
প্রায় নয়শো পঞ্চাশ মিটার উচ্চতার অতীত এক আগ্নেয়গিরির সুপ্ত জ্বালামুখে নিপুণরূপে গোলাকার এই মৃত হ্রদটির জন্ম; সেন্ট আনা—বৃষ্টির থৈ থৈ জলে ভরপুর। উজ্জ্বল স্বাস্থ্যেভরা ক্যাটফিশেরাই, এবং ঝাঁকে ঝাঁকে শুধু তারাই এখানে বাস করে। ভাল্লুকেরা, এখানে টলটলে জল পান করতে, মানুষের পথ না মাড়িয়ে, পাইন-অরণ্যের ভেতর থেকে হেলেদুলে বের হয়ে আসে।
হ্রদের পাশেই একটা সমতল জলাভূমি, স্যাঁতস্যাঁতে নরোম ভূভাগ তার, লোকজন খুব একটা আসে না এদিকে। এখন: জলাভূমির ওপর কাঠের তক্তায় বানানো একটা আঁকাবাকা পথ শুয়ে আছে।
শ্যাওলার লেকও বলে এটাকে, আর জলের কথা যদি বলি, জনশ্রুতি আছে: এর পানি কখনও বরফ বাঁধে না, কারণ হ্রদের মাঝামাঝি জায়গাটা সবসময়ই উষ্ণ থাকে; আগ্নেয়গিরির মুখটা যদিও হাজার হাজার বছর ধরে মরে পরে আছে। শতাব্দীর থমথমে নৈঃশব্দ্য এই বিরানভূমির ওপর সর্বদা উবুর হয়ে থাকে।
এক আদর্শ জায়গা বটে—আর্ট ক্যাম্পের আয়োজকদের একজন প্রথম দিনই আগত শিল্পী কবিদের চারপাশটা ঘুরিয়ে দেখানোর সময় এই মন্তব্য করেছিলেন—; জটিল চিন্তাভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকবার জন্য উপযুক্ত স্থান তো অবশ্যই, ঘোরাঘুরির জন্যেও সেরা, সবুজ সতেজ হাওয়া বইছে সবসময়; মনোরম এই সুযোগের সুব্যবহার না করার ভুল করে নি কেউই।
ক্যাম্পের কাছেই হাজার মিটার উঁচু শৃঙ্গের পর্বত। পাহাড়ে ওঠানামার—চড়াই-উতরাই—দুই পথে, পথিকের ভীড়ও ছিলো বেশ—তার মানে এই নয় যে আর্টক্যাম্পে এক্সাইটিং কাজকর্ম কিছু হচ্ছিলো না। প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর সকলে আরও উদ্যমে উৎসাহে সৃজনশীলতায় মগ্ন হচ্ছিলো; সময়—তার স্বভাবমতোই কেটে যাচ্ছিলো; আর তাদের সৃষ্টিমুখর অভিপ্রায়সমূহ এই জায়গার বরকতে পুষ্ট হচ্ছিলো—নান্দনিক শিল্পকর্মগুলো কল্পনা থেকে বাস্তবে আকৃতি পাচ্ছিলো ধীরেধীরে।
ক্যাম্পের বরাদ্দ পাওয়া জায়গায় থিতু হয়েছে প্রত্যেকেই, নিজেদের মত সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়েছে। অধিকাংশই মূল ভবনে ব্যক্তিগত ঘর নিয়েছে, কেউ কেউ ইচ্ছে করে পুরনো কাঠের কুঁড়েঘরে বা বহুদিনের পরিত্যক্ত চালাঘরে গিয়ে জুটেছে। তিনজন উঠেছিল ক্যাম্পের মধ্যিখানে মূল ভবনের বিশাল চিলেকোঠার ঘরটায়, সকলেই এমতো আপন ধ্যানমঞ্চটি নির্ধারণ করে নিয়েছিলো। বলা বাহুল্য, মননশীল কাজের সময় নিরবচ্ছিন্ন নির্জনতা সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বিষয়।
সেভাবেই কাজ চলছিলো নির্বিঘ্নে, প্রশান্তচিত্তে, দিনগুলোও কেটে যাচ্ছিলো সেই ছন্দেই—বেশিরভাগ সময় কাজ, বাকি সময়টুকু হাঁটা, হ্রদে একটু মনোরম স্নান, সুস্বাদ খাওয়াদাওয়া আর সন্ধ্যায় ক্যাম্পফায়ারের চারপাশে বসে হোমমেইড ব্রান্ডি হাতে দিলখোলা গান।
তবে এই গল্পে এমন সাধারণ বিষয়বস্তু ও বর্ণনাভঙ্গি ব্যবহার করাটা ভুল হয়েছে আসলে, কারণ ধীরে ধীরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই প্রকাশ পেল—যেটা সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষকরা প্রথম দিনেই টের পেয়েছিলেন, আর বাকিদের কাছে তৃতীয় দিন সকাল নাগাদ ব্যাপারটা প্রতিষ্ঠিত হলো—বারোজনের এই দলে এমন একজন আছেন, যিনি বাকিদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাতের। তার আগমনটাই স্বয়ং ঘোর রহস্যের মত, বা ন্যূনতম এইটুকু তো বটেই—অন্যদের মত তিনি এখানে আসেন নি—না ট্রেনে এসেছেন, না বাসে!
যেদিন তিনি আসেন, সন্ধ্যা ছয়টা বা সাড়ে ছয়টা হবে, সবাই দেখলো, হঠাৎ করেই লোকটা পায়ে হেঁটে শিবিরের ফটক দিয়ে ঢুকে পড়লেন, যেন সোজা হেঁটেই চলে এসেছেন কোথাও থেকে, আর সকলের উৎসুক চোখের দিকে তাকিয়ে একবার শুধু মাথা দোলানো সম্ভাষণ জানালেন।
আয়োজকেরা যথাবিহিত সম্মানপ্রদর্শনপূর্বক প্রথমে তার নাম ধাম পরিচয় জানতে চাইলেন, তবে লোকটির উদাসীন নীরবতার প্রতিক্রিয়ায় তাদের আরও জোরদার জিজ্ঞাসাবাদে যেতে হলো। আগমন সংক্রান্ত কৌতূহল মেটাতে লোকটা দায়সারা উত্তরে বললেন—কেউ তাকে গাড়িতে করে রাস্তার মোড়ে ছেড়ে গিয়েছে। কিন্তু চরাচরব্যাপী এই নৈঃশব্দ্যের ভেতর কেউ তো কোনো গাড়ির শব্দ শুনলো না, যেটা তাকে রাস্তার বাঁকে নামিয়ে যেতে পারে!
তাই এই ভাবনাটা—যে তিনি একটি গাড়িতে এসেছেন বটে, কিন্তু সেই গাড়ি পুরো পথ নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট রাস্তার বাঁক পর্যন্ত এসেছে এবং তারপর তিনি নেমে হেঁটে এসেছেন—বেশ অবিশ্বাস্য লাগলো; কেউই তাকে ঠিক বিশ্বাস করলো না—বা আরও নির্দিষ্ট ক’রে যদি বলি, কেউ তার প্রচ্ছন্ন কথাবার্তার মানে বুঝে উঠতে পারছিল না। তাই সেই প্রথম দিন থেকেই একমাত্র সম্ভাব্য, একমাত্র যুক্তিসঙ্গত—যদিও একইসাথে সবচেয়ে অযৌক্তিক সম্ভাবনাটি ঝুলছিলো: তিনি পুরো পথটাই হেঁটে এসেছেন।
বুখারেস্ট থেকে যাত্রা শুরু: ট্রেনে বাসে না চড়ে কেবল অবিরাম পায়ে হাঁটা—কে জানে কত সপ্তাহ ধরে—সেই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর পথ পেরিয়ে সন্ধ্যা ছয়টা বা সাড়ে ছয়টার দিকে সেন্ট আনা হ্রদের পাশে স্থাপিত আর্টক্যাম্পটির ফটকে এসে হাজির হয়েছিলেন এ আগন্তুক। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, আয়োজক কমিটি কি জনাব ইয়ন গ্রিগোরেস্কুকে স্বাগত জানানোর সম্মান পাচ্ছে? তখনও তিনি একটি সংক্ষিপ্ত হ্যাঁ-বাচক মাথা নেড়ে উত্তর সেরেছিলেন।
অবশ্য তার জুতাটার দিকে তাকালে সম্ভাবনাটাকে এত অবিশ্বাস্যও লাগবে না। জুতাজোড়া সম্ভবত বাদামি রঙের ছিল একসময়—হালকা, গরমের দিনের জন্য বানানো সিন্থেটিকের লোফার, আঙুলের ডগার অংশে সেলাই করা নকশা টুটে গেছে, ফাটা ছেঁড়া জুতাটা যেন পায়ের চারপাশে ঝুরঝুর করে ভেঙে পরতে চাইছে। সোলদুটো আলগা, হিলগুলো ক্ষয়ে সমতল, ডান পায়ের কনি আঙুলের কাছে চামড়ার আবরণীটা ত্যারছা ভাবে ছিঁড়েছে, ফলত নীচের মোজা প্রকাশিত হয়ে আছে।
তার সবকিছু শেষ অব্ধি একটা রহস্যই থেকে গেলো কারণ, শুধু তার জুতোজোড়াই নয়, তিনি যে পোশাক-পরিচ্ছদ পরেছিলেন তাও অন্যদের পশ্চিমা বা পশ্চিমাসুলভ জামাকাপড় থেকে ছিলো আলাদা। তার পোশাক দেখে মনে হচ্ছিলো বন্ধুটি এইমাত্র সোজা চাউশেস্কু যুগ—আশির দশকের শেষ দিকের সেই দারিদ্র্য আর হতাশার সময়—থেকে টাইম ট্রাভেলের মাধ্যমে হঠাৎই বর্তমান চিত্রপটের ভেতর এসে উপস্থাপিত হয়েছেন।
বিবর্ণ ফ্যাকাশে ঢিলেঢালা প্যান্টটা মোটা ফ্লানেল কাপড়ের মতো কিছু একটা দিয়ে তৈরি, টাখনুর ওপর নির্বিকারভাবে ঝুলছিলো; এবং আরও বেদনাদায়ক ছিলো তার হতদরিদ্র ঢিলেঢালা কার্ডিগানটি—বিপুল হতাশার মতো শ্যাওলামলিন সবুজ একটি চেক শার্টের উপর চাপানো, গরমকাল সত্ত্বেও গলা পর্যন্ত বোতাম লাগানো।
জলচর হাঁসের মতো লোকটা হালকা গড়নের, কুঁজো কাঁধ, মাথাজোড়া টাক, বিকটদর্শন বিধ্বস্ত মুখাবয়বে গাঢ়-বাদামী দুটো বিশুদ্ধ চোখ, জ্বলছিল—দুটো নিখাদ জ্বলন্ত চোখ—; ভেতরের উত্তাপে জ্বলছিল না, বরং দুটি স্থির আয়নার মতো, বাইরের জ্বলন্ত বস্তুরাজিকে প্রতিফলিত করছিল যেনবা।
তৃতীয় দিনের মধ্যে সবাই বুঝতে পারল, আর্ট ক্যাম্প তার জন্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় না, কাজকর্ম কিছুই করতেন না, সামার ভ্যাকেশনে মানুষ যা করে—সাঁতার কাটা, পাহাড়ে ট্র্যাকিং, মাছ ধরা বা আরও যা আনন্দদায়ক কাজকর্ম—তার কিছুই তিনি করতেন না; এই ধরনের আর্টক্যাম্পগুলোতে লোকে সাধারণত যা যা করে।
আয়োজকদের কাছ থেকে একজোড়া জুতো চেয়ে নিয়েছিলেন তিনি (তারা স্টোর রুমে পেরেকে ঝোলানো একজোড়া বুট খুঁজে পেয়েছিল)। ক্যাম্পের ভেতরেই সারাদিন সেই বুট পরে ঘোরাফেরা করতেন, কখনও ক্যাম্পের পরিধির বাইরে যেতেন না, না পাহাড়ে ওঠা, না পাহাড় থেকে নামা, না হ্রদের চারপাশে পায়চারি, এমনকি শৈবাল-ঢাকা ছোট হ্রদের ওপর কাঠের তক্তা বিছানো পথটিতেও কখনো হাঁটতে দেখা যায় নি তাকে। ক্যাম্পেই এদিক সেদিক পায়চারি করতেন, অন্যরা কী কাজকর্ম করছে দেখতেন, মূল ভবনের সমস্ত ঘরেই তার গতায়তি ছিলো।
চিত্রশিল্পী, প্রিন্টমেকার, ভাস্করদের পিঠের পিছনে নীরবে এসে থামতেন এবং গভীর মনোযোগে দেখতেন—কীভাবে একটি শিল্পকর্মে দিন দিন পরিবর্তন ঘটছে; চিলেকোঠায় উঠতেন; চালাঘরে, কাঠের কুঁড়েঘরে যেতেন—তবে কারও সাথে কথাবার্তা বলতেন না, কোনো প্রশ্নের উত্তরে সামান্যতম শব্দও মুখ থেকে বেরুতো না, যেন তিনি বোবা কালা, বা যেন বুঝতে পারছেন না তার কাছে কী চাওয়া হচ্ছে; একেবারে নিঃশব্দ, নির্লিপ্ত, অনুভূতিহীন—একটা ভূতের মতো, একটা গাছের মতো; এবং যখন তারা এগারোজনই তাকে খেয়াল করতে শুরু করলো (যেমন করে গ্রিগোরেস্কুও তাদের পর্যবেক্ষণ করছিলেন), তারা একটি উপলব্ধিতে পৌঁছুলো।
তারা সেদিন সন্ধ্যায় ক্যাম্পফায়ারের চারপাশে বসে নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিচ্ছিলো (গ্রিগোরেস্কুকে কখনও এসব আড্ডাতেও দেখা যায় নি, তিনি প্রতিদিনই জলদি ঘুমাতে যেতেন)। উপলব্ধিটা হলো যে, হ্যাঁ, লোকটার আগমন, হয়তো, ভূতুড়েই ছিল; তার জুতো, তার কার্ডিগান, তার বিধস্ত মুখ, তার শীর্ণজীর্ণ পরিচ্ছদ, তার ইটের ভাটার মতো চোখ, সবই অস্বাভাবিক—কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়টা তারা তখনই আবিষ্কার করল, যা এতদিন কারও চোখে পড়েনি এবং সেটাই আসলে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক: বর্তমান সময়ের স্বনামধন্য একজন শিল্পী, যিনি সবসময় সতেজ সক্রিয় বলে পরিচিত, এখানে এসে—যেখানে সবাই শিল্প নির্মাণে মগ্ন—তিনি পুরোপুরি বেকার, একেবারে কিছুই করছেন না।
তিনি যে কিছুই করেন না—এই উপলব্ধিটাই তাদের বিস্মিত করছিলো। তারা আরও বেশি অবাক হচ্ছিলো এই ভেবে—ক্যাম্প শুরু হওয়ার পর ছয়, সাত, বা আটদিন কেটে গিয়েছে। কেউ কেউ তো তাদের কাজে ফাইনাল টাচ দিচ্ছে, অথচ এখন, এই মুহূর্তে, তারা ব্যাপারটা ধরতে পারলো।
তিনি আসলে করছিলেনটা কী ?
কিছু না, একেবারেই কিছু না। ঐশ্বর্যময় নাথিংনেস!
তার গতিবিধির প্রতি, তখন থেকে, অবচেতনেই চক্ষু সেঁটে থাকলো তাদের, আর একদিন কোনো এক উপলক্ষে—সম্ভবত দশম দিনে—তারা খেয়াল করলো, ভোরবেলা এবং শান্ত সকালের পুরো সময়টা জুড়েই, যখন সাধারণত অন্যরা ঘুমিয়ে থাকে, বেশ কিছুটা সময় এমন যায়, গ্রিগোরেস্কু—যিনি সাধারণত ভোরে ওঠেন বলেই সবাই জানে—তাকে কোথাও দেখা যায় না। কোথাও নেই—না কুড়েঘরে, না চিলেকোঠায়, না ভেতরে, না বাইরে—কিছু সময়ের জন্য তিনি জাস্ট নাই হয়ে যান।
তাদের কৌতূহল গাঢ় হয়ে উঠলো। বারোতম দিন সন্ধ্যায় কয়েকজন পরিকল্পনা করলো, পরদিন ভোর ভোর ঘুম থেকে জেগে ব্যাপারটা খতিয়ে দেখবে তারা। একজন হাঙ্গেরিয়ান চিত্রশিল্পী অন্যদের জাগানোর দায়িত্ব নিলো।
গ্রিগোরেস্কু তার ঘরে নেই এটা যখন তারা নিশ্চিত হলো, রাত তখনও অন্ধকার, ভোর হবে হবে। তারা মূল ভবন ঘুরে এসেছে, প্রধান ফটক পেরিয়ে বাইরেও খুঁজেছে, কুঁড়েঘর, চিলেকোঠাও দেখে এসেছে দুইজন—কিন্তু কোথাও লোকটার চিহ্ন নেই।
হ্রদ থেকে বইতে শুরু করেছে মৃদুমন্দ হাওয়া, ভোরের প্রস্ফুটমান আলোয় তারা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলো বিভ্রান্তের মতো। তাদের মাথার ওপর দিয়ে পরী উড়ে যাওয়া আকস্মিক নীরবতা।
কিছুক্ষণ পর একটি শব্দে সম্বিৎ ফিরলো তাদের। শব্দটা অতি ক্ষীণ, কোত্থেকে ভেসে আসছে বোঝা যাচ্ছিলো না। কিছুটা দূর থেকে ক্রমাগত ভেসে আসছে সাউন্ড; আরেকটু সংহতভাবে বললে, ক্যাম্পের অদৃশ্য অনুমেয় সীমানার ওপার থেকে—দুটো বাথরুম দেয়া আছে ওখানে, ধরে নেয়া হয় ওটিই একটি সীমানা, কারণ, বাথরুম লাগোয়া শুরুবিন্দুটি থেকে ভূখণ্ডটি মূল ক্যাম্পের পরিপাটি অঙ্গনের মতো ছিল না আর; সর্বময় বিরাজমান প্রকৃতি, যাকে কোনো একসময় জোর করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল এখান থেকে, সে এখনো জায়গাটিকে ফিরিয়ে নেয়নি বটে, তবুও স্থানটা পরিত্যক্ত, কিছুটা এবড়োখেবড়ো, ভূতুড়ে, নো-ম্যান’স ল্যান্ডের মতো, যার উপর ক্যাম্পসাইটের মালিকরা ব্যবহৃত আবর্জনা ফেলা ছাড়া আর কোনো দৃশ্যমান দাবি রাখে নি। ভাঙা ফ্রিজ থেকে শুরু করে প্রতিদিনের রান্নাঘরের কাঁচা ময়লা—যা কিছু ফেলা যায়, সবই সেখানে ফেলা হতো। সময়ের সাথে সাথে সেই পুরো জায়গাটা ঢেকে গেছে ঘন কাঁটাওয়ালা আগাছা পরগাছায়—এক মানুষ সমান উঁচু এক অবিনশ্বর ইউজলেস জঙলার স্তর ।
নীচে কোথাও, এই ঝোপঝাড়ের কোন এক পয়েন্ট থেকেই শব্দটা ভেসে আসছে।
এরপর কী করতে হবে তা নিয়ে দ্বিধায় রইলো না তারা। কোন শব্দ খরচা হলো না, মুখ চাওয়া-চাওয়ি হলো আর নীরবে মাথা নেড়ে জংলার ভেতর ঝাঁপিয়ে পরলো, কিছু একটা লক্ষ্য করে এগিয়ে চললো ঝোপঝাড় বিধ্বস্ত করে, শ্যাওলা মাড়িয়ে সামনের দিকে।
বেশ গভীরে যাওয়ার পর, ক্যাম্পসাইটের ভবনগুলো থেকে বেশ দূরেই, তারা শব্দটার উৎপত্তি ও ধরণ নির্ণয় করতে পারলো, গর্ত খোড়ার শব্দ। কেউ মাটি খননে মগ্ন।
শব্দের উৎসের দিকে তারা ঘুরলো এবারে। যন্ত্রটি মাটিবক্ষ ভেদ করে ডুবে যাচ্ছে, মৃত্তিকা স্তুপ উপরে তুলে ছুঁড়ে ফেলছে, আর তা ঝপ ঝপ শব্দে বুনো ঝাউ ঘাসের ওপর গিয়ে পরছে। শব্দের অনুসারী হয়ে তাদের ডানে মোড় নিতে হলো, দ্রুতক্ষেপে দশ পনের পা এগুতেই একটা বিশাল গর্তের কিনারে তারা আবিষ্কার করলো নিজেদের, আরেকটু হলেই সবাই গড়িয়ে যেতো নীচের দিকে। গর্তটা প্রায় তিন মিটার চওড়া এবং পাঁচ মিটার লম্বা, যার কেন্দ্রতলে গ্রিগোরেস্কুকে দেখা গেলো, এক ধ্যানে কাজ করছেন।
পুরো গর্তটি বেশ গভীর, তার মস্তকটি ওপর থেকে দেখা যায় কি যায় না—তিনি এমন ধী সহযোগে কাজ করছিলেন, টেরই পান নি কয়েকজন যে এসে দাঁড়িয়েছে এখানে। দৈত্যাকার গর্তটির কিনারায় দাঁড়িয়ে তারাও কেবল নীরবে কাজ দেখছিলো গ্রিগোরেস্কুর।
গর্তের ভেতর, একদম মাঝখানে, একটা ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে। পুরোটাই মাটির স্তর কেটে গড়া, প্রথম নজরে তারা শুধু এটুকুই দেখলো—একটা মেটে ঘোড়া রয়েছে দাঁড়িয়ে। আরেকটু ঘন মনোযোগ নিবিষ্ট করার পর তারা অনুভব করলো, ভাস্কর্যটা এত নিখুঁত, এত জ্যান্ত, বোধের ভেতর কিছু একটা দুলে উঠলো, মনে হলো ঘোড়াটা কেশর ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে পাশ ফিরলো আর ভীম বেগে ছুটে বেরিয়ে এলো—ভীত পলায়নপর সে, দাঁতের পাটি বেরিয়ে এসেছে, মুখে জমেছে কাতর ফেনা।
তারা বুঝল, গ্রিগোরেস্কু আসলে চারপাশের আগাছা পরিষ্কার করে বিশাল এই গর্তটা খুঁড়েছেন—মাঝের অংশে ঘোড়াটির চারপাশ থেকে সে এমনভাবে মাটি সরিয়েছেন, যেন আতঙ্কিত স্থবির একটা ঘোড়া মাটি ফুড়ে বেরিয়ে এসেছে, যেনবা সে ছিলো পাতাললোকে, কোনো অজানা অতল ভয়ের তাড়া খেয়ে পালাচ্ছিলো জ্যান্ত ঘোড়ার মতই, আর গ্রিগোরেস্কু তাৎক্ষণিক এসে তাকে মাটি খুঁড়ে মুক্ত করেছেন।
হতভম্ব হয়ে তারা কজন গ্রিগোরেস্কুর কাজ দেখছিলো সে ভোরবেলায়, সে এক মনে কাজ করে যাচ্ছে, আশপাশের উপস্থিতি সম্বন্ধে সম্পূর্ন উদাস।
দশদিন ধরে তাহলে তিনি ভোর থেকে সকাল অব্ধি খোঁড়াখুঁড়ির এই কাজটাই করেছেন।
একজন দর্শকের পায়ের নীচ থেকে মাটি পিছলে পরলে, সেই শব্দে মনোযোগ-বিঘ্নিত গ্রিগোরেস্কু কাজ না থামিয়ে একমুহূর্তের জন্য ওপরে তাকিয়ে দণ্ডায়মান ব্যক্তিদের দিকে ফিরে মাথা ঝুঁকিয়ে মৃদু কুর্ণিশ করলো শুধু।
লুকিয়ে অনুসরণ করা শিল্পীদের ভীড়টিতে বিব্রতকর অস্বস্তি নেমে এলো, কারো কিছু বলা উচিত এখন। ফরাসি চিত্রশিল্পী একজন মৃদু গলাখাকারি দিয়ে নিচু স্বরে বললো, অসাধারণ কাজ হচ্ছে, ইয়ন!
গ্রিগোরেস্কু এবার কাজ থামিয়ে, মই বেয়ে গর্ত থেকে উঠে এলেন। পরিষ্কারের জন্য রাখা কোদাল দিয়ে বেলচাতে লেগে থাকা মাটি পরিষ্কার করলেন, রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে নিয়ে ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে এলেন, তারপর হাতটা ধীর ভঙ্গিতে নেড়ে চারপাশের পুরো ল্যান্ডস্কেপের দিকে বড়ো করে ইঙ্গিত রেখে ঘোরগ্রস্ত কণ্ঠে বললেন—এখনো এমন অনেক সংবিগ্ন ঘোড়া মাটির নীচে চাপা পরে আছে।
তারপর বেলচা তুলে আবার মই বেয়ে গর্তে নেমে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করলেন। জড়ো হওয়া শিল্পীরা কিছুক্ষণ সেখানে বিমূঢ় দাঁড়িয়ে থেকে, অবশেষে মূল ভবনের দিকে ফিরে গেলো।
কর্মশালার বিদায়ি দিন চলে এলো। আয়োজকরা শেষ সন্ধ্যায় বড় খানার আয়োজন করেছিলো।
পরদিন সকালে পাততারি গুটিয়ে ক্যাম্পের গেটগুলো তালাবদ্ধ করা হলো; একটি চার্টার্ড বাস প্রস্তুত সবাইকে নিয়ে যাওয়ার জন্য, আর যারা বুখারেস্ট বা হাঙ্গেরি থেকে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে এসেছিল, তারা সেভাবেই ফেরার পথ ধরলো।
গ্রিগোরেস্কু বুটগুলো আয়োজকদের ফিরিয়ে দিয়ে নিজের পুরনো জীর্ণ জুতাজোড়া পরে নিলেন, কিছুক্ষণ তাদের সঙ্গে গল্পগুজব করে বাসে উঠলেন।
বাস ক্যাম্প থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে একটি গ্রাম্য রাস্তার বাঁকে পৌঁছলে, তিনি হঠাৎ বাসচালককে গাড়ি থামাতে নির্দেশ দিলেন, কিছু একটা বললেন যার অর্থ—এখান থেকে তার একা এগিয়ে যাওয়াটাই ভালো হবে, কেউ স্পষ্ট বুঝতে পারলো না তার কথাটা, কণ্ঠস্বর খুবই জড়ানো ছিল।
বাসটা মোড় পেরিয়ে চোখের আড়াল হলো। গ্রিগোরেস্কু রাস্তা পার হওয়ার জন্য ঘুরলেন, আর হঠাৎই সর্পিল আঁকাবাঁকা পথের নিচে মিলিয়ে গেলেন—যেন হাওয়া ।
পড়ে রইলো কেবল শূন্য দৃষ্টিভূমিটি, পর্বতমালার অটুট মৌনতা, ঝরাপাতা মরাপাতায় ঢাকা খাঁ খাঁ প্রান্তর, আর সীমাহীন নিস্তব্ধতাময় এক অপার ভূভাগ—যা ক্যামোফ্লাজ পরিয়ে রেখেছে, গোপন করে রেখেছে, লুকিয়ে রেখেছে, ঢেকে রেখেছে, মাটির গভীরে জ্বলন্ত পৃথিবীর অতলে যা কিছু বিহ্বল, সে-সবকিছুকে…
লেখক পরিচিতি: লাসলো ক্রাসনাহোরকাই (জ. ১৯৫৪) একজন হাঙ্গেরীয় ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার, যিনি তার দীর্ঘ, ঘূর্ণায়মান বাক্যগঠন ও দার্শনিক গভীরতার জন্য বিশ্বসাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান করে নিয়েছেন। তার লেখায় ধ্বংস, উৎকণ্ঠা, একাকিত্ব ও অস্তিত্বগত অনিশ্চয়তা এক ধরনের প্রায়-অ্যাপোক্যালিপ্টিক আবহ তৈরি করে। তার বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে আছে: Satantango (1985), The Melancholy of Resistance (1989), War & War (1999) ইত্যাদি। চলচ্চিত্রকার বেলা তার লাসলোর দুটি উপন্যাসকে উপজীব্য করে নির্মাণ করেন ‘Sátántangó’ (1994) ও ‘Werckmeister Harmonies’ (2000)-এর মতো আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবশালী দুটি চলচ্চিত্র, যা তার সাহিত্যের নান্দনিক বিস্তারকে আরও গভীর করেছে। ২০১৫ সালে তিনি ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ লাভ করেন। ২০২৫ সালে “প্রলয়সম আতঙ্কের মধ্যেও শিল্পের ক্ষমতাকে পুনর্ব্যক্তকারী প্রত্যয়ী ও দূরদর্শী সাহিত্যসম্ভারের জন্য” তিনি নোবেল পুরষ্কার পান।
অনূদিত গল্পটি তার উপন্যাস Seiobo There Below (2008)-এর একটি চ্যাপ্টার, যার নাম: ‘Something Is Burning Outside’। পুরো উপন্যাসটাই এরকম ছোট ছোট অনেকগুলো গল্প বা আখ্যানের সমষ্টি। ২০০৮ সালে ওটিলি মুলজেটের ইংরেজি অনুবাদে গল্পটি Hungarian Literature Online-এ প্রকাশিত হয়; পরে ২০১৩ সালে মুলজেট পুরো উপন্যাসটাই ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। বাংলা অনুবাদের ক্ষেত্রে মুলজেটের ইংরেজি টেক্সটই অনুসরণ করা হয়েছে।
তর্জমা: সালমান সাদ। তরুণ কথাসাহিত্যিক। পড়াশোনা করছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: খণ্ডিত কিছু অন্ধকার (২০২৫, ঐতিহ্য)। প্রকাশিতব্য বই: জীবনমহুয়া (২০২৬, বাংলা একাডেমি তরুণ লেখক প্রকল্প)। ই-মেইল: salmansaad802@gmail.com
বাইরে কিছু পুড়ছে