমূল পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণের বিষয়টি তৎকালীন রাজনৈতিক দর্শনের একটি কেন্দ্রীয় বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
শিল্পায়নের ফলে দারিদ্র্য একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। ১৮৩৪ সালে ‘দরিদ্র আইন’ সংস্কার করে যখন সরকারকে ‘ওয়ার্কহাউস’ (শ্রমশালা) স্থাপন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়, তখন ব্যক্তির ওপর সমাজের বা রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের সীমা কতটুকু হবে, সেই আলোচনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সরকারের ক্ষমতার যথাযথ সীমারেখা ঠিক কী হওয়া উচিত, তা সপ্তদশ শতাব্দী থেকেই চিন্তাবিদদের ভাবিয়ে তুলেছিল। দার্শনিক জন লক ব্যক্তিগত সম্পত্তির সুরক্ষার ভিত্তিতে ‘সীমিত সরকার’-এর নীতিগুলো প্রতিষ্ঠা করেন। মিল যাকে ‘সামাজিক স্বাধীনতা’ বলে অভিহিত করেছেন, সেই পুরো বিষয়টিই ধ্রুপদী লিবারেলবাদের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
মুখ্য বিষয়বস্তু ও ধারণাগুলোর বিস্তার
জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘অন লিবার্টি’ রচনার পেছনে একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ছিল—ব্যক্তির ওপর সমাজ ঠিক কতটুকু ক্ষমতা বৈধভাবে প্রয়োগ করতে পারে, তার প্রকৃতি ও সীমা নির্ধারণ করা।
এই সবকিছু বিচারের ক্ষেত্রে তিনি যে মানদণ্ডটি প্রয়োগ করেছেন তা হলো ‘ক্ষতি তত্ত্ব’। তিনি এটি এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন:
“ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগতভাবে মানুষ সমাজের কোনো সদস্যের কাজের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার যৌক্তিক অধিকার কেবল একটি উদ্দেশ্যেই পেতে পারে, আর তা হলো—আত্মরক্ষা। কোনো ব্যক্তির নিজস্ব শারীরিক বা নৈতিক মঙ্গলের যুক্তি তার ওপর ক্ষমতা প্রয়োগের পক্ষে কারণ বা ভিত্তি হিসেবে যথেষ্ট হতে পারে না।”
তিনি সরকারের সেন্সরশিপ ছাড়াই জনসমক্ষে মানুষের মতামত প্রকাশের অধিকারকে জোরালোভাবে সমর্থন করেন। এর পাশাপাশি তিনি আমাদের ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার’ সম্পর্কেও সতর্ক করে দেন। মূলধারার সমাজ যাতে নতুন কোনো ধারণা বা জীবনধারা সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে স্তব্ধ করে দিতে না পারে, সে বিষয়ে বইটিতে হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে।
মিল আগের প্রজন্মের উপযোগবাদী লিবারেলদের ‘মানবিক সুখ’ সংক্রান্ত সরল ধারণাটি থেকে সরে আসেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, আমাদের জীবনযাপন ও চিন্তাভাবনার বৈচিত্র্যই আসলে প্রকৃত মানবিক সুখের পথ প্রশস্ত করে।
উপেক্ষিত কিছু দিক ও সমালোচনা
‘অন লিবার্টি’কে সাধারণত ক্লাসিক্যাল উদারতাবাদ বা লিবারেলিজমের একটি চূড়ান্ত দলিল হিসেবে দেখা হয়। তবে মিলের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের রোমান্টিক ও পারফেকশনিস্ট দিকটি নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে—আর তা হলো মিলের ‘অভিজাতবাদ’।
অনেকের মতে, ‘অন লিবার্টি’-তে অনন্য চরিত্রের ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত রুচি ও পছন্দের মধ্যে একটি ‘হায়ারার্কি’ তৈরি করে। ব্রিটিশ দার্শনিক জন স্কোরুপস্কি বলেছেন, মিলের এই অভিজাতবাদ পাঠকদের ক্ষুব্ধ করে, কারণ তিনি মনে করতেন কেবল কিছু বিশেষ মানুষই আনন্দের পরিমাণের চেয়ে এর গুণগত মান বিচার করার যোগ্য।
অন্যদিকে অমর্ত্য সেন এবং মার্থা নাসবাউমের মতো চিন্তাবিদরা মিলের ব্যক্তিগত পূর্ণতার এই ধারণাটিকে ব্যবহার করে পরিবার, দরিদ্র ও বেকারদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তার সপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।
মিলের ‘ক্ষতি তত্ত্ব’-এর প্রাথমিক সমালোচক জেমস ফিটজজেমস স্টিফেন মনে করতেন, এই নীতি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের সুযোগকে অত্যন্ত সংকুচিত করে ফেলে। থমাস হেনরি হাক্সলি অভিযোগ করেন যে, শিক্ষাক্ষেত্রে জনস্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে মিল অনেক কঠিন বা উচ্চ মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
এত সমালোচনা সত্ত্বেও মিল তার মূল যুক্তিগুলোতে অটল ছিলেন। আমৃত্যু তিনি রাজনৈতিকভাবে একজন ‘র্যাডিক্যাল’ হিসেবেই টিকে ছিলেন এবং নারীর অধিকার ও জাতিগত সমতার মতো প্রগতিশীল বিষয়গুলোর পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন।
সমকালীন গবেষণায় ভবিষ্যৎ গতিপথ
আধুনিক সমাজের জটিল চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য পণ্ডিতরা আজও ‘অন লিবার্টি’ থেকে উদারপন্থী চিন্তার রসদ সংগ্রহ করছেন। মিলের আধুনিক অনুসারীদের মোটাদাগে চারটি প্রধান দলে ভাগ করা যায়:
- নিওলিবারেল (হস্তক্ষেপবিরোধী মুক্তবাজার সমর্থক)
- সোশ্যাল-জাস্টিস লিবারেল (সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক উদারপন্থী)
- কনটেম্পোরারি ক্লাসিক্যাল লিবারেল (সমকালীন ধ্রুপদি উদারপন্থী)
- সমালোচক গোষ্ঠী (যারা গণসংস্কৃতির প্রভাবকে পাবলিক ডিবেটের জন্য ক্ষতিকর মনে করেন)
মার্থা নাসবাউম ও অমর্ত্য সেন মিলের র্যাডিকাল অবস্থানকে সম-অধিকার ও সমান সুযোগের রক্ষাকবচ হিসেবে চিহ্নিত করেন। অন্যদিকে ফ্রেডেরিখ হায়েক বা মিল্টন ফ্রিডম্যানের মতো মুক্তবাজারের পক্ষের চিন্তকেরা মনে করেন, যখন মানুষের ব্যক্তিগত কর্মসাধনা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষিত থাকে, তখনই মানুষ সবচেয়ে ভালোভাবে বিকশিত হতে পারে।
সংক্ষিপ্তসার
মিল তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ে, যাকে তিনি সামাজিক অগ্রগতির এক অপরিহার্য উপাদান বলে মনে করতেন। বাকস্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত লক্ষ্য পূরণের অধিকার হলো আধুনিক লিবারেল রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর, যার পেছনে ‘অন লিবার্টি’র বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের বিশাল অবদান রয়েছে।
মাদকের বৈধতা থেকে শুরু করে আইনি বাকস্বাধীনতার সীমানা নির্ধারণ—আধুনিক যুগের যেকোনো জটিল আলোচনায় আজও মিলের ‘ক্ষতি তত্ত্ব’ অপরিহার্য। দার্শনিক জগত ও বাস্তব রাজনীতি, উভয় ক্ষেত্রেই ‘অন লিবার্টি’ তার আবেদন আজও সমানভাবে ধরে রেখেছে।