থমাস হবসের ‘লেভিয়াথান’: ক্ষমতা, সমাজ ও রাষ্ট্রের এক অমর দর্শন
গত ৪ ডিসেম্বর ছিল বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক থমাস হবসের (৫ এপ্রিল ১৫৮৮ – ৪ ডিসেম্বর ১৬৭৯) মৃত্যুবার্ষিকী। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাঁর লেখা রাষ্ট্রদর্শন বিষয়ক যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘লেভিয়াথান’ (Leviathan)-কে। ১৬৫১ সালে প্রকাশিত এই বইটির পুরো নাম: Leviathan or The Matter, Forme and Power of a Commonwealth Ecclesiasticall and Civil। এই গ্রন্থে হবস মানবস্বভাব, সমাজ ও সরকারব্যবস্থার মৌলিক প্রশ্নগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠকদের জন্য ‘লেভিয়াথান’ বইয়ের মূল বিষয়বস্তু, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে সাজানো হয়েছে আজকের এই আলোচনা।
লেখকের জীবন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
“The condition of man is a condition of war, or everyone versus everyone.” — Thomas Hobbes, Leviathan
থমাস হবস তাঁর বইয়ের জন্য যে শিরোনামটি বেছে নিয়েছিলেন— লেভিয়াথান— তা মূলত ক্ষমতা, আকৃতি এবং বাইবেলে বর্ণিত মহিমা ও রহস্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। বইটির মূল প্রচ্ছদে বাইবেলেরই একটি উদ্ধৃতি ছিল (জব ৪১:২৪): “পৃথিবীতে এমন কোনো শক্তি নেই যা তাঁর সঙ্গে তুলনীয়।” এই উক্তিই প্রমাণ করে যে, হবস মূলত একটি বিষয়েই সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন—ক্ষমতা।
প্রচ্ছদের চিত্রে দেখা যায় এক রাজাকে, যার দেহ গঠিত হয়েছে শত শত ক্ষুদ্র মানুষের দ্বারা। হবসের মতে, ‘লেভিয়াথান’ (বাইবেলে বর্ণিত এক পৌরাণিক প্রাণী) আসলে এমন একটি কৃত্রিম সত্তা, যা প্রজাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছাগুলোর তদারকি করে এবং সেগুলোকে নিজের মধ্যে ধারণ করে।
আজকের লিবেরাল গণতন্ত্রে ক্ষমতা ও বৈধতার প্রশ্নটিকে আমরা অনেকাংশে মীমাংসিত ধরে নিলেও, এর ব্যাখ্যার জন্য আমাদেরকে হবসের শুরু করে দেওয়া সেই বৌদ্ধিক যাত্রাপথের দিকেই তাকাতে হয়। ডাচ দার্শনিক হুগো গ্রোশিয়াস ‘সামাজিক চুক্তি’র (social contract) ধারণা প্রথমে প্রস্তাব করলেও, হবস তাঁর ‘লেভিয়াথান’-এ এই ধারণাগুলোর উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটান, যা পরবর্তীতে জন লকসহ অন্যান্য চিন্তাবিদদের হাত ধরে আরও বিস্তৃত হয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
‘লেভিয়াথান’ বুঝতে হলে তৎকালীন ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক অবস্থার দিকে তাকানো জরুরি। ইংল্যান্ড তখন গৃহযুদ্ধের আগুনে জ্বলছিল। সংঘাতের মূল প্রশ্ন ছিল—রাজার ক্ষমতার কোনো সীমা আছে কি না। রাজা প্রথম চার্লস মনে করতেন তাঁর শাসনক্ষমতা খোদাপ্রদত্ত এবং অসীম। অন্যদিকে সংসদ চাইত রাজার ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরতে। এই রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের প্রেক্ষাপটেই হবস অনুভব করেছিলেন সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে একজন শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সত্তা বা সার্বভৌম শাসকের প্রয়োজনীয়তা।
হবস নিজে কোনো অভিজাত পরিবারের সন্তান ছিলেন না, তবে গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষায় অগাধ পাণ্ডিত্য তাঁকে ক্যাভেনডিশ পরিবারের মতো অভিজাতদের শিক্ষক হওয়ার সুযোগ করে দেয়। গৃহযুদ্ধের সময় তিনি প্যারিসে পালিয়ে যান এবং সেখানে বসেই ১৬৫১ সালে ‘লেভিয়াথান’ লেখা শেষ করেন।
‘লেভিয়াথান’ বইয়ের প্রধান চিন্তাসমূহ
“I put for the general inclination of all mankind, a perpetual and restless desire of power after power that ceaseth only in death.” — Thomas Hobbes, Leviathan
‘লেভিয়াথান’ গ্রন্থে থমাস হবস এমন একটি শান্তিপূর্ণ সমাজের চিত্র তুলে ধরেন, যার ভিত্তি হবে কমনওয়েলথ বা একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা; আর এই কমনওয়েলথ সম্ভব হবে সোশ্যাল কনট্রাক্ট বা সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে। অর্থাৎ, জনগণ তাদের জীবন ও মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে একজন সার্বভৌম শাসকের কর্তৃত্ব মেনে নিতে সম্মত হবে।
বইটির প্রধান থিমগুলো হলো:
- অ্যাবসলিউটিজম বা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার পর্যালোচনা: রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব খোদার ইচ্ছা থেকেই সৃষ্ট—এই প্রচলিত ধারণাটিকে হবস প্রত্যাখ্যান করেন।
- কর্তৃত্বের উৎস: রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা, ধর্ম ও রাজনীতির পেছনে থাকা প্রাকৃতিক ও ধর্মীয় সূত্রসমূহের বিশ্লেষণ।
- মানবিক দ্বন্দ্ব: মানবিক আবেগ (passion) ও যুক্তির (rationality) মধ্যে বিদ্যমান সংঘাত।
হবসের চোখে সার্বভৌম শাসকের রূপ রাজতন্ত্র, গণতন্ত্র বা অভিজাততন্ত্র—যেকোনোটিই হতে পারে, তবে তিনি গণতন্ত্রকে অস্থিতিশীল মনে করতেন। তাঁর মতে, সার্বভৌম শাসক কেবল দুর্বলদের রক্ষাকর্তা নন, তিনি সমাজের সেন্সর হিসেবেও কাজ করবেন। কোন চিন্তা শান্তির সহায়ক আর কোনটি বিপজ্জনক, তা নির্ধারণের ক্ষমতাও তাঁর হাতে থাকবে।
বইটিকে হবস কয়েকটি ধাপে ভাগ করেছেন:
১. মানুষের প্রকৃতি ও আবেগের বিশ্লেষণ (যাকে তিনি অন্যান্য প্রাণীদের থেকে আলাদা বলেছেন)।
২. সমাজ কীভাবে গড়ে উঠল, রাষ্ট্রের সংজ্ঞা এবং নাগরিকের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক চার্চ বা গির্জা নিয়ে ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনা।
৪. ক্ষমতা বিস্তারের লক্ষ্যে চার্চ কীভাবে ধর্মগ্রন্থের অপব্যাখ্যা ও কুসংস্কার ব্যবহার করে তার সমালোচনা।
বইটির অপ্রধান কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ কিছু চিন্তা
“You do not know what sort of God mine is…I am not astonished; for I believe that, if a triangle could speak, it would say, in like manner, that God is eminently triangular...” — Baruch Spinoza (হবসের দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত)
‘লেভিয়াথান’-এ এমন অনেক সম্পূরক বিষয়বস্তু আছে, যা পরবর্তীতে অত্যন্ত প্রভাবশালী প্রমাণিত হয়েছে:
- নৈতিক মূল্য নির্ধারণ: হবস অপরিবর্তনীয়, শাশ্বত নৈতিক সত্যের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, নৈতিক আইন খোদার কাছ থেকে নয়, বরং প্রকৃতি থেকেই উদ্ভূত। এই ধারণাটি আধুনিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের পথ প্রশস্ত করে।
- ধর্মীয় সহনশীলতা: হবস মনে করতেন, ব্যক্তিগত বিশ্বাস ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত, যতক্ষণ মানুষ জনপরিসরে জনসাধারণের রীতিনীতি মেনে চলে। এটি ছিল উদারনীতিবাদের (liberalism) বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
- প্রতিরক্ষামূলক সামরিক নীতি: হবস যুক্তি দিয়েছিলেন যে, রাষ্ট্রের শুধুমাত্র প্রতিরক্ষার ওপর ভিত্তি করে সামরিক নীতি গ্রহণ করা উচিত, আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্যে নয়।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিচার্ড টাক মনে করেন, হবসের এসব চিন্তাধারা তাঁকে একজন ‘আদি-উদারনৈতিক’ (proto-liberal) হিসেবে চিহ্নিত করে। কারণ, তিনি সার্বভৌম শাসককে জনগণের মাধ্যমেই গঠিত বলে মনে করতেন এবং খোদ জনগণের মধ্যেই ক্ষমতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
সমালোচনা ও প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া
হবস সচেতনভাবেই হোক বা অবচেতনভাবেই হোক, ‘লেভিয়াথান’ প্রকাশের মাধ্যমে নিজেকে তৎকালীন প্রায় প্রতিটি ক্ষমতাবলয়ের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিলেন। ধর্মগুরু, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ—সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে বইটিকে নাস্তিকতাপ্রধান, সর্বগ্রাসবাদী এবং অনৈতিক বলে আক্রমণ করেন।
তৎকালীন ইংল্যান্ডে ধর্মের ব্যাপারে তাঁর সমালোচনা এবং গির্জার প্রতি অবজ্ঞা তাঁকে কট্টর রাজতান্ত্রিকদের শত্রুতে পরিণত করে। ‘ধর্মহীনতা’ বা ‘অধার্মিকতা’ বোঝাতে সেসময় ‘হবসিজম’ (Hobbism) শব্দটি চালু হয়ে যায়!
তবে হবস ভয় পেয়ে পিছপা হননি। তিনি সরাসরি বিতর্কে না জড়ালেও, তাঁর পরবর্তী রচনাগুলোতে (যেমন: Behemoth) সমালোচকদের যুক্তির কড়া জবাব দিয়েছেন। এমনকি ‘লেভিয়াথান’-এর একটি ল্যাটিন সংস্করণ প্রকাশ করে উচ্চশিক্ষিত সমাজের কাছে নিজের অবস্থান আরও পরিষ্কার করেন।
‘লেভিয়াথান’র অর্জন ও আধুনিক রাষ্ট্রে প্রভাব
“A man’s conscience and his judgment are the same thing, and, as the judgment, so also the conscience may be erroneous.” — Thomas Hobbes, Leviathan
থমাস হবসের রাষ্ট্র সংক্রান্ত তত্ত্ব দৃঢ়ভাবে বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিসঙ্গত বক্তব্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। ‘লেভিয়াথান’ প্রকাশের শত শত বছর পর ইংল্যান্ড একটি প্রকৃত গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু হবস রাষ্ট্র ও সমাজের যে রূপরেখা দাঁড় করিয়েছিলেন তা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
আজকের যুগে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার ধারণাটি হজম করা কঠিন হলেও, সার্বভৌমত্ব, পরিচয়, রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং নাগরিক সংঘাত নিয়ে সাম্প্রতিককালের বিভিন্ন বিতর্কে ‘লেভিয়াথান’-এর প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে আসে। বারুখ স্পিনোজা থেকে শুরু করে জন লক, ইমানুয়েল কান্ট এবং আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা হবসের চিন্তাধারার কাছে গভীরভাবে ঋণী।
যতদিন মানুষ সমাজ গঠন করবে এবং রাজনীতি বিদ্যমান থাকবে, ততদিন থমাস হবসের ‘লেভিয়াথান’ একটি অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ও প্রভাবশালী ধ্রুপদী গ্রন্থ হিসেবে পঠিত হতে থাকবে।