Spivak’s “Can the Subaltern Speak?”
[Note: Gayatri Chakravorty Spivak is a renowned literary critic and feminist theorist, and one of the most influential figures in postcolonial studies and poststructuralism. For various reasons, Spivak is a highly familiar name in Bangladesh. Her famous essay “Can the Subaltern Speak?” is equally well known. Although widely recognized, the essay has perhaps been relatively little “read” and even less “studied” in Bangladesh. Considering its relevance and timeliness, this discussion on the essay is being published for the readers of Akhra as part of the “Basic Concept” series. The article has been prepared based on Graham K. Riach’s booklet An Analysis of Gayatri Chakravorty Spivak’s Can the Subaltern Speak? The Akhra team translated important sections of the booklet with the assistance of AI and prepared the complete article through further editing. ]
Who Is Gayatri Chakravorty Spivak?
Gayatri Chakravorty Spivak, the author of the 1988 essay “Can the Subaltern Speak?”, was born on February 24, 1942, in Kolkata. Exactly five years later, India gained independence from British rule. Her early experience of life in India may have played a role in shaping her later interest in the “subaltern,” or marginalized and lower social classes.
Spivak is one of the best-known figures among the “Holy Trinity” of postcolonial studies, the other two being Edward Said and Homi Bhabha. She is also one of the foremost theorists of Subaltern Studies.
In 1959, before she had even turned 18, Spivak earned a first-class honors degree in English literature from the University of Calcutta. At the same time, she received gold medals in both English and Bengali literature. Later that same year, she left India for the United States and earned a master’s degree from Cornell University in New York State. She subsequently completed a one-year fellowship at Girton College, University of Cambridge, in Britain, and then returned to the United States to earn her PhD from Cornell University. Her doctoral supervisor was the renowned deconstructionist philosopher Paul de Man.
After completing her PhD, she taught at several universities in the United States. At the same time, she emerged as a translator and postcolonial theorist. She currently serves as a professor in the Department of English and Comparative Literature at Columbia University in New York City.
Alongside her academic career, Spivak is also a political activist and educator. In her work, theory and practical application go hand in hand. She has established several schools in the Indian state of West Bengal and has also taught in many other places, including Algeria and China. Academics generally spend much of their careers within the comfort and security of university campuses. However, through her practical decision to work directly with poor communities at the grassroots level, Spivak has set a distinctly different and exemplary model for pursuing an academic career.
Author’s Background
The most important historical factor that influenced Spivak’s career was perhaps India’s anti-colonial or independence movement, which gained momentum in the late nineteenth century and ultimately led to independence in 1947. According to one scholar, “This political context of pre-independence Kolkata shaped Spivak’s earliest childhood experiences.” Spivak was born in 1942 in a hostile environment marked by intense public discontent over the Bengal famine, which claimed the lives of millions, while anti-colonial nationalist movements were simultaneously gaining momentum.
In the decades following independence, the long-term effects of colonial rule on India became increasingly evident. These included persistent ethnic and religious conflicts, a legacy of institutional violence within the legal and governance systems, the continued use of English in university curricula, and the ongoing oppression of minority groups. Spivak was deeply aware of the extent of the wounds that colonialism had inflicted on Indian society and of the fact that these wounds had not been healed even after the apparent liberation brought by independence.
তদুপরি, একজন তুলনামূলক সুবিধাপ্রাপ্ত মধ্যবিত্ত হিন্দু নারী হিসেবে এই পরিবেশের অভিজ্ঞতা অর্জন করার ফলে, সাবেক উপনিবেশভুক্ত ব্যক্তিবর্গের মধ্যকার সূক্ষ্ম ও অভ্যন্তরীণ পার্থক্যগুলোর প্রতি তিনি সংবেদনশীল হয়ে ওঠেন। স্পিভাক তাঁর জীবনের মূল ব্রত হিসেবে বেছে নেন এই নিপীড়নমূলক ব্যবস্থাগুলোর বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলাকে। আর এই লক্ষ্য হাসিল করতে গিয়ে তিনি নিজের দার্শনিক ও সমালোচনামূলক হাতিয়ারগুলোকে এমনভাবে প্রয়োগ করেন, যেন তা পশ্চিমের ‘সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ’কে গোড়া থেকে দুর্বল করে ফেলতে পারে।
‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ কী বলেছিল?
স্পিভাকের ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ প্রবন্ধের শিরোনামটি কিছুটা বিভ্রান্তিকর। এটি নিম্নবর্গ কথা বলতে পারে কি না তা নিশ্চিতভাবেই খতিয়ে দেখে, তবে এর মূল আগ্রহের জায়গাটি হলো, তাদের কথা আদৌ (কারো কান পর্যন্ত) পৌঁছায় কি না। স্পিভাক যুক্তি দেখিয়েছেন যে, বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা তাদের কথা শোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণটি হলো, সমাজের অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী মানুষেরা (যেমন: শিক্ষাবিদ, ধর্মীয় নেতা বা অন্য যেকোনোভাবে সমাজে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণী) সবসময় তাদের হয়ে কথা বলে।
এর মাধ্যমে এই অভিজাত শ্রেণী মূলত নিম্নবর্গীয়দের নিজস্ব কণ্ঠস্বর কেড়ে নেয়। যদি নিম্নবর্গ নিজেরা কথা বলতে পারত এবং এমন একটি মঞ্চ বা মাধ্যম পেত যেখানে তাদের কথা শোনা হবে (প্রবন্ধের শিরোনামে ‘স্পিক’ বলতে এটিই বোঝানো হয়েছে), তাহলে, স্পিভাকের মতে, এই মানুষগুলো একটি কার্যকর রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর অর্জন করতে পারত।
স্পিভাক তাঁর এই প্রবন্ধে মার্ক্সবাদ, নারীবাদ ও ডিকনস্ট্রাকশন ধারণাগুলোকে একত্র করেছেন। এই বিশেষ ক্ষেত্রগুলো তাঁকে ক্ষমতা, লিঙ্গ ও জ্ঞান অর্জনের সুযোগের পার্থক্যের কারণে তৈরি হওয়া নিপীড়ন নিয়ে যুক্তি তুলে ধরতে সাহায্য করেছে।
তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা, বিশেষত পশ্চিমা গবেষণা, সবসময় তথাকথিত ‘তৃতীয় বিশ্ব’ বা উন্নয়নশীল দেশের মানুষকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে। একই সাথে তিনি দেখিয়েছেন কেন নিম্নবর্গের নারীরা দ্বিগুণ প্রান্তিক বা কোণঠাসা (প্রথমত ঔপনিবেশিক শাসনের শিকার হিসেবে, এবং দ্বিতীয়ত নারী হিসেবে)। স্পিভাক এখানে তাঁর ভাষায় ‘এপিস্টেমিক ভায়োলেন্স’ বা ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতা’-র ওপর আলোকপাত করেছেন। এটা এমন এক ধরনের সহিংসতা যা কোনো শারীরিক আঘাতের মাধ্যমে নয়, বরং চিন্তা, বক্তব্য ও লেখার মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া হয়।
স্পিভাকের মতে, জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতার একটি চমৎকার উদাহরণ হলো ইতিহাসের বিবরণ থেকে নিম্নবর্গীয়দের বাদ দেওয়া। যখন শোষিত মানুষকে নিজেদের কথা নিজেদের মতো করে বলতে দেওয়া হয় না, কিংবা ইতিহাসে তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না, তখন কার্যত পৃথিবীর বুক থেকে তাদের অস্তিত্বকেই মুছে ফেলা হয়। নিম্নবর্গীয় নারীদের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি ঘটে। স্পিভাকের ভাষায়: ‘ঔপনিবেশিক উৎপাদনের প্রেক্ষাপটে যদি নিম্নবর্গের কোনো ইতিহাস না থাকে এবং তারা কথা বলতে না পারে, তবে নারী হিসেবে একজন নিম্নবর্গীয় মানুষ আরও অনেক গাঢ় অন্ধকারের গভীরে হারিয়ে যায়।’ স্পিভাকের মতে, নারীরা একই সাথে উপনিবেশবাদ ও পুরুষতন্ত্র উভয়ের চাপেই নীরব বা কণ্ঠহীন হয়ে পড়ে।
স্পিভাক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ‘নিম্নবর্গ কথা বলতে পারে না।’ কারণ, ক্ষমতার আসনে থাকা ব্যক্তিরা সবসময় তাদের হয়ে কথা বলে এবং তারা কখনোই নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিজেরা করতে পারে না। তদুপরি, তারা কথা বললেও তা শোনা হয় না। স্পিভাক ‘কথা বলা’-কে শ্রোতা ও বক্তার মধ্যকার একটি দ্বিমুখী আদান-প্রদান হিসেবে দেখেন। তিনি লিখেছেন: ‘যখন আপনি বলেন (তারা) কথা বলতে পারে না, তার মানে হলো—কথা বলার প্রক্রিয়ায় যদি বলা এবং শোনা উভয়ই জড়িত থাকে, তবে এই প্রত্যুত্তর বা জবাবদিহিতার সম্ভাবনাটি নিম্নবর্গের পরিমণ্ডলে একেবারেই অনুপস্থিত।’ যেমন, একজন দরিদ্র কৃষক বলতেই পারেন: ‘আমি যত কঠোর পরিশ্রমই করি না কেন, আমার পরিবার পেট পুরে খেতে পায় না।’ কিন্তু এই কথাটি কি এমনভাবে কারো কানে পৌঁছাবে যা সমাজে কোনো পরিবর্তন আনতে শুরু করবে? কোনো বক্তব্য সফল হতে হলে তার বার্তাটি যথাযথভাবে পৌঁছানো জরুরি। স্পিভাকের মতে, নিম্নবর্গের বক্তব্য এই উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়।
স্পিভাকের এই প্রবন্ধটি উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের অন্যতম একটি মৌলিক ও প্রামাণ্য পাঠ্য। তাঁর বিভিন্ন লেখালেখির সংকলনে এটি বারবার পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে। এটি স্প্যানিশ, জার্মান, চীনা ও হিব্রুসহ বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক অধ্যয়নের যেকোনো সংকলনে এটি প্রায় অবধারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকে। ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ প্রবন্ধটি অনন্য, কারণ এটি উপনিবেশবাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের তীব্র সমালোচনায় ডিকনস্ট্রানশনিস্ট ও নারীবাদী চিন্তাধারার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছে।
প্রবন্ধের প্রেক্ষাপট
গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের এই প্রবন্ধটি একটি আন্তঃশাস্ত্রীয় কাজ, যেখানে মার্ক্সবাদী ও নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে দর্শন ও ইতিহাসের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। ফলে, এই লেখাটি যে পোস্ট-কলোনিয়াল স্টাডিজের মতো বিস্তীর্ণ অ্যাকাডেমিক পরিসরে একটি প্রামাণ্য ও মৌলিক পাঠ্য হিসেবে গণ্য হবে, সেটাই স্বাভাবিক। যারাই উপনিবেশবাদ ও উপনিবেশোত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব নিয়ে কাজ করেছেন, তাদেরকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসে এই পোস্ট কলোনিয়াল স্টাডিজ। উদাহরণস্বরূপ, তাঁরা যা করার চেষ্টা করেন তা হলো:
- পশ্চিমা ইতিহাসের একটি রিভিশনিস্ট পাঠ বা সামগ্রিক পুনর্মূল্যায়ন করা
- বর্তমানের ওপর ঔপনিবেশিক অতীতের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তুলে ধরা
- পাঠকদেরকে তাঁদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির অন্ধত্ব বা সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন করা
- বর্তমানেও চলমান সাম্রাজ্যবাদকে প্রত্যাখ্যান ও নিন্দা করা
সাহিত্যিক পাঠ বা টেক্সট বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে উত্তর-ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহারের অন্যতম অগ্রদূত ছিলেন স্পিভাক। তাঁর এই কাজের আগে, ঔপনিবেশিক ‘প্রভুদের’ কাছ থেকে সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশগুলোর সাহিত্যকে ব্যাপকভাবে সাবেক শাসক দেশ ও তার প্রাক্তন উপনিবেশগুলোর সাহিত্য হিসেবেই বিবেচনা করা হতো; যেমন—ব্রিটেনের অসংখ্য প্রাক্তন উপনিবেশের সাহিত্যকে ‘কমনওয়েলথ সাহিত্য’ বলা হতো। এই শ্রেণীবিভাগটি ছিল বেশ সমস্যাযুক্ত, কারণ এটি ইংরেজি সাহিত্যতত্ত্বকে একটি ইউরোপকেন্দ্রীক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে হাজির করত: এটি সংস্কৃতির একটি ‘কেন্দ্র-প্রান্ত মডেল’-কে টিকিয়ে রাখত, যেখানে উপনিবেশ স্থাপনকারী দেশের সংস্কৃতিকে প্রধান ও শ্রেষ্ঠ বলে ধরে নেওয়া হতো। ‘কমনওয়েলথ সাহিত্য’ ধারণাটি এই সত্যকেও এড়িয়ে যেত যে, ব্রিটিশ সাহিত্য নিজেও কমনওয়েলথের অংশ ছিল, এবং এর মধ্যে কোনো জোরালো সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির হাজিরা ছিল না। উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যকে—যার সূচনা আংশিকভাবে এই ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ প্রবন্ধের হাত ধরেই হয়েছিল—হয়তো কমনওয়েলথ সাহিত্য ও ‘ক্রিটিক্যাল থিওরি’র একটি নিখুঁত সমন্বয় হিসেবে ভাবা যেতে পারে, যা একে একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক কাঠামো প্রদান করে।
আলাপের সাধারণ পরিসর
উত্তর-ঔপনিবেশিক অধ্যয়নে স্পিভাকের কাজ বেশ কয়েকজন চিন্তাবিদের কাছে ঋণী। উপনিবেশ-বিরোধী ভাবনার মূল জোয়ারটি এসেছিল ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এমে সেজেয়ারের মতো তাত্ত্বিকরা। তাঁর ‘ডিসকোর্স অন কলোনিয়ালিজম’ (১৯৫৫) প্রবন্ধটি সভ্যতা ও প্রগতির নামে চালানো বর্ণবাদী ঔপনিবেশিক বয়ানগুলোর তীব্র সমালোচনা করেছিল। একই সাথে ছিলেন মার্তিনিকের বাসিন্দা, তাঁর সহযোদ্ধা, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও তাত্ত্বিক ফ্রাঞ্জ ফানোঁ। ‘ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্কস’ (১৯৫২) এবং ‘দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ’ (১৯৬১) বই দুটিতে ফানোঁ স্থানীয় বা আদিবাসী মানুষের ওপর জোরপূর্বক পশ্চিমা মূল্যবোধ চাপিয়ে দেওয়ার ফলে সৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে স্পিভাকের আরও কাছাকাছি ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। তাঁর ১৯০৯ সালের উপনিবেশ-বিরোধী পুস্তিকা ‘হিন্দ স্বরাজ’ ইউরোপীয় অহংকারকে কঠোরভাবে আক্রমণ করেছিল, পশ্চিমা আধুনিকতার তীব্র নিন্দা করেছিল এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলনের একটি রূপরেখা তৈরি করেছিল। গান্ধী সুনির্দিষ্টভাবেই কেবল ‘ইংরেজহীন ইংরেজ শাসন’—অর্থাৎ, ভারতীয়দের দ্বারা ব্রিটিশ সমাজকাঠামো বজায় রাখা—চাননি; বরং তিনি সমাজের এমন একটি সম্পূর্ণ নতুন মডেল চেয়েছিলেন যা ইউরোপীয় আধুনিকতাকে পুরোপুরি বর্জন করবে।
স্পিভাক সেজেয়ারের লেখা অনুবাদ করেছেন, ফানোঁকে নিয়ে তৈরি একটি চলচ্চিত্রের ভূমিকা বা পরিচিতি লিখেছেন ও তাঁর কাজ নিয়ে কথা বলেছেন এবং বৈপ্লবিক আন্দোলনগুলোতে সহিংসতার বিষয়ে আলোচনার সময় গান্ধীর ‘হিন্দ স্বরাজ’-এর ইতিবাচক উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এই তিন চিন্তাবিদ ১৯৮০-এর দশকে আত্মপ্রকাশ করা পোস্ট কলোনিয়াল স্টাডিজের তাত্ত্বিক কাঠামোর বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত নির্মাণে অনেকাংশে অবদান রেখেছেন তো বটেই; পাশাপাশি স্পিভাক নিজের প্রাতিষ্ঠানিক লেখালেখিতে সরাসরি তাঁদের কাজ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনাও করেছেন।
একাডেমিক প্রভাবসমূহ
স্পিভাক নিজেকে সুনির্দিষ্ট কোনো একক বুদ্ধিবৃত্তিক ঘরানার সাথে পুরোপুরি যুক্ত না করলেও, তাঁর উপর সরাসরি প্রভাব বিস্তারকারী একাডেমিক উৎসগুলোকে প্রধানত তিনটি গ্রুপে ভাগ করা যায়:
- সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ গ্রুপ।
- পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট দর্শন, যার মধ্যে ফরাসি তাত্ত্বিক জাক দেরিদা এবং বেলজিয়ান চিন্তাবিদ পল ডি ম্যান-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
- এডওয়ার্ড সাইদ।
ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ গ্রুপ’। এর শুরুর দিকের সদস্যদের মধ্যে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায়সহ আরও অনেকে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এই দলটির লক্ষ্য ছিল ভারতে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশের একটি ‘হিস্ট্রি ফ্রম বিলো’ রচনা করা। অর্থাৎ, ঐতিহাসিক গবেষণার মূল মনোযোগটি অভিজাত শ্রেণী থেকে সরিয়ে সাধারণ মানুষের রাজনীতির দিকে নিয়ে যাওয়া। এভাবে কাজ করার মাধ্যমে তাঁদের গবেষণা ভারতের অধিকারবঞ্চিত মানুষদের একটি কণ্ঠস্বর দেওয়ার চেষ্টা করে। এই গোষ্ঠীর সাথে স্পিভাকের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ছিল। তাঁদের কাজের প্রতি ব্যাপকভাবে সমর্থন জানালেও, স্পিভাক ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ প্রবন্ধে তাঁদের কাজের মেথডলজির ব্যাপারে কিছু ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
স্পিভাকের কাজের উপর দ্বিতীয় বড় প্রভাবটি হলো পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট দর্শনের। ১৯৬০-এর দশক থেকে ইংরেজিভাষী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন জাক দেরিদা, ফরাসি সামাজিক ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক মিশেল ফুকো, জেন্ডার তাত্ত্বিক জুডিথ বাটলার এবং অন্য আরও কয়েকজন চিন্তাবিদের কাজ পরিচিতি পেতে শুরু করে, তখন তাঁদের সবাইকে একসাথে এই ধারার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের অধিকাংশেরই একটি সাধারণ আগ্রহের বিষয় ছিল—আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে প্রভাবিত করা মেটাফিজিক্যাল পূর্বানুমানগুলোর এবং ভাষার ইন্টারপ্রিটেশনের স্বরূপ উন্মোচন করা। ১৯৬০ থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল ‘ইয়েল স্কুল অব ডিকনস্ট্রাকশন’, যার নেতৃত্বে ছিলেন স্পিভাকের পিএইচডি তত্ত্বাবধায়ক পল ডি ম্যান। পোস্ট-স্টাকচারালিস্ট প্রভাব স্পিভাকের তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি (যা সুপ্রতিষ্ঠিত ও নিশ্চিত ধারণাগুলোকে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে) এবং লেখার শৈলী (যা প্রায়শই বেশ জটিল ও দুর্বোধ্য)—উভয় ক্ষেত্রেই স্পষ্ট দেখা যায়।
স্পিভাকের কাজের ওপর তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবটি আসে ফিলিস্তিনি-আমেরিকান চিন্তাবিদ এডওয়ার্ড সাইদের কাছ থেকে। তাঁর ‘ওরিয়েন্টালিজম’ (১৯৭৮) বইটি উত্তর-ঔপনিবেশিক অধ্যয়ন ক্ষেত্রটি প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সাইদ এটি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, প্রাচ্য সম্পর্কে পশ্চিমাদের যে উপস্থাপনা, তা সবসময় প্রাচ্যের সমাজগুলোকে ভুলভাবে চিত্রায়িত করে; কারণ ইউরোপীয়রা গবেষণার ক্ষেত্রে যে পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করে, তার সাথে জড়িয়ে থাকে বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার। প্রাচ্যের দিকে তাকানোর এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো মোটেও নিরপেক্ষ নয়; বরং এগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনকে জোরদার করতে; এবং একটি আদিম, নোংরা ও নিষ্ক্রিয় প্রাচ্যের বিপরীতে এক আলোকিত, পরিচ্ছন্ন ও উৎপাদনশীল পশ্চিমের আত্ম-অহংকারী রূপ ফুটিয়ে তুলতে। স্পিভাকের প্রবন্ধের জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে, কীভাবে পাশবিক শক্তির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বা সাংস্কৃতিক উপায়েও নিপীড়ন চালানো যেতে পারে; এবং এই যুক্তিটিকেই তিনি আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।
তাছাড়া, ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ প্রবন্ধটি বোঝার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাইদ যুক্তি দেখিয়েছেন যে, প্রাচ্যকে নিয়ে পশ্চিমাদের এই কাটাছেঁড়ার ধরণ বা আলোচনার ভাষা সেখানকার স্থানীয় মানুষদের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল এবং নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিজেরা করার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। স্পিভাকের দৃষ্টিভঙ্গিও প্রায় একই রকম। তবে সাইদ যেখানে উপনিবেশ স্থাপনকারী ও উপনিবেশের শিকার—এই দুই পক্ষের ভূমিকা বা পরিচয়কে তুলনামূলকভাবে অপরিবর্তনীয় হিসেবে দেখিয়েছেন, স্পিভাক সেখানে ঔপনিবেশিক পরিচয়গুলোকে অনেক বেশি পরিবর্তনশীল ও সচল হিসেবে তুলে ধরেছেন।
সমসাময়িক বিতর্ক
স্পিভাকের প্রবন্ধটি পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট দার্শনিকদের চিন্তাভাবনা এবং ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’ গ্রুপের গবেষণার সাথে সরাসরি যুক্ত। তাঁর পদ্ধতিগুলো সাংস্কৃতিক ইতিহাসবিদদের মতোই, কারণ তিনি সাংস্কৃতিক পাঠ বা টেক্সটগুলো বিশ্লেষণ করে দেখান যে কীভাবে সেগুলো ঔপনিবেশিক আদর্শকে সমর্থন জোগায়—তবে তিনি এই চিন্তাধারার নানা দিক নিয়ে তীব্র আপত্তিও তুলেছেন।
তিনি ফরাসি পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট দার্শনিক জিল দেল্যুজ ও মিশেল ফুকোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, তাঁরা নিপীড়নমূলক ক্ষমতাকাঠামো টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষাবিদ বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তি হিসেবে তাদের নিজেদের ভূমিকা কতটা, তা বেশ খাটো করে দেখেছেন। বিষয়টি হয়তো কিছুটা আশ্চর্যজনক, কারণ তাঁদের নিজেদের খ্যাতিই ছিল উগ্র বামপন্থী বুদ্ধিজীবী হিসেবে এবং তাঁরা নিজেরাও অন্যদের নিয়ে একই রকম সমালোচনা করেছেন। স্পিভাক প্রশ্ন তোলেন যে, পশ্চিমের শোষিত গোষ্ঠীগুলোকে (যেমন—শ্রমিক শ্রেণী) সাহায্য করার জন্য নির্মিত রাজনীতি সাবেক উপনিবেশগুলোর নিম্নবর্গীয়দের জন্য আদৌ উপযুক্ত কি না। একই সাথে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, বুদ্ধিজীবীরা কি কখনো সত্যিকার অর্থে এই কণ্ঠহীন জনগোষ্ঠীর সঠিক ও ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন?
‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ গ্রুপ’-ও তাঁর এই সমালোচনা থেকে রেহাই পায়নি। স্পিভাকের মতে, এই দলটির গবেষণার পদ্ধতি প্রধানত দুটি কারণে ত্রুটিপূর্ণ ছিল। প্রথমত, তাঁরা ভুলভাবে এটা ফুটিয়ে তোলেন যে সব নিম্নবর্গীয় মানুষ বুঝি একই রকম। নিম্নবর্গীয়দের অবস্থা এবং তাঁদের চেতনা সম্পর্কে জ্ঞান তৈরি করার চেষ্টায়, এই দলটি নিম্নবর্গের অভ্যন্তরীণ বিশাল বৈচিত্র্য ও পার্থক্যগুলোকে ধামাচাপা দিয়ে দেয়। স্পিভাকের ভাষায়, ‘the colonized subaltern subject is irretrievably heterogeneous’ (অর্থাৎ, সাবঅল্টার্ন সত্তা সমজাতীয় নয়)। আসলে যা একটি বহুত্ববাহী ও বৈচিত্র্যময় গোষ্ঠী, তার ওপর জোর করে একটি একমুখী বা সমরূপ দৃষ্টিভঙ্গি—তথাকথিত ‘নিম্নবর্গীয় দৃষ্টিভঙ্গি’—চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়ে স্পিভাক বেশ সতর্ক। তিনি মনে করেন, একটিমাত্র একক কণ্ঠস্বরের বদলে নিম্নবর্গের বহুবিধ কণ্ঠস্বর এবং ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ‘সাবঅল্টার্ন’ (নিম্নবর্গ) এবং ‘এলিট’ (অভিজাত)—এই শব্দগুলোকে এক একটি অপরিবর্তনশীল বা স্থায়ী শ্রেণী হিসেবে প্রতিনিয়ত ব্যবহার করার মাধ্যমে সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ গ্রুপ নিজেদের অজান্তেই সমাজের সেই বৈষম্যগুলোকেই আবার পুনঃনির্মাণ করে, যা তারা আসলে মুছে ফেলতে চেয়েছিল। তাদের চিন্তাপদ্ধতিতে ‘নিম্নবর্গ’ ধারণাটি কেবল ‘অভিজাত’ ধারণার বিপরীতেই অস্তিত্বশীল থাকতে পারে, এবং সে কারণে এটি অভিজাতদের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে নিজের কোনো স্বাধীন সত্ত্বা বা স্বকীয়তা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, স্পিভাকের ওপর যাঁদের প্রভাব রয়েছে, তাঁরা তাঁর মিত্র বা সহযোগী যতটা, ঠিক ততটাই তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিপক্ষ। তিনি যদিও বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও গবেষণার ক্ষেত্র থেকে ধারণা ধার করেছেন, তবুও নিজের চিন্তার সাথে যুক্ত করার আগে তিনি প্রতিটি ধারণাকে অত্যন্ত নিবিড় ও কঠোর প্রশ্নবিদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে গেছেন।
মূখ্য বিষয়বস্তু
স্পিভাক সাবঅল্টার্ন বা নিম্নবর্গের সংজ্ঞায় বলেছেন, এরা হলো এমন মানুষ যারা ‘removed from all lines of social mobility’—যেমন ‘নিরক্ষর কৃষক সমাজ’, যাদের শিক্ষা বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার উপর কোনো দখল নেই, যা দিয়ে তারা সমাজে নিজেদের অবস্থার উন্নতি করতে পারে। ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ প্রবন্ধে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, নিম্নবর্গীয়দের পক্ষে কি তাঁদের কণ্ঠস্বর অন্যের কান পর্যন্ত পৌঁছানো এবং এর মাধ্যমে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিজেরা করা সম্ভব? তাঁর উপসংহার হলো—বৈশ্বিক ক্ষমতার যে কাঠামো, তা প্রাতিষ্ঠানিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক যা-ই হোক না কেন, তা বর্তমানে নিম্নবর্গকে কথা বলতে দেয় না। এখানে স্পিক বা ‘কথা বলা’ বলতে কেবল কিছু উচ্চারণ করাকে বোঝানো হয়নি, বরং নিজের বার্তাটির স্বীকৃতি পাওয়াকেও বোঝানো হয়েছে। তদুপরি, সমাজের ক্ষমতাবানদের পক্ষ থেকে নিম্নবর্গকে একটি যৌথ কণ্ঠস্বর দেওয়ার যেকোনো চেষ্টা তাঁদের প্রকৃত অবস্থানকে বিকৃত করবে এবং আবারও নিম্নবর্গীয়দের নিজেদের হয়ে কথা বলার সুযোগ কেড়ে নেবে।
স্পিভাকের মূল যুক্তিটি অন্যের প্রতিনিধিত্ব করার বা তাদের হয়ে নিজে কথা বলার ফলে তৈরি হওয়া নৈতিক সংকটগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। এটি আপাতদৃষ্টিতে অদ্ভুত মনে হতে পারে, কারণ সমাজে নিজের অবস্থান উন্নত করতে চাওয়া যেকোনো গোষ্ঠীর মতোই নিম্নবর্গের জন্যও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব একটি কাঙ্ক্ষিত বিষয় হওয়ার কথা। কিন্তু স্পিভাকের বক্তব্য আরও অনেক গভীর; তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, প্রতিনিধিত্বের সমস্ত রূপই আসলে নিম্নবর্গকে একটি ন্যায্য শুনানি থেকে বঞ্চিত করে এবং ফলস্বরূপ তাঁদের কথা বলার সমস্ত চেষ্টাই অর্থহীন হয়ে পড়ে। এমন নয় যে কোনো একজন নিম্নবর্গীয় মানুষ ব্যক্তিগতভাবে কিছুই বলতে পারেন না, বরং সমাজে একজন নিম্নবর্গীয় অবস্থানে থেকে কথা বলার অর্থ হলো—আপনার কথা কখনো (ক্ষমতার কেন্দ্রে) শোনা হবে না।
ধারণাগুলোর বিস্তার
এই প্রবন্ধে স্পিভাক যুক্তি দেখিয়েছেন যে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা, উপনিবেশবাদ ও পুরুষতন্ত্রের মধ্যে দুটি সাধারণ মিল রয়েছে: এদের নিজস্ব মূল্যবোধই যে সার্বজনীন—এমন একটি ভুল বিশ্বাস, এবং প্রতিনিয়ত নিম্নবর্গের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়া।
স্পিভাক শুরুতেই দেখিয়েছেন কীভাবে দুজন শীর্ষস্থানীয় র্যাডিক্যাল বুদ্ধিজীবী—ফরাসি দার্শনিক জিল দেল্যুজ এবং তাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ মিশেল ফুকো—বিশ্বের বাকি অংশের ওপর পশ্চিমের সাংস্কৃতিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তাঁদের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকাকে খাটো করে দেখেছেন। স্পিভাক যুক্তি দেন, এই দুই চিন্তাবিদ ‘পদ্ধতিগতভাবে ইডিওলজির প্রশ্নটিকে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে তাঁদের নিজেদের জড়িয়ে থাকার বিষয়টিকে উপেক্ষা করেন।’ অর্থাৎ, তাঁরা নিজেদের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক মনে করেন, অথচ বাস্তবে তাঁরা পশ্চিমা মূল্যবোধের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, তাঁদের অনুমান হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিম্নবর্গীয়রা—যারা সাধারণত দরিদ্র কৃষক এবং শহরের বস্তিবাসী—পশ্চিমা ‘প্রোলেতারিয়েত’-এর মতো একই রকম রাজনৈতিক আত্মসচেতনতা ধারণ করবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করলে এটি ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম, কারণ উন্নয়নশীল দেশের দরিদ্র কৃষক, শহরের দরিদ্র মানুষ ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ পাওয়ার হার অনেক কম থাকে। আবার যখন এই তাত্ত্বিকরা পশ্চিমা সর্বহারাদের নিয়ে লেখার সময় ‘শ্রমিকেরা’র মতো শব্দ ব্যবহার করেন, স্পিভাব সেটারও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এটি আসলে এমন এক বিশ্বাস যা মনে করে যে সব শ্রমিকেরই কিছু সাধারণ ও অপরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্য থাকে।
এরপর তিনি প্রতিনিধিত্বের বিভিন্ন রূপের দিকে মনোযোগ দেন। তিনি জার্মান রাজনৈতিক দার্শনিক কার্ল মার্ক্সের ‘এইটিন্থ ব্রুমায়ার অব লুই বোনাপার্ট’ (১৮৫২) প্রবন্ধটির উদ্ধৃতি দেন, যেখানে মার্ক্স লিখেছেন কীভাবে নেপোলিয়নের ভাগ্নে ফরাসি সংসদ ভেঙে দিয়ে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করেছিলেন। স্পিভাক উল্লেখ করেন যে, মার্ক্স যেখানে দুই ধরণের প্রতিনিধিত্বের মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন—‘ডারস্টেলেন’ (দার্শনিক বা নান্দনিক প্রতিনিধিত্ব, যেমন কোনো ছবি আঁকা) এবং ‘ভারট্রেটেন’ (রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব)—দেল্যুজ ও ফুকো সেখানে এই পার্থক্যটিকে গুলিয়ে ফেলেছেন। এর ফলে তারা এমন একটি ধারণা তৈরি করেন, যেন ‘ভারট্রেটেন’ বা কারো পক্ষে ‘প্রতিনিধি’ হিসেবে কথা বলা এবং ‘ডারস্টেলেন’ বা সেই ব্যক্তি ও তাঁর ইচ্ছার একটি ‘প্রতিকৃতি’ বা হুবহু চিত্র তুলে ধরা—দুটি একই কথা। দ্বিতীয়টি কোনো ব্যক্তিকে একটি গোষ্ঠীর প্রতীকে রূপান্তরিত করে, আর প্রথমটি সেই প্রতীককে ব্যবহার করে ঐ গোষ্ঠীর পক্ষে কাজ করে।
স্পিভাকের মতে, এই দুই ধরণের প্রতিনিধিত্বকে গুলিয়ে ফেলার কারণে একজন সমালোচকের পক্ষে সেই বাস্তব সত্যকে—অর্থাৎ, নিম্নবর্গীয়রা আসলে কী চায়—উন্মোচন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা মূলত এই সমস্ত প্রতিনিধিত্বের আড়ালে ঢাকা থাকে। স্পিভাক এই ধারণাটি খারিজ করে দেন যে, নিম্নবর্গীয়রা নিজেদের স্বার্থ নিজেরা প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু একই সাথে তিনি এটাও মানতে অস্বীকৃতি জানান যে (ভারট্রেটেন বা অন্যের হয়ে) প্রতিনিধিত্ব কখনো নৈতিকভাবে করা সম্ভব। কার্যত, তাঁর যুক্তির এই অংশটি তাঁর এই দাবিকেই জোরালো করে যে—অন্যের প্রতিনিধিত্ব করা তাদের প্রকৃত অবস্থানকে বিকৃত করার দিকেই নিয়ে যায়।
পরের অংশে, তিনি প্রধানত দক্ষিণ এশীয় পণ্ডিতদের নিয়ে গঠিত ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ গ্রুপ’-এর একটি বিশদ সমালোচনা করেছেন। তিনি যুক্তি দেন যে, নিম্নবর্গীয়দের নিয়ে তাঁদের আপাতদৃষ্টিতে সহযোগিতাপূর্ণ কাজগুলোও নিম্নবর্গকে একটি অভিন্ন বা বৈচিত্র্যহীন জনসমষ্টি হিসেবে অতিরিক্ত মাত্রায় কল্পনা করে—অর্থাৎ, এটি সব নিম্নবর্গকে একই ছাঁচে দেখে। এর বিপরীতে, স্পিভাক বলেন যে তিনি ‘সাবঅল্টার্ন’ শব্দটি ব্যবহার করেন এমন একটি পরিবর্তনশীল পরিচয়কে বোঝাতে, যার একাধিক বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে, প্রেক্ষাপট অনুযায়ী ‘সাবঅল্টার্ন’ শব্দটির অর্থ নিয়ে তাঁর বোঝাপড়া পরিবর্তিত হয়। “‘সাবঅল্টার্ন’ শব্দের কোনো স্থায়ী বা অপরিবর্তনশীল অর্থ নেই”—এই ঘোষণার মাধ্যমে স্পিভাক নিম্নবর্গীয় অধ্যয়নে সম্ভাবনার এক বিশাল সমৃদ্ধি যোগ করেছেন বটে, তবে একই সাথে তাঁদের পক্ষে একটি সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত প্রতিরোধ আন্দোলনের সুবিধাগুলোকে হয়তো হাতছাড়াও করেছেন।
চূড়ান্ত অংশটি নিম্নবর্গীয় নারীদের ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিজেরা করার দ্বিগুণ জটিলতা হাজির করে। স্পিভাক ১৮২৯ সালে ভারতের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার কর্তৃক ‘সতীদাহ প্রথা’ নিষিদ্ধ করার বিষয়টি বিশ্লেষণ করেন। স্পিভাক নিজে সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার পক্ষে থাকা সত্ত্বেও তিনি দেখিয়েছেন যে, এই প্রথা বিলুপ্তির প্রক্রিয়াটিকে ব্যবহার করা হয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসনকে পাকাপোক্ত করতে, নারীদের জীবনের ওপর পুরুষদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এবং ‘বর্বর’ ভারতীয়দের তুলনায় ব্রিটিশ সভ্যতাকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করতে। স্পিভাক এখানে ‘বর্বর’ শব্দটি ইনভার্টেড কমার মধ্যে রেখেছেন যাতে এর থেকে একটি ব্যঙ্গাত্মক দূরত্ব বজায় রাখা যায়। তিনি উপনিবেশবাদীদের ভাষাই ব্যবহার করছেন, কিন্তু তা করছেন তাঁদেরই সমালোচনা করার জন্য—ঠিক যেভাবে তিনি পশ্চিমের সমালোচনা করতে পশ্চিমা দর্শনের হাতিয়ারগুলোকে ব্যবহার করেন।
স্পিভাক ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন নিম্নবর্গীয় সদস্য ভুবনেশ্বরী ভাদুরীর অভিজ্ঞতাও বিবেচনা করেছেন, যিনি ভারতের স্বাধীনতার আগের দশকগুলোতে একটি রাজনৈতিক গুপ্তহত্যার বদলে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। যেহেতু ভুবনেশ্বরী কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা অফিসিয়াল মাধ্যমে ‘কথা বলতে’ পারেননি, তাই তিনি তাঁর একমাত্র সম্বল—নিজের শরীর—ব্যবহার করে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন, নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়ার মাধ্যমে। স্পিভাকের মতে এটি এমন এক পরিস্থিতির জন্ম দেয় যেখানে ‘একজন নিম্নবর্গীয় মানুষ কথা বলার জন্য তীব্র চেষ্টা করেছিলেন, এমনকি নিজের অভিশপ্ত আত্মহত্যাকেও একটি বার্তায় রূপান্তরিত করেছিলেন।’ আত্মহত্যার ওপর তাঁর এই নির্ভরতাকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেই স্পিভাক বলেন যে, ‘নিম্নবর্গ কথা বলতে পারে না’, এবং বিশেষত ‘নারী হিসেবে নিম্নবর্গের কথা কেউ শুনতে বা পড়তে পারে না।’ স্পিভাকের মতে, যে নিম্নবর্গীয় মানুষটি একই সাথে একজন নারী, তাঁর কণ্ঠস্বরটি এভাবে দ্বিগুণ নীরব বা স্তব্ধ হয়ে যায়।
অন্যান্য বিষয়বস্তু
স্পিভাকের এই প্রবন্ধের মূল চিন্তাগত বিষয় হলো, সামগ্রিকভাবে নিম্নবর্গের কথা বলার বা কণ্ঠস্বর তুলে ধরার সম্ভাবনা। তবে প্রবন্ধটি একই সাথে নিম্নবর্গীয় নারীদের দ্বিগুণ স্তব্ধ বা নীরব হয়ে থাকার অবস্থানের প্রতিও বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, স্পিভাকের মতে ঔপনিবেশিক ও পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়নের রূপগুলোকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা উচিত নয়। এগুলো একে অপরের সাথে যুক্ত; এবং এর সাথে আইনি, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও ক্ষমতার অন্যান্য ব্যবস্থাগুলো মিলে এমন এক বৈশ্বিক সমাজ তৈরি করে, যা স্পিভাকের মতে, একেবারে মজ্জা বা গোড়া থেকেই একচেটিয়া ও দমনমূলক। এমন নয় যে নিম্নবর্গীয় নারীরা একদিকে উপনিবেশবাদের শিকার এবং অন্যদিকে লিঙ্গবৈষম্যের অধীন; বরং ঔপনিবেশিক ও পুরুষতান্ত্রিক আচরণ বা চর্চাগুলো একসাথে মিলে নিম্নবর্গীয় নারীদের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে কাজ করে।
ফলে, স্পিভাকের প্রবন্ধের নির্দিষ্ট কিছু ভাবনাকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করা মানে এক অর্থে সেই হেজিমনিক প্রবণতারই অংশ হওয়া, যার সমালোচনা স্পিভাক নিজে করেছেন। এই টেক্সটটির মূল বিষয় রিপ্রেজেন্টেশন—অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে নিম্নবর্গের সোচ্চার হওয়ার ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা—, আর পুরুষতন্ত্রের প্রতি এর আগ্রহটা গৌণ বা পরোক্ষ—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অর্থ হবে লেখাটির ওপর এমন একটি ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেওয়া যা স্পিভাক সম্ভবত প্রতিহত করতেন। এই বিষয়টি মাথায় রেখে, নারীদের নিয়ে স্পিভাকের আলোচনাকে প্রতিনিধিত্বের প্রতি তাঁর যে ব্যাপকতর আগ্রহ, তারই একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
স্পিভাক ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ গ্রুপ’-এর গবেষণার কৌশলগত ত্রুটিগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন—মোটা দাগে বলতে গেলে, তাঁদের নিম্নবর্গের অভিজ্ঞতাকে ‘এসেনশিয়েলাইজ’ করার প্রবণতা, যেখানে সব নিম্নবর্গের অভিজ্ঞতাকে মূলত একই রকম মনে করা হয়। বিশেষ করে, নিম্নবর্গীয় নারীদের ভূমিকাকে অবহেলা করার জন্য তিনি তাঁদের সমালোচনা করেন। অবশ্য তিনি এটিও স্বীকার করেন যে, নিম্নবর্গীয় নারীদের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করা বেশ কঠিন, কারণ ইতিহাসের সমস্ত নথিপত্র পুরুষদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট: ‘ঔপনিবেশিক উৎপাদনের প্রেক্ষাপটে যদি নিম্নবর্গের কোনো ইতিহাস না থাকে এবং তারা কথা বলতে না পারে, তবে নারী হিসেবে একজন নিম্নবর্গীয় মানুষ আরও অনেক গাঢ় অন্ধকারের গভীরে হারিয়ে যায়।’ পুরুষ নিম্নবর্গীয়দের তুলনায় নারী নিম্নবর্গীয়দের নথিপত্র বা রেকর্ড আরও অনেক বেশি দুষ্প্রাপ্য, যা তাঁদের জীবনের গল্পগুলো খুঁজে পাওয়াকে আরও কঠিন করে তোলে।
ধারণাগুলোর বিস্তার
নিম্নবর্গীয় নারীদের দ্বিগুণ পদদলিত হওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্পিভাক এই মূল্যায়নটি তুলে ধরেছেন: ‘শ্বেতাঙ্গ পুরুষেরা বাদামী পুরুষদের হাত থেকে বাদামী নারীদের রক্ষা করছে।’ স্পিভাক এখানে বোঝাতে চেয়েছেন যে, শ্বেতাঙ্গ পুরুষেরা ভারতীয় পুরুষদেরকে ভারতীয় নারীদের জন্য একটি হুমকি হিসেবে চিত্রায়িত করে; আর এভাবে তারা এই দুই পক্ষের মাঝে হস্তক্ষেপ করার মাধ্যমে নিজেদের অত্যন্ত উপকারী বা সহায়তাকারী হিসেবে উপস্থাপন করে। এর অন্তরালে লুকিয়ে আছে এমন একটি বিশ্বাস যে, শ্বেতাঙ্গ পুরুষেরা ভালো করেই জানে ভারতীয় নারীরা কী চায়, এবং তাই তারা তাঁদের পক্ষ হয়ে কাজ করতে পারে।
বিষয়টি বেশ জটিল, কারণ স্পিভাক বর্ণনা মোতাবেক—ভারতীয় সমাজের পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর অর্থই হলো ‘বাদামী পুরুষেরা’ আসলেই ‘বাদামী নারীদের’ ওপর ক্ষমতা খাটায়। প্রথম নজরে, এই অবস্থায় কোনো বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ করাকে কাঙ্ক্ষিত বা ইতিবাচক মনে হতেই পারে। কিন্তু স্পিভাক যেমনটা উল্লেখ করেছেন: ‘একটি ভালো সমাজের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সাম্রাজ্যবাদের যে ভাবমূর্তি, তা চিহ্নিত হয়ে থাকে নারীকে তাঁর নিজের জাতির মানুষদের হাত থেকে রক্ষার একটি অবজেক্ট হিসেবে গ্রহণ করার মাধ্যমে।’ অর্থাৎ, নারীদেরকে ‘সাবজেক্ট’ (স্বাধীন সত্তা) হিসেবে নিজেদের শর্তে চিন্তা ও কাজ করার অধিকার দেওয়ার পরিবর্তে, ঔপনিবেশিক সরকারগুলো নারীদের কেবলই একটি নিষ্ক্রিয় বস্তু বা অবজেক্ট হিসেবে বাঁচিয়ে রেখেছিল। এর ফলে, আবারও তাঁদের স্বাধীন এজেন্সি এবং নিজেদের হয়ে কথা বলার সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যায়।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ পাওয়া যায়, যখন স্পিভাক ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করা সংক্রান্ত বিতর্কটি বর্ণনা করেন। এই বিতর্কের সময়, উপনিবেশবাদী ও কিছু হিন্দু পুরুষ নারীদের সাথে কেমন আচরণ করা উচিত তা নিয়ে কথা বলছিলেন, কিন্তু কেউ ‘কখনোই সেখানে নারীদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর ও চেতনার কোনো সাক্ষ্য বা প্রমাণ পায় না।’ অন্য কথায়, সেই পুরো প্রক্রিয়াটিতে নারীদের কণ্ঠস্বর সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল, যা তাঁদের একই সাথে নিম্নবর্গ ও নারী—উভয় হিসেবেই দ্বিগুণভাবে সমাজ থেকে বাদ বা বহিষ্কৃত করে রেখেছিল।
উপেক্ষিত দিকগুলো
যদিও স্পিভাকের প্রবন্ধটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে, তবুও এর কিছু অংশ এখনো যথেষ্ট নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। বিশেষত, সমালোচকেরা প্রাক-ঔপনিবেশিক ও প্রারম্ভিক-ঔপনিবেশিক ভারতীয় ইতিহাসের প্রতি তাঁর দেওয়া মনোযোগকে বহুলাংশে উপেক্ষা করেছেন। ২০০০ সালে দুজন পণ্ডিত লক্ষ্য করেছিলেন যে, ‘স্পিভাকের প্রবন্ধের অনুচ্চারিত এবং খুব কম আলোচিত তৃতীয় ও চতুর্থ অংশ দুটি...যেখানে ব্রিটিশ ভারতের প্রাথমিক ইতিহাসের উল্লেখ রয়েছে, তা গত দশ বছরে একেবারেই অপঠিত রয়ে গেছে।’ এগুলোকে ‘খুব কম আলোচিত’ বলাটা হয়তো কিছুটা বাড়িয়ে বলা, তবুও এই পণ্ডিতেরা প্রবন্ধটির প্রভাব বিবেচনা করার একটি বিকল্প উপায় দেখিয়েছেন। তাঁরা বোঝাতে চেয়েছেন যে, উত্তর-ঔপনিবেশিক সমালোচনা ‘ইউরোপীয় আধুনিকতার সময়কালটিকে, বিশেষ করে ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকে, একটি আমূল পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে দেখার উপর’ এতটাই জোর দিয়েছেন যে (অর্থাৎ, আনুমানিক ১৮০০ শতকের শেষের দিক থেকে বর্তমান পর্যন্ত ঔপনিবেশিক ইতিহাস নিয়ে তারা এত বেশি ব্যস্ত ছিল যে), উপনিবেশবাদের শুরুর দিকের ইতিহাসকে তারা অবহেলা করেছে।
স্পিভাক এই প্রবন্ধে ‘ঋগ্বেদ’ ও ‘ধর্মশাস্ত্র’র মতো প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে এই পুরোনো ইতিহাসের দিকে মনোযোগ ফেরানোর চেষ্টা করেছেন। স্পিভাক এই গ্রন্থগুলো বিশ্লেষণ করেছেন, কারণ সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করার সময় এই দুটিকেই প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। স্পিভাক তার চিরচেনা ডিকনস্ট্রাকশনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখিয়েছেন, কীভাবে এই গ্রন্থগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অনুবাদ তাদের অর্থ বদলে দিতে পারে। ব্রিটিশরা ‘সতী’ শব্দটিকে কেবল ‘বিধবার আত্মত্যাগ’ হিসেবে বুঝেছিল, কিন্তু এর আরেকটি আক্ষরিক অর্থও রয়েছে: ‘সতীসাধ্বী স্ত্রী’ বা ‘ভালো স্ত্রী’। স্পিভাকের মতে, ভুলবশত ‘সতী’ শব্দটিকে কেবল ‘বিধবার চিতায় আত্মাহুতির আচার’ হিসেবে ব্যবহার করার এই অসম্পূর্ণ অর্থটি “ব্রিটিশদের একটি ব্যাকরণগত ভুলকে স্মরণ করিয়ে দেয়; ঠিক যেমন ‘আমেরিকান ইন্ডিয়ান’ নামকরণটি কলম্বাসের (ইতালীয় অভিযাত্রী যিনি ভেবেছিলেন তিনি ভারতে পৌঁছেছেন, অথচ বাস্তবে তিনি আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন) একটি তথ্যগত ভুলকে স্মরণ করায়।” স্পিভাকের বোঝাপড়ায়, ‘সতীসাধ্বী স্ত্রী’ ধারণার জায়গায় ‘স্বামীর চিতায় আত্মাহুতি দেওয়া বিধবা’-কে প্রতিস্থাপন করার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক সরকারের ‘শ্বেতাঙ্গ পুরুষেরা’ আসলে ‘বাদামী নারীদের’ ওপর ‘আরও বড় একটি আদর্শিক শৃঙ্খল বা সীমাবদ্ধতা’ চাপিয়ে দিয়েছিল। অর্থাৎ, আপাতদৃষ্টিতে এই নারীদের স্বার্থে কাজ করছে বলে মনে হলেও, ঔপনিবেশিক সরকার বাস্তবে তাঁদের সেই পরাধীন অবস্থানটিকেই আরও বেশি পাকাপোক্ত করেছিল।
স্পিভাকের যুক্তির মূল্যায়ন
‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ প্রবন্ধে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের উদ্দেশ্য যদি হয় এটা দেখানো যে, নিম্নবর্গের কণ্ঠস্বরকে সুপরিকল্পিতভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়—তবে তিনি বহুলাংশে সফল। তিনি র্যাডিক্যাল দর্শন থেকে শুরু করে মার্ক্সবাদী তত্ত্ব, নারীবাদী সমালোচনা এবং সংশোধনবাদী ইতিহাস থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক আইন পর্যন্ত প্রমাণের এমন এক বিশাল ভাণ্ডার উপস্থাপন করেছেন, যার প্রতিটিই ইঙ্গিত করে যে নিম্নবর্গের কণ্ঠস্বরকে নীরব করে দেওয়া হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে বিশ্বব্যাপী ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক, আইনি এবং আদর্শিক উপাদানগুলো একসাথে মিলে ‘প্রান্তে বসবাসকারী’দের (যারা পশ্চিমের বাইরে বাস করে, বিশেষ করে সেই অ-পশ্চিমা সমাজগুলোর দরিদ্র ও অধিকারবঞ্চিত মানুষ) ‘কথা শোনার সম্ভাবনাকে’—অর্থাৎ একজন আগ্রহী শ্রোতার কাছে নিজের কথা পৌঁছানোর সুযোগকে—রুদ্ধ করে দিয়েছে।
এই প্রবন্ধ কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার অধিকারীদের ভাষা কীভাবে নিম্নবর্গকে দাবিয়ে রাখে, তার একটি তাত্ত্বিক বা বিমূর্ত বোঝাপড়া তৈরিতে সফল হয়েছে। স্পিভাকের এই লেখাটি নিশ্চিতভাবেই ‘এসেনশিয়েলাইজিং’ রিপ্রেজেন্টেশনের—অর্থাৎ, যেসব উপস্থাপনা কোনো ব্যক্তিকে একটি স্থূল বা অপরিবর্তনশীল ছাঁচে (stereotype) ফেলে দেয়—পেছনের যুক্তিকে দুর্বল করতে সাহায্য করে। তা সত্ত্বেও, এ ধরণের আচরণ বা প্রবণতা বন্ধ করার ক্ষেত্রে প্রবন্ধটির প্রভাব ছিল সীমিত। বড়জোর, এই প্রবন্ধটি বুদ্ধিজীবীদের সেই আপসকামী অবস্থান সম্পর্কে সংবেদনশীল হতে উৎসাহিত করেছে, যা তৈরি হয় যখন তাঁরা নীরব বা কণ্ঠহীন নিম্নবর্গের জায়গায় নিজেরা কথা বলতে যান। শিক্ষাবিদ বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তিরা এখন আশা করা যায় এই বিষয়ে আরও বেশি সচেতন যে, নিম্নবর্গের জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলা ভুল উপস্থাপনার ঝুঁকি নিয়ে আসে—অর্থাৎ দরিদ্র ও অধিকারবঞ্চিতদের চিন্তাভাবনা ও স্বার্থ ব্যাখ্যার চেষ্টা করার সময় নিখুঁত বা নির্ভুল না হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে। তা সত্ত্বেও, স্পিভাক যে বারবার এই লেখাটির কাছে ফিরে এসেছেন—তিনি এর পরিমার্জিত সংস্করণও প্রকাশ করেছেন—তা ইঙ্গিত করে যে, বর্তমান ইস্যু বা সংকটগুলোর ক্ষেত্রেও এর চলমান গুরুত্বের ওপর তাঁর গভীর বিশ্বাস রয়েছে। পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের আলোকেও যে প্রশ্নটি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে, তা জাগিয়ে তোলাই যদি তাঁর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবে তিনি নিঃসন্দেহে সফল হয়েছেন।
কিছু সীমাবদ্ধতা
যদিও ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ প্রবন্ধে স্পিভাকের অধিকাংশ উদাহরণই ভারতীয় সংস্কৃতি থেকে নেওয়া হয়েছে, তবুও এটি প্রতিনিধিত্বের যে সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে এবং এর যে ‘অ্যান্টি-এসেনশিয়ালিস্ট’ পদ্ধতি, তা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত এবং ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক সময়ের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উপযোগী করেই তৈরি করা হয়েছে। তবে এটি মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি যে, এই প্রবন্ধটি এমন কোনো কর্ম-নির্দেশিকা বা গাইডলাইন নয় যা যেকোনো পরিস্থিতিতেই অন্ধভাবে ব্যবহার করা যাবে। স্পিভাক প্রবন্ধে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, “ইউরোপকে যদি ‘সেলফ’ ধরা হয়, তবে তার বিপরীতে ‘আদার’ হিসেবে যেসব দেশ, জাতি বা সংস্কৃতির নাম আসতে পারে—তাদের সবার প্রতিনিধি হিসেবে এই ভারতীয় উদাহরণটিকে ঢালাওভাবে নেওয়া যাবে না।”
স্পিভাক সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ভারতের নিম্নবর্গীয়রা এবং অন্যান্য দেশের নিম্নবর্গীয়রা একইভাবে প্রান্তিক বা কোণঠাসা হতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে—তাদের পরিস্থিতি হুবহু এক। স্পিভাক তাঁর নিজের অবস্থানকে একটি ‘চিরায়ত ডিকনস্ট্রাক্টিভ’ অবস্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন; যার অর্থ হলো—এমন একটি অবস্থান যা সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজে ‘পরিস্থিতি অনুযায়ী, চিরকালের জন্য নয়।’ কোনো সমাধানই সব সময় এবং সব স্থানের জন্য চিরন্তন বা আদর্শ সমাধান হতে পারে না, এবং পরিবর্তনশীল ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক পরিস্থিতির সাথে সংগতি রেখে সমাধানগুলোকে সবসময় রূপান্তর বা পুনর্বিন্যাস করে নিতে হবে।
একটিমাত্র সুনির্দিষ্ট বা স্থায়ী পদ্ধতির প্রতি স্পিভাকের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ না থাকার এই বিষয়টি একই সাথে এই প্রবন্ধের শক্তি ও দুর্বলতা। ব্যাখ্যার একটি সদা-পরিবর্তনশীল কাঠামো বা ফ্রেমওয়ার্ক দেওয়ার মাধ্যমে তিনি সেই চিরচেনা সমস্যাটি এড়াতে পেরেছেন যেখানে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো সব উদাহরণের সাথে খাপ খায় না। তবে, নিম্নবর্গীয়তার সাথে জড়িত পরিস্থিতিগুলোতে আমাদের ঠিক কী করা উচিত তা কখনো সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না করার কারণে, এই দৃষ্টিভঙ্গিটিকে উদ্বেগজনকভাবে দিকহীন বা অবয়বহীন মনে হতে পারে। তদুপরি, যদি প্রতিটি পদ্ধতি ও অর্থের প্রতিটি স্থায়ী বিন্দুকেই এভাবে ভেঙে ফেলা বা দুর্বল করা হয়, তবে এই প্রশ্ন উঠতেই পারে যে—কেন একটি ডিকনস্ট্রাক্টিভ পদ্ধতিই ব্যবহার করতে হবে? আমরা যদি সবকিছুকেই সন্দেহের চোখে দেখি, তবে কোনো কিছুর স্থায়ী রূপ বা স্থায়িত্বকে যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়—ডিকনস্ট্রাকশনের সেই প্রশ্ন তোলার প্রক্রিয়াটিকেই কি আমাদের সমানভাবে সন্দেহের চোখে দেখা উচিত নয়?
সমালোচনা
স্পিভাকের এই প্রবন্ধটি মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছিল। ইতিহাসবিদ জ্ঞান প্রকাশ ১৯৯২ সালে এক লেখায় দেখান যে, ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে স্পিভাকের ডিকনস্ট্রাকশনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি কতটা মূল্যবান হতে পারে। প্রকাশের মতে: ‘স্পিভাক অত্যন্ত সঠিকভাবে নিম্নবর্গীয় নারীর স্তব্ধ বা নীরব হয়ে থাকাকে এমন একটি বিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যেখানে এসে একজন ব্যাখ্যাকারীকে ঐতিহাসিক বোঝাপড়ার সীমাবদ্ধতা মেনে নিতেই হয়; কারণ যে নারীকে কথা বলার মতো কোনো স্বাধীন অবস্থান বা ‘সাবজেক্ট-পজিশন’-ই দেওয়া হয়নি, তাঁর কণ্ঠস্বর পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব।’ প্রকাশ এখানে নিম্নবর্গীয় নারীদের ‘কণ্ঠস্বর পুনরুদ্ধার’ করার চেষ্টারত ইতিহাসবিদদের প্রতি স্পিভাকের ছুঁড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জটিকে স্বীকার করে নিয়েছেন। অর্থাৎ, এই ধরণের নারীরা তাঁদের কণ্ঠস্বর খুঁজে পাবেন—এমনটা কল্পনা করার আগে শিক্ষা, আইনি সমতা, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং রাজনৈতিক সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি।
‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ গ্রুপ’-এর সদস্য ও ইতিহাসবিদ পার্থ চট্টোপাধ্যায় লক্ষ্য করেছেন: ‘শুরুর দিকে আমাদের ভাবনায় নিম্নবর্গীয়তা বলতে মূলত একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী কাঠামোকে বোঝাত, যা হয়তো পুরোপুরি স্থবির বা সুসংজ্ঞায়িত ছিল না।’ কিন্তু ‘গায়ত্রী স্পিভাকের হস্তক্ষেপ বা সংযোজন’ এই বিষয়টিকে ‘ব্যক্তি মানুষের সাথে লেগে থাকা এক ধরণের নিম্নবর্গীয়তা’ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ করে দেয় এবং এভাবে তা ‘নিম্নবর্গীয়তার ধারণায় সম্পূর্ণ নতুন একটি মাত্রা যোগ করে।’ সংক্ষেপে বলতে গেলে, নিম্নবর্গের বহুত্ব বা বৈচিত্র্যের (অর্থাৎ নিম্নবর্গীয় গোষ্ঠীগুলোর নিজেদের মধ্যের এবং প্রত্যেক্টি গ্রুপের ভেতরের বিশাল পার্থক্যের) ওপর স্পিভাকের যে জোর ছিল, তা এই গোষ্ঠীর কিছু সদস্যের গবেষণা পদ্ধতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। স্পিভাকের এই প্রবন্ধের পর, নিম্নবর্গীয় হওয়া মানে কেবল একটি অর্থনৈতিক শ্রেণীগত অবস্থানে থাকা নয়; বরং এর সাথে একটি ব্যক্তিগত পরিচয় বা আইডেন্টিটি জড়িয়ে থাকার বিষয়ও যুক্ত হয়।
ভারতীয় জেন্ডার ও উত্তর-ঔপনিবেশিক অধ্যয়নের পণ্ডিত অনিয়া লুম্বা স্পিভাকের প্রবন্ধের প্রতি কিছুটা আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি স্পিভাকের এই অবস্থানকে সাধুবাদ জানান যে, ‘ঔপনিবেশিক বিতর্কে নারীদের কণ্ঠস্বরের অনুপস্থিতি’ মূলত ‘সামগ্রিকভাবে কোনো স্বাধীন অবস্থান বা সাবজেক্ট পজিশন পুনরুদ্ধারের কঠিন বাস্তবতাকে’ চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় (অর্থাৎ, যারা কণ্ঠহীন ছিল তাঁদের অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগের কথা খুঁজে বের করার অসুবিধাটাকে স্পষ্ট করে তোলে)। তিনি উল্লেখ করেন যে, এটি ‘বিশেষ করে উপনিবেশবাদ এবং স্থানীয় পুরুষতন্ত্রের সহিংসতা’-কে নির্দেশ করে। কিন্তু স্পিভাকের এই সিদ্ধান্ত যে ‘নিম্নবর্গ কথা বলতে পারে না’—তাঁর কাছে ‘উদ্বেগজনক মনে হয়েছে তাঁদের জন্য, যারা ঠিক এই কণ্ঠস্বরগুলো পুনরুদ্ধারের কাজেই নিয়োজিত আছেন।’ লুম্বার মতে, নিম্নবর্গের কণ্ঠস্বরের এই অভাব বা অনুপস্থিতির ওপর স্পিভাকের যে অনমনীয় জোর, তা এই ক্ষেত্রে চলমান বাস্তব গবেষণা ও কাজের মাধ্যমেই ভুল প্রমাণিত হয়।
বেশ কয়েকজন সমালোচক, বিশেষ করে কিছু মার্ক্সবাদী ও নারীবাদী, স্পিভাকের এই ডিকনস্ট্রাকশনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি বৈরী মনোভাবাপন্ন ছিলেন। তাঁদের মতে, এই দৃষ্টিভঙ্গি মোতাবেক, নিম্নবর্গীয়রা কোনো রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করে না এবং করতে পারেও না। সাহিত্যিক তাত্ত্বিক বেনিতা প্যারি তাঁর ১৯৮৭ সালের প্রবন্ধ ‘প্রবলেমস ইন কারেন্ট থিওরিজ অব পলিটিক্যাল ডিসকোর্স’-এ যুক্তি দেখিয়েছেন যে, নিম্নবর্গ কথা বলতে পারে না—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে স্পিভাক আসলে ‘যেখানে আদিবাসীদের কণ্ঠস্বর শোনা সম্ভব, সেখানে তাঁর এক ধরণের সুপরিকল্পিত বধিরতা’ প্রদর্শন করেছেন। প্যারি মনে করেন, স্পিভাকের এই দৃষ্টিভঙ্গি উপনিবেশবাদের ‘ডিসকোর্স’-কে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায় যা প্রতিরোধের সমস্ত সম্ভাব্য রূপকেই আটকে দেয়। এই সমালোচকেরা স্পিভাককে দোষারোপ করেন এই কারণে যে, তিনি দরিদ্র ও অধিকারবঞ্চিতদের কণ্ঠস্বর যেখানে আসলে শোনা সম্ভব, সেখানেও উপেক্ষা করেছেন।
প্রতিক্রিয়াসমূহ
স্পিভাক তাঁর প্রবন্ধের সমালোচনা এবং যেগুলোকে তিনি ভুল বোঝাবুঝি বলে মনে করেন—তার জবাব দিয়েছেন; যেখানে তিনি তাত্ত্বিক আপত্তি এবং তাঁর লেখার শৈলী বা স্টাইল নিয়ে ওঠা সমালোচনা—দুটো নিয়েই কথা বলেছেন। নিম্নবর্গীয়রা নীরব বা কণ্ঠহীন—তাঁর এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা প্রসঙ্গে যখন জানতে চাওয়া হয়, তখন তিনি সেইসব সমালোচকদেরই পাল্টা সমালোচনা করেন যারা নিম্নবর্গের ‘কথা বলা’ এবং তাদের ‘কথা শ্রুত হওয়া’র বিষয়টিকে গুলিয়ে ফেলেন। তদুপরি তিনি দেখিয়েছেন যে, মানুষ অনেক সময় ভুলবশত মনে করে নিম্নবর্গীয়রা বুঝি নিজেদের দাবি নিয়ে সোচ্চার হচ্ছে, অথচ বাস্তবে যারা কথা বলছে তারা ভুলভাবে নিজেদের নিম্নবর্গীয় বলে দাবি করছে। উদাহরণস্বরূপ, যারা ‘কেবল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বৈষম্যের শিকার হওয়া কোনো সংখ্যালঘু গোষ্ঠী,’ তারা হয়তো নিপীড়িত হতে পারে, কিন্তু তারা নিম্নবর্গীয়তার অভিজ্ঞতা পার করছে না—কারণ নিম্নবর্গীয়তা হলো তার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষমতাহীন ও প্রান্তিক একটি অবস্থান।
প্রবন্ধটি প্রকাশের প্রায় ১০ বছর পর, স্পিভাক তাঁর অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনেন এবং স্বীকার করেন যে এটি আসলেই এমন এক শৈলীতে লেখা হয়েছিল যা অপ্রয়োজনীয়ভাবেই অত্যন্ত দুর্বোধ্য ছিল। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি লেখাটিকে “‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক’ নামক একটি জটিল ও দুর্বোধ্য রচনা” হিসেবে উল্লেখ করেন; এবং অন্য একটি সাক্ষাৎকারে বলেন যে, মূল লেখাটি ‘অতিরিক্ত জটিল’ ছিল যা নানা ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দিয়েছে। এটি ইঙ্গিত করে যে স্পিভাক তাঁর আগের সংস্করণের লেখার ধরন থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন, কারণ তিনি এর আড়ম্বরপূর্ণ জটিলতা ও দুরূহতার সমালোচনা করেছেন।
১৯৯৯ সালে তিনি প্রবন্ধটির একটি পরিমার্জিত ও বর্ধিত সংস্করণ প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি তাঁর লেখার শৈলীকে আরও স্পষ্ট করেন এবং উল্লেখ করেন যে ‘নিম্নবর্গ কথা বলতে পারে না’ এটি ছিল ‘একটি অবিবেচকের মতো মন্তব্য।’ এই পরিমার্জিত সংস্করণে স্পিভাক তাঁর আদি সিদ্ধান্তের ওপর সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন যে, ‘যখন নিম্নবর্গীয় গোষ্ঠীর কোনো সদস্য এবং নাগরিকত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার সার্কিট বা কাঠামোর মধ্যে যোগাযোগের একটি পথ তৈরি হয়, তখন সেই নিম্নবর্গ হেজেমনি বা আধিপত্যের দীর্ঘ পথে প্রবেশ করে।’ অন্য কথায়, নিম্নবর্গীয়রা যখন অ-নিম্নবর্গীয়দের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে, তখন তা তাদের নিম্নবর্গীয়তার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার একটি প্রক্রিয়া শুরু করে। এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি নিম্নবর্গীয় অবস্থা থেকে মুক্তির একটি সম্ভাব্য পথের ইঙ্গিত দেয়। স্পিভাক আরও বলেন, এই ধরণের যোগাযোগের পথ তৈরি করা ‘অবশ্যই কাম্য’, যদি না আমরা ‘নিম্নবর্গীয়তাকে টিকিয়ে রাখার’ পক্ষে কোনো ‘রোমান্টিক বিশুদ্ধতাবাদী বা আদিমতাবাদী’ হই। আরও একবার স্পষ্ট হয় যে, স্পিভাকের লক্ষ্য প্রথমত নিম্নবর্গের কথাকে শোনার উপযোগী করা—তবে এর দীর্ঘমেয়াদী উদ্দেশ্য হলো বিশ্ব থেকে নিম্নবর্গীয়তার অস্তিত্বকেই পুরোপুরি মুছে ফেলা, যাতে দরিদ্র ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের মতো এমন কোনো গোষ্ঠী আর না থাকে, যাদের নিজেদের দাবি প্রকাশ করার এবং তা শোনানোর কোনো উপায় নেই।
ভিন্নমত এবং ঐকমত্য
সোশ্যাল ক্রিটিসিজমের প্রকল্প এবং ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’-এর ভাষা নিয়ে বিতর্ক আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দৃশ্যমান। স্পিভাকের দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্যারির মতো স্পিভাকের প্রাথমিক মার্ক্সবাদী সমালোচকদের অবস্থান মূলত উত্তর-ঔপনিবেশিক অধ্যয়নে এক বড় ধরণের বিভাজনকে চিহ্নিত করেছে।
খুব মোটা দাগে বলতে গেলে, উত্তর-ঔপনিবেশিক অধ্যয়ন এখন দুটি শিবিরে বিভক্ত। একদিকে রয়েছে পোস্ট-স্ট্রাকচারাল দর্শন এবং ডিসকোর্স অ্যানালিসিস দ্বারা প্রভাবিত দৃষ্টিভঙ্গি, যা ভাষার মাধ্যমে সংঘটিত ‘এপিস্টেমিক ভায়োলেন্স’ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। অন্যদিকে রয়েছে মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যা প্রতিরোধ ও সংঘাতের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে খতিয়ে দেখে। স্পিভাকের কাজ উত্তর-ঔপনিবেশিক অধ্যয়নের এই পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট ধারার সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত, যাকে কিছু মার্ক্সবাদী উত্তর-ঔপনিবেশিক পণ্ডিত বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগের অনুপযোগী এবং অতিরিক্ত মাত্রায় তাত্ত্বিক বা বিমূর্ত বলে মনে করেন। স্পিভাকের এই প্রবন্ধের রাজনৈতিক কার্যকারিতা নিয়ে চলা বিতর্কটি আংশিকভাবে উত্তর-ঔপনিবেশিক অধ্যয়নের বর্তমান রূপকে নির্ধারণ করে দিয়েছে।
স্পিভাকের কাজের এক্সেসিবিলিটি নিয়েও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। এই প্রশ্নটি (পাঠ্যটি বোঝা কতটা কঠিন বা সহজ) তাত্ত্বিক দিক থেকে হয়তো কম আকর্ষণীয় হতে পারে, তবে উত্তর-ঔপনিবেশিক অধ্যয়নের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি জায়গা। উত্তর-ঔপনিবেশিক অধ্যয়নের অন্যতম লক্ষ্য যদি হয় নিপীড়িত ও প্রায়শই অর্ধ-শিক্ষিত বা নিরক্ষর মানুষকে নিপীড়ন থেকে নিজেদের মুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় সমালোচনামূলক হাতিয়ার সরবরাহ করা, তবে এই ধরণের পাঠ্যগুলোর সহজবোধ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্পিভাকের ‘আ ক্রিটিক অব পোস্টকলোনিয়াল রিজন’ গ্রন্থের একটি কঠোর পর্যালোচনায় সাহিত্য সমালোচক টেরি ইগলটন স্পিভাককে তাঁর obscurantism বা দুর্বোধ্যতাবাদের জন্য তিরস্কার করেছেন। তিনি টেক্সটিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল করার দোষে দোষী করেছেন। এর জবাবে নারীবাদী তাত্ত্বিক জুডিথ বাটলার অবশ্য লিখেছেন, ‘স্পিভাকের লেখার এত বিস্তৃত পাঠকসমাজই প্রমাণ করে যে, মানুষ মুখে তুলে দেওয়া সহজ ব্যাখ্যা (spoon-feeding) ততটা পছন্দ করে না; বরং এমন ধরনের রাজনৈতিক/এক্টিভিস্ট চিন্তা ও লেখাকে মূল্য দেয়, যা পৃথিবীকে আরও গভীর, মৌলিক এবং র্যাডিকাল উপায়ে ভাবতে আমাদের বাধ্য করে।’ বাটলার যুক্তি দেখান যে, লেখার আরও সহজ উপায় থাকলেও, স্পিভাকের এই ঘন ও নিবিড় শৈলী চিন্তার খোরাক জোগাতে এক আকর্ষণীয় উদ্দীপনা হিসেবে কাজ করে।
সমকালীন গবেষণা ও চলমান বিতর্ক
‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ প্রবন্ধটি গবেষকদের কাজের ওপর বেশ গভীর ও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। জুডিথ বাটলার স্পিভাকের এই প্রভাবকে সাধুবাদ জানিয়ে একে ‘যেকোনো জীবিত পণ্ডিতের চেয়ে অতুলনীয়’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আরও যোগ করেন যে, স্পিভাক নারীবাদী তত্ত্ব, মার্ক্সবাদী তত্ত্ব ও নিম্নবর্গীয় অধ্যয়নের ‘অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রকেই বদলে দিয়েছেন।’ এই প্রবন্ধের প্রভাব ইতিহাসবিদ, সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক, ভূগোলবিদ এবং নৃবিজ্ঞানীদের কাজে গভীরভাবে অনুভূত হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কোর্সে এটি এখনও নিয়মিত পড়া ও পড়ানো হচ্ছে। স্পিভাকের চিন্তাধারা অবলম্বনে সম্প্রতি গবেষক ইয়াহু টি. বিনয়রাজ ‘স্পিভাক, ফেমিনিজম অ্যান্ড থিওলজি’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন; যেখানে তিনি বর্তমান নারীবাদী ধর্মতত্ত্বে স্পিভাকের এই প্রবন্ধের ডিকনস্ট্রাক্টিভ পদ্ধতির তাৎপর্য খতিয়ে দেখেছেন।
এই প্রবন্ধে স্পিভাক যেসব সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, তার আরও অনেক প্রত্যক্ষ ও ব্যবহারিক সুফল লক্ষ্য করা গেছে। স্পিভাকের এই প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শরিকজন হলেন খোদ সেই নিম্নবর্গীয় নারীরা, যাদের সাথে তিনি নিজে কাজ করেন। স্পিভাকের তত্ত্বায়ন বা থিওরি তৈরির কাজটি মূলত একটি শিক্ষিত অ্যাকাডেমিক পাঠকগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে হলেও, এর পরিপূরক হিসেবে কাজ করে তাঁর মাঠপর্যায়ের সরাসরি অ্যাক্টিভিজম। তিনি প্রতি বছর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে সময় কাটান, যেখানে তিনি একটি সাক্ষরতা প্রকল্প পরিচালনা করেন এবং মানুষের মধ্যে ‘গণতন্ত্রের অভ্যাস’ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। দীর্ঘ সময় ধরে এই নারীদের সাথে সরাসরি কাজ করার মাধ্যমে স্পিভাক নিম্নবর্গীয়দের কাছ থেকে শেখেন এবং তাদের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষাগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে ও সেগুলোকে রাজনৈতিক পরিবর্তনে অনুবাদ করতে সাহায্য করেন।
স্পিভাকের এই প্রবন্ধটি আংশিকভাবে উত্তর-ঔপনিবেশিক অধ্যয়নের বর্তমান প্রভাবশালী ধারাটির ভিত্তি স্থাপন করেছে, যা মূলত পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট চিন্তাধারা দ্বারা অনুপ্রাণিত; যেখানে সমালোচকেরা যেকোনো টেক্সটের ভেতরে থাকা ‘অস্থিরতা, দ্বিধাদ্বন্দ্ব...কিংবা লুকানো নিহিতার্থ (the in-between)’-র দৃষ্টান্তগুলো খুঁজে বের করার জন্য তা পাঠ করেন। তবে, কিছু সমালোচক এই ধরণের সমালোচনাকে অতিরিক্ত মাত্রায় বিমূর্ত এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্বের প্রাত্যহিক বাস্তবতা থেকে অনেক বেশি দূরে সরে যাওয়া বলে মনে করেন।
উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক নিল লাজারাস এমনকি এই ইঙ্গিতও করেছেন যে, সমস্ত উত্তর-ঔপনিবেশিক পাঠ্যকে এই একই ডিকনস্ট্রাকশনিস্ট চশমা দিয়ে দেখার মাধ্যমে এ ধরণের সমালোচনা আসলে সেই ‘সার্বজনীনকরণ’-এর রূপটিকেই ধারণ করে, যার সমালোচনা সে নিজে করতে চায়। তাঁর সাম্প্রতিক গ্রন্থ ‘দ্য পোস্টকলোনিয়াল আনকনশাস’ (২০১১)-এ লাজারাস যুক্তি দেখান যে, উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য অসাধারণ বৈচিত্র্যময় শৈলী বা স্টাইল এবং ঘরানা (genres) উপহার দিয়েছে। এই সমস্ত টেক্সট সম্পর্কে একই ধরণের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার মাধ্যমে—যেমন নিম্নবর্গ সবসময়ই নীরব বা কণ্ঠহীন হয়ে পড়ে, এমন একটি উপসংহার দেখানোর মাধ্যমে—ডিকনস্ট্রাকশনিস্ট সমালোচকেরা এই টেক্সটগুলোর ওপর এমন এক ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেন, যেখানে টেক্সটগুলোর মূল প্রতিপাদ্যের প্রতিফলন ঘটে না। সংক্ষেপে বলতে গেলে, উত্তর-ঔপনিবেশিক টেক্সটের নিজস্ব কণ্ঠস্বরটিই এখানে প্রাতিষ্ঠানিক সমালোচকদের—যারা প্রায়শই পশ্চিমা ও সুবিধাপ্রাপ্ত—দ্বারা স্তব্ধ বা নীরব হয়ে যায়।
অন্যান্য সমালোচক, যেমন মার্ক্সবাদী সাহিত্য তাত্ত্বিক আইজাজ আহমদ, পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজমের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের কার্যকারিতা ও মূল্য নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন; কারণ উত্তর-ঔপনিবেশিক জনগণের ভাগ্য বা অবস্থার উন্নতির ক্ষেত্রে এটি খুব কমই অবদান রাখতে পেরেছে। আহমদ ইঙ্গিত করেন যে, প্রায় ৩০ বছর ধরে কোনো দৃশ্যমান সাফল্য ছাড়াই এই পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি চর্চা করার পর, এখন হয়তো ভিন্ন কোনো কৌশল বা স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করার সময় এসেছে। আহমদের বোঝাপড়া অনুযায়ী, ডিসকোর্স বা বয়ানের প্রশ্নগুলো অর্থনৈতিক প্রশ্নের চেয়ে গৌণ হওয়া উচিত। তাঁর ভাষায়: ‘উত্তর-ঔপনিবেশিকতা হলো...অন্য বেশিরভাগ বিষয়ের মতোই, একটি শ্রেণীকেন্দ্রিক (class) বিষয়।’ এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, সমাজে সম্পদের অসম বণ্টনের ফলে সৃষ্ট ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা দূর না করে, নির্দিষ্ট কিছু জাতি বা সংস্কৃতির আধিপত্য বজায় রাখার এই ব্যবস্থা বা কাঠামোকে ভেঙে ফেলার যেকোনো চেষ্টাই ব্যর্থ হতে বাধ্য।
সংক্ষিপ্তসার
‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ হলো স্পিভাকের লেখা সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সবচেয়ে বিতর্কিত রচনা। গবেষক সন্ধ্যা শেঠি ও এলিজাবেথ জেন বেলামি উল্লেখ করেছেন যে, এই প্রবন্ধটি ‘উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের একটি ভিত্তিপ্রস্তর বা প্রধানতম রচনা হিসেবে স্বীকৃত।’ উত্তর-ঔপনিবেশিক সমালোচক রবার্ট ইয়ং তো আরও একধাপ এগিয়ে স্পিভাককে—এডওয়ার্ড সাইদ ও ভারতীয় পণ্ডিত হোমি ভাবার সাথে মিলিয়ে—উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের ‘হোলি ট্রিনিটি’র একজন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন; আর স্পিভাকের এসব খ্যাতি এসেছে মূলত এই প্রবন্ধটির কারণেই।
কেন এই প্রবন্ধটি নিয়ে এত ব্যাপক আলোচনা হয়েছে এবং কেন এটি আজও পঠিত হচ্ছে? এর একটি উত্তর লুকিয়ে আছে ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’-এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের মধ্যে। এই লেখাটি নিম্নবর্গীয়দের প্রতিনিয়ত ভুলভাবে উপস্থাপন করা এবং তাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেওয়ার বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, এবং এর পেছনে থাকা ক্ষমতার কাঠামোটিকে উন্মোচিত করে। স্পিভাকের প্রবন্ধটি এক বিশাল ক্ষেত্রকে সামনে নিয়ে আসে; এটি দেখায় যে, নিম্নবর্গের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হওয়ার ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং এটি হলো এমন এক বিশ্বের স্বাভাবিক পরিণতি যা সুপরিকল্পিতভাবে নিপীড়িতদের আওয়াজকে অন্যের কান পর্যন্ত পৌঁছতে বাধা দেয়। এই উদ্বেগগুলো আজকেও ততটাই জরুরি, যতটা প্রবন্ধটি প্রকাশের সময় ছিল। কারণ বর্তমানে আমরা ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ব্যবধানের মুখোমুখি হচ্ছি; এমনকি সংবাদমাধ্যমে নিজের সমস্যাগুলো তুলে ধরার অধিকারটুকুও গুরুত্ব বা যোগ্যতার ভিত্তিতে না, বরং টাকা বা খমতা দিয়ে কিনে নেওয়া হচ্ছে।
‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ প্রবন্ধে স্পিভাক কোনো স্পষ্ট সমাধান দিতে বা আমাদের কী করা উচিত সে বিষয়ে কোনো কর্মপরিকল্পনা প্রস্তাব করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন—যা এই প্রবন্ধের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এবং একই সাথে সবচেয়ে বড় শক্তি। বাস্তব কোনো কাজ করার চেয়ে নিজের কাজের পদ্ধতি বা মেথড নিয়ে আলোচনা করতেই বেশি সময় পার করা এবং কোনো নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার প্রতি আস্থা না রাখাকে এমন এক বিলাসিতা মনে হতে পারে, যা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক গবেষক বা শিক্ষাবিদদের পক্ষেই সম্ভব। যে বাংলাদেশি কৃষকেরা তাঁদের সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য লড়াই করছেন, কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার যেসব আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাঁদের নিজেদের জমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, তাঁদের কাছে এই গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে অনবরত প্রশ্ন তোলার মূল্য কতটুকু? তদুপরি, এই প্রবন্ধের ডিকনস্ট্রাক্টিভ প্রকল্পটি এতটাই নিখুঁত যে এটি শেষ পর্যন্ত নিজের দিকেই ঘুরে দাঁড়ায় এবং নিজের পদ্ধতিগুলোকেই কঠোর পরীক্ষার মুখোমুখি করে। যদি প্রতিটি পদ্ধতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে হয়, তবে ডিকনস্ট্রাকশনকে কি আমাদের সন্দেহের চোখে দেখা উচিত নয়? এগুলো অবশ্যই ভেবে দেখার মতো প্রশ্ন।
এইসব সম্ভাব্য ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও, স্পিভাকের প্রবন্ধটি বুদ্ধিজীবীদের আত্মতুষ্টির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিষেধক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর এই প্রশ্ন তোলার প্রক্রিয়া থেকে কেউই রেহাই পায়নি, এমনকি স্পিভাক নিজেও না। ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ প্রবন্ধটি তার গুরুত্ব ধরে রেখেছে কারণ এর শিরোনামের প্রশ্নটি ততদিন পর্যন্ত বারবার আওড়ানো উচিত, যতদিন শক্তিশালী সমাজ-কাঠামো বা স্তরবিন্যাস নিম্নবর্গকে তাঁদের অবদমিত অবস্থানেই আটকে রাখবে। স্পিভাক প্রশ্ন তোলেন—আমরা যদি এমন একটি সমাজ তৈরি করতে রাজি না হই যেখানে সবার একটি কণ্ঠস্বর থাকবে, তবে আমরা কি কখনো সমাজ নিয়ে গর্ব করতে পারি? স্পিভাক তাঁর প্রবন্ধের শিরোনামে যে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়েছেন তা আপাতদৃষ্টিতে সরল মনে হলেও, এটি একটি ন্যায়পরায়ণ সমাজে বেঁচে থাকার মূল মর্মার্থ বা একেবারে কেন্দ্রে আঘাত করে।