রুশোর ‘দি সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’
নোট: দার্শনিক জ্যাঁ-জাক রুশো আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তাধারার অন্যতম প্রধান স্থপতি। তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘দি সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ (১৭৬২) মানুষের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্ব নিরসনের এক অনন্য প্রয়াস। গণতন্ত্র, রাজনৈতিক ক্ষমতা, ন্যায়বিচার, ব্যক্তিস্বাধীনতা ইত্যাদি নিয়ে ভাবনার ক্ষেত্রে রুশো ও তার রচনাবলী নানাভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে। ‘আখড়া’ থেকে পূর্বে আরো দুজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রচিন্তক হবস ও জন লকের চিন্তার সংক্ষিপ্তসার প্রকাশ করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আজকে রুশোর ‘দি সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ কিতাবের সংক্ষিপ্তসার দেয়া হলো। এটা জেমস হিলের ‘An Analysis of Jean-Jacques Rousseau’s The Social Contract’ নামক পুস্তিকার কিছু মডিউলের অনুবাদ।
জ্যাঁ-জাক রুশো কে ছিলেন?
‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ (১৭৬২) কিতাবের লেখক জ্যাঁ-জাক রুশো ১৭১২ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জন্মগ্রহণ করেন। তার জীবন ছিল বৈচিত্র্যময় ও বর্ণাঢ্য। প্রথমে সুরকার হিসেবে খ্যাতি পেলেও পরে তিনি লেখক ও পণ্ডিত হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং ইউরোপের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক চিন্তকে পরিণত হন।
সংগীত থেকে শুরু করে শিক্ষা—এমন নানা বিষয়ে রুশো লিখেছেন। ১৭৫২ সালে তিনি ‘দ্য ভিলেজ সুদসেয়ার’ নামে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় অপেরা রচনা করেন। ১৭৬১ সালে তার উপন্যাস ‘জুলি, অর দ্য নিউ হেলোইস’ প্রকাশিত হয়; এটি আঠারো শতকের অন্যতম সেরা সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত। ১৭৭৮ সালে তার মৃত্যুর পর ১৭৮২ সালে প্রকাশিত হয় তার আত্মজীবনী ‘দ্য কনফেশনস’; নিজের জীবনের অত্যন্ত সাহসী ও অকপট বর্ণনার জন্য বইটি আজও বিখ্যাত।
পাশ্চাত্য রাজনৈতিক দর্শনে জ্যাঁ-জাক রুশোকে অন্যতম প্রধান চিন্তাবিদ মনে করা হয়। কীভাবে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতা হাসিল হয় সে বিষয়ে তার চিন্তা এবং গণতন্ত্রের প্রতি তার গভীর অনুরাগ তৎকালীন সময়ে ছিল বৈপ্লবিক ও বিতর্কিত। বিশেষত, ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে রুশোর চিন্তাধারা ফ্রান্সের রোমান ক্যাথলিক কর্তৃপক্ষকে ক্ষুব্ধ করেছিল, যার ফলে তার ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ বইটি নিষিদ্ধ করা হয়। রুশোর নিজের শহর জেনেভাতেও পরিস্থিতি একই ছিল; সেখানেও বইটি নিষিদ্ধ করা হয় এবং পুড়িয়ে ফেলা হয়।
১৭৮৯-৯৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকারী এই বিপ্লবের পর থেকেই রুশোর চিন্তাধারা সমালোচনার মুখে পড়ে। সমালোচকদের মতে, তার তত্ত্বগুলো স্বৈরাচারী ও সর্বাত্মকবাদী শাসনকে বৈধ করতে ব্যবহৃত হতে পারে। বিশেষ করে রুশোর ‘সাধারণ ইচ্ছা’ বা ‘জেনারেল উইল’ (পুরো কমিউনিটির স্বার্থে জনগণের শাসন) ধারণাটি নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের দাবি, এই ধারণাটি অপব্যবহার করে ব্যক্তির স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া সম্ভব।
লেখকের পটভূমি
রুশো এক ‘গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন।’ তার জন্ম হয়েছিল ফ্রান্সের শক্তিশালী রাজা চতুর্দশ লুই-এর শাসনের সমাপ্তির মাত্র তিন বছর আগে, আর তার মৃত্যু হয় ১৭৮৯-৯৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের মাত্র এক দশক আগে। এই বিপ্লব ছিল এক বিশাল রাজনৈতিক পরিবর্তনের কাল, যার ফলে শেষ পর্যন্ত রাজতন্ত্রের সম্পূর্ণ পতন ঘটে।
সেই সময়ে ‘উপন্যাস’ ছিল সাহিত্যের একটি নতুন মাধ্যম; এটি মানুষকে এমনভাবে নতুন নতুন ধারণা ও বিষয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে সাহায্য করেছিল, যা আগে কখনও ঘটেনি। রুশোর সমসাময়িক স্কটল্যান্ডের ডেভিড হিউম এবং জার্মানির অত্যন্ত প্রভাবশালী ইমানুয়েল কান্ট-এর মতো দার্শনিকরাও এসব নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তারা অধিবিদ্যা, ধর্ম, অর্থনীতি, নীতিশাস্ত্র এবং রাজনৈতিক তত্ত্বের ক্ষেত্রে মৌলিক অবদান রাখছিলেন।
‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ কিতাবটি তৎকালীন পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির ডামোডোলেই রচিত হয়েছিল। সামন্তবাদের দিকে ইঙ্গিত করে রুশো-গবেষক ক্রিস্টোফার ডি. রাইট যুক্তি দেন যে, এই পরিবর্তনশীল সংস্কৃতি ছিল ইতিহাসের অপেক্ষাকৃত এক শান্তিপূর্ণ সময়ের ফসল। তিনি বলেন:
"সতেরো শতকের বিধ্বংসী ধর্মীয় সংঘাত এবং টিকে থাকা সামন্তবাদ থেকে মুক্তি পেয়ে, তুলনামূলকভাবে ধনী ও শান্তিপূর্ণ যুগের শিক্ষিত পুরুষরা বিভিন্ন শাখায় নতুন নতুন উদ্ভাবন ও উৎকর্ষ সাধনে তাদের প্রচেষ্টা নিয়োজিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।"
যুক্তি ও যুক্তিনির্ভর চিন্তাপ্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠা এই নতুন ধারণাগুলো তখন ‘দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রথাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করতে’ ব্যবহৃত হয়েছিল। ইউরোপের অনেক শাসক তাদের কর্তৃত্ব জাহির করার জন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করতেন; তাই চার্চের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানেই ছিল তৎকালীন সরকারগুলোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’-এর যুক্তিগুলো সেই সময়ের এই ভিন্নমতাবলম্বী প্রেক্ষাপটের সাপেক্ষেই সবচেয়ে ভালো বোঝা যায়।
একটি বৈধ সরকার আসলে কেমন হওয়া উচিত—সেই বিষয়ে প্রচলিত ধারণাগুলো বদলে দিতে চেয়েছিলেন রুশো এবং কিছু ক্ষেত্রে তিনি সফলও হয়েছিলেন। ১৭৬২ সালে ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ প্রকাশের পর তার রাজনৈতিক ধারণাগুলো এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, তাকে কর্সিকার জন্য একটি সংবিধানের খসড়া তৈরি করতে এবং পোল্যান্ডের নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিষয়ে পরামর্শ দিতে অনুরোধ করা হয়েছিল।
‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ কী বলেছিল?
রুশোর মতে, সরকারের একমাত্র বৈধ রূপ হলো জনগণের শাসন। এই শাসনব্যবস্থা বা গণতন্ত্র যে ধারণার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে সেটি হলো, কেবল জনগণই সমষ্টিগতভাবে ‘সার্বভৌম’—অর্থাৎ রাজনৈতিক কর্তৃত্বের মূল উৎস।
তৎকালীন সময়ে এটি ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত একটি অবস্থান, বিশেষ করে রুশোর আবাসভূমি ফ্রান্সে, যেখানে তখন সমস্ত ক্ষমতা ছিল রাজতন্ত্রের হাতে। রুশোর কাছে জনগণের শাসনই একমাত্র বৈধ সরকার, কারণ এটিই একমাত্র ব্যবস্থা যা ব্যক্তিকে শাসিত হওয়ার পাশাপাশি স্বাধীন থাকার সুযোগ দেয়—যা মূলত ‘সাধারণ ইচ্ছা’ বা জেনারেল উইল প্রয়োগের একটি বৈশিষ্ট্য।
রুশো প্রস্তাব করেন যে, জনগণ একটি সমষ্টিগত সত্তা হিসেবে ‘সাধারণ ইচ্ছা’র সাথে সংগতি রেখে সিদ্ধান্ত নেবে। সাধারণ ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করার অর্থ হলো পুরো সমাজের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ব্যক্তিরা যখন তাদের নিজস্ব স্বার্থ ত্যাগ করে একজোট হয় এবং নিজেদের একটি অবিভাজ্য অংশ হিসেবে গণ্য করে সমাজের মঙ্গলের জন্য কাজ করে, তখনই তা সাধারণ ইচ্ছা হিসেবে গণ্য হয়।
সামাজিক চুক্তি হলো এমন একটি সমঝোতা যার মাধ্যমে ব্যক্তিরা ‘প্রাকৃতিক অবস্থা’ ত্যাগ করে একটি আইনবদ্ধ নাগরিক সমাজে প্রবেশ করে। এই চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তিরা তাদের অবাধ স্বাধীনতা ত্যাগ করে শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করে।
‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ গ্রন্থে রুশো সেইসব শর্তাবলি তুলে ধরেছেন যার ভিত্তিতে ব্যক্তিরা প্রাকৃতিক অবস্থা ছেড়ে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আসতে এবং সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে অন্যদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে রাজি হবে। রুশো মনে করেন, একটি গ্রহণযোগ্য সামাজিক চুক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গণতান্ত্রিক শাসন। তিনি বিশেষ করে ‘প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র’ পছন্দ করতেন, যেখানে জনগণ নিজেরাই সরাসরি সভায় মিলিত হয়ে নিজেদের শাসনের জন্য প্রয়োজনীয় আইন নিয়ে আলোচনা ও তা পাস করবে।
গ্রন্থের প্রেক্ষাপট
রুশোর সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক ধারাটি ছিল আলোকায়ন; অর্থাৎ, এমন একটি চিন্তাধারা যা যুক্তির গুরুত্বের ওপর জোর দেয়। ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ কিতাবে এই আলোকায়নের প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।
যুক্তি দাবি করে যে, জ্ঞান হতে হবে বিভিন্ন ধারণার যৌক্তিক এবং পদ্ধতিগত নিরীক্ষার ফসল। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, আলোকায়ন বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতির সাথে যুক্ত ছিল, যা দিনশেষে শিল্পবিপ্লবের পথ প্রশস্ত করেছিল। মানুষের যৌক্তিকতা বা বিচারবুদ্ধি সংক্রান্ত এই ধারণাগুলো তৎকালীন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কাজেও ব্যবহৃত হয়েছিল।
‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ গ্রন্থে রুশো এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে, সরকারের কোন রূপটি বৈধ এবং কখন ব্যক্তির উচিত শাসকদের মেনে চলা। রুশো রাজাদের ‘ঐশ্বরিক অধিকার’ বা শাসন করার বিধাতাপ্রদত্ত ক্ষমতার ধারণাটি প্রত্যাখ্যান করেন। কিছু মানুষ জন্মগতভাবে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, এই তত্ত্বটিও তিনি মেনে নেননি। তার মতে, ‘একটি সমাজ শাসন করার একমাত্র ন্যায়সঙ্গত সার্বভৌম শক্তি হলো স্বয়ং নাগরিকদের সমষ্টিগত ইচ্ছা।’
আলাপের সাধারণ পরিসর
সেই সময়ে সরকারের প্রকৃতি নিয়ে যাদের চিন্তাধারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী ছিল, তারা হলেন ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক দার্শনিক থমাস হবস ও জন লক, নেদারল্যান্ডসের হুগো গ্রোটিয়াস এবং প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল।
- থমাস হবস ও গ্রোটিয়াস: হবস তার ‘লেভিয়াথান’ (১৬৫১) গ্রন্থে যুক্তি দেন যে, সমাজের জন্য শক্তিশালী সরকার অপরিহার্য; কারণ তা না হলে সমাজ একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হবে। অন্যদিকে, গ্রোটিয়াস যুক্তি দিয়েছিলেন যে, প্রজাদের ওপর শাসকদের একচ্ছত্র অধিকার রয়েছে এবং এর অর্থ হলো এমনকি একটি নিপীড়ক শাসনব্যবস্থাও বৈধ বলে বিবেচিত হতে পারে।
- অ্যারিস্টটল: তিনি দাবি করেছিলেন যে, সমাজের কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণী অন্যদের তুলনায় স্বভাবগতভাবেই শাসনের জন্য বেশি উপযুক্ত।
- জন লক: লক এমন এক সরকারের প্রস্তাব করেছিলেন যা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকে সমর্থন করে না। তার যুক্তি ছিল, কোনো শাসকের কর্তৃত্বের একমাত্র বৈধ ভিত্তি হলো সমাজের ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষা করা।
রুশোর মূল লক্ষ্য ছিল হবস, গ্রোটিয়াস এবং অ্যারিস্টটলের যুক্তিগুলো কেন ভুল তা প্রমাণ করা এবং এর মাধ্যমে একটি ন্যায়সঙ্গত ও সুষ্ঠু সরকারের ভিত্তি স্থাপন করা। তিনি লকের ধারণার সাথে সাধারণভাবে একমত হলেও একটি মৌলিক জায়গায় দ্বিমত পোষণ করেন। রুশো মনে করতেন, এই চুক্তিটি কেবল একজন শাসক এবং বাকি সমাজের মধ্যে হওয়া উচিত নয়; বরং এটি হওয়া উচিত সমাজের প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের।
মূখ্য বিষয়বস্তু
রুশো তার গ্রন্থে যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, একটি সরকার কেবল তখনই বৈধ হতে পারে, যদি তা শাসিতের সম্মতির মাধ্যমে গঠিত হয়। তিনি মূলত এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন যে, ‘মুক্ত ও ন্যায্য পরিবেশে মানুষ কোন ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি সম্মতি দেবে?’
এই সমস্যার সমাধানে রুশো ‘সাধারণ ইচ্ছা’র ধারণাটি নিয়ে আসেন। রুশোর যুক্তি হলো, সাধারণ ইচ্ছা অনুসরণের মাধ্যমে সার্বভৌম শক্তি ন্যায়সঙ্গতভাবে শাসন করতে সক্ষম হবে। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তিরা স্বাধীনই থাকে, কারণ নিজেদের স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে দেখার পরিবর্তে মানুষ নিজেদের সবার আগে একটি অখণ্ড সমষ্টির অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
এরপর রুশো সার্বভৌমত্ব নিয়ে আলোচনা করেন এবং এই মতবাদ তুলে ধরেন যে—জনগণকেই হতে হবে সার্বভৌম। এর অর্থ হলো, বৈধ শাসন অবশ্যই হতে হবে গণতান্ত্রিক। রুশো চমকপ্রদ প্রস্তাব করেন যে, কেউ যদি এই সাধারণ ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়, তবে তাকে ‘স্বাধীন হতে বাধ্য করা হবে’। ব্যবহারিক অর্থে এর মানে হলো, তাকে সমগ্র সম্প্রদায়ের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের সাথে সংগতি রেখে চলতে বাধ্য করা হবে।
অন্যান্য বিষয়বস্তু ও ধর্মীয় স্বাধীনতা
রুশোর ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান দিক হলো, কীভাবে একটি সরকার ‘সাধারণ ইচ্ছা’ অনুসরণ করার পাশাপাশি ব্যক্তির স্বাধীনতাও বজায় রাখতে পারে, তা ব্যাখ্যা করা।
সামাজিক চুক্তিতে প্রবেশ মানুষের মধ্যে এক মৌলিক পরিবর্তন আনে। প্রাকৃতিক অবস্থা থেকে নাগরিক সমাজে উত্তরণ মানুষের মধ্যে এক অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটায়; এটি মানুষের আচরণের ক্ষেত্রে সহজাত প্রবৃত্তির স্থলে ন্যায়বিচারকে স্থলাভিষিক্ত করে।
আলোকায়ন যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক ছিল চার্চ ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে। রুশো প্রস্তাব করেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস সম্প্রদায়ের জন্য ক্ষতিকারক না হয়, ততক্ষণ তাদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকা উচিত। তবে তিনি আরও প্রস্তাব করেন যে, মানুষকে স্বার্থপর হওয়া থেকে বিরত রাখতে সমাজের একটি নাগরিক বিশ্বাসের ঘোষণা থাকা প্রয়োজন, যার মূল কথা হবে, এক বিধাতা আছেন এবং পরকালে পুণ্যবানরা পুরস্কৃত হবেন ও পাপাচারীরা দণ্ডিত হবেন।
সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা
রুশোর এই বইয়ের ধারণাগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়াটি এসেছিল বইটি প্রকাশিত হওয়ারও আগে। ১৭৪৮ সালে স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম তার প্রবন্ধ ‘অফ দি অরিজিনাল কন্ট্রাক্ট’-এ সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ করেন। হিউমের প্রধান যুক্তিগুলো ছিল:
- এই তত্ত্ব সমস্ত রাজনৈতিক অধিকার ও বাধ্যবাধকতাকে একটি সামাজিক চুক্তি থেকে উদ্ভূত বলে মনে করে, অথচ পৃথিবীর ইতিহাসে বাস্তবে এমন কোনো চুক্তির অস্তিত্ব কখনোই ছিল না।
- যে পরিস্থিতিতে সামাজিক চুক্তিটি সম্পাদিত হয়, তা মুক্ত ও ন্যায়সঙ্গত কি না তা জানার কোনো উপায় নেই।
আরেকটি সমালোচনা আসে ১৮১৬ সালে সুইস দার্শনিক বেঞ্জামিন কনস্ট্যান্ট-এর কাছ থেকে। কনস্ট্যান্টের মতে, যেহেতু গণতন্ত্র দাবি করে যে জনগণকে ‘নাগরিক-যন্ত্রে’ রূপান্তরিত হতে হবে, তাই এটি ব্যাপক ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সাথে সহাবস্থান করতে পারে না।
রুশোর উত্তর হয়তো এমন হতো যে, সামাজিক চুক্তি কোনো ঐতিহাসিক তথ্য নয়, বরং এটি একটি তাত্ত্বিক কাঠামো। এটি একটি মানস পরীক্ষা, যার মাধ্যমে যাচাই করা যায় যে বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা মানুষকে স্বাধীনভাবে বাঁচতে দিচ্ছে কি না।
সমকালীন গবেষণায় প্রভাব
রুশোর দ্বারা অনুপ্রাণিত আধুনিক যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ হলেন জন রল্স। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আ থিওরি অফ জাস্টিস’-এ রল্স ঠিক তেমন একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যা দিয়ে রুশো তার আলোচনা শুরু করেছিলেন। রল্সও একটি ‘চুক্তিভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি’ গ্রহণ করেছেন এবং তার ব্যবহৃত ‘আদি অবস্থা’ ধারণাটি রুশোর ‘প্রাকৃতিক অবস্থা’ ধারণার মতোই।
সংক্ষিপ্তসার
শিক্ষার্থীদের আজও রুশোর ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ পড়া উচিত। তার প্রধান কারণ হলো তার উত্থাপিত এই মৌলিক প্রশ্নটি: একটি বৈধ সরকারের শর্তাবলি কী কী? পাশ্চাত্য রাজনৈতিক চিন্তাধারার ইতিহাসে এটি অন্যতম বিতর্কিত এবং প্রভাবশালী একটি কাজ।
এই গ্রন্থের ব্যাপক প্রভাবের কারণ হলো, রুশো সেই হাতেগোনা কয়েকজন চিন্তাবিদদের মধ্যে একজন যারা ব্যক্তি কীভাবে অন্য কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ইচ্ছার দাসে পরিণত হওয়া থেকে মুক্তি পেতে পারে, তা গভীরভাবে ভেবেছেন। রাজনৈতিক চিন্তাধারার ইতিহাস, বর্তমানের রাজনৈতিক দর্শন কিংবা মানব প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি পেতে আগ্রহী যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্য ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ এক অমূল্য পাঠ।