Skip to Content

বাংলাদেশে কাঠামোগত সংস্কার পর্যালোচনার ভূমিকা

আবিদ নাহার খন্দকার
27 সেপ্টেম্বর, 2026 by
আবিদ নাহার খন্দকার
| No comments yet

১.

দক্ষিণ এশিয়ায় উদারনীতিবাদ (Liberalism) প্রবেশ করেছিল সম্প্রসারণশীল বৈশ্বিক পুঁজিবাদের আদর্শিক কাঠামো হিসেবে। ব্রিটিশ ভারতের প্রাচীনতম ও কেন্দ্রীয় অঞ্চল ছিল বাংলা। এখানে উদারনীতিবাদের সম্প্রসারণে আধুনিকতার অন্তর্নিহিত একটি সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব প্রকাশিত হয়—অধিকার ও সমতার সার্বজনীন ঘোষণার বিপরীতে কাঠামোগত সাম্রাজ্যবাদী শোষণ। অন্যভাবে বললে, উদারনীতিবাদ এখানে একটি বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক পুনর্গঠনের উপরিকাঠামোর ন্যায্যতা হিসেবে ক্রিয়া করেছে। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রক্রিয়ায় উদারনীতিবাদ মুক্তির মতবাদ না হয়ে আদিম সঞ্চয়ন ও শ্রেণি পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়াকে বৈশ্বিক পুঁজিবাদের অধীনস্থ করার একটি দার্শনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো হিসেবে কাজ করে।

বাংলায় আঠারো শতকের মধ্যভাগে যখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা ঘটছে, ঠিক সেই সময়ে ইউরোপে উদারনৈতিক দর্শন ও রাজনৈতিক অর্থনীতি (Political Economy) একটি কাঠামোবদ্ধ রূপ নিচ্ছিল; অ্যাডাম স্মিথ ও রিকার্ডোর মতো চিন্তকেরা মুক্ত বাজার, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা প্রচার করছিলেন। সামন্তবাদী শাসনে জমিতে বাঁধা পড়া কৃষককে মুক্ত করতে এই দর্শন সেই সময়ের সাপেক্ষে একটি বৈপ্লবিক মতবাদ ছিল।



  • আদিম সঞ্চয়ন (Primitive Accumulation) পুঁজিবাদের ইতিহাসে এমন এক ধাপ, যখন পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করার মতো পরিপক্ব ছিল না। এটি মূলত উৎপাদকদেরকে জোরপূর্বক উৎপাদনের উপকরণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া, যার ফলে তারা মজুরিনির্ভর শ্রমিকে পরিণত হয়। একই সঙ্গে এই প্রক্রিয়া পুঁজিকে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করে, যারা পরবর্তী সময়ে পুঁজিপতি শ্রেণিতে পরিণত হয়।

ছবি: লর্ড কর্নওয়ালিস; চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তক

বাংলায় উদারনীতিবাদ একই প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিয়েছিল, অন্তত যেমনটা বলা হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে ধরা যেতে পারে, যাকে ঔপনিবেশিক মতাদর্শীরা সম্পত্তিমালিকদের একটি অভিজাত শ্রেণি তৈরির পদক্ষেপ হিসেবে উদযাপন করেছিলেন। বাস্তবে এই সংস্কার ভূমিকে পণ্যতে রূপান্তর করে এবং জমিদার শ্রেণিকে ক্ষমতা প্রদান করে, যাদের স্বার্থ পরবর্তীতে জড়িয়ে পড়ে সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যের সাথে। মার্কসের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় পুঁজিবাদের প্রকৃত চালিকাশক্তি ছিল আদিম সঞ্চয়: কৃষকদের জমি থেকে উচ্ছেদ, ভূমির ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার প্রতিষ্ঠা, এবং শ্রমশক্তিকে বৈশ্বিক পুঁজি প্রবাহে যুক্ত করা। বিপরীত দিকে, বাংলায় উপনিবেশের অধীনস্ততা স্বয়ংসম্পূর্ণ পুঁজিবাদী বিকাশে সক্ষম এক বুর্জোয়া শ্রেণির উদ্ভব না ঘটিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে যুক্ত এক মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির সৃষ্টি করেছিল। সুরক্ষিত সম্পত্তি অধিকারের উদার ভাষ্য আড়াল করে রেখেছিল কাঠামোগত বঞ্চনার ছলনাকে, যেখানে কৃষকেরা পড়েছিল বাড়তি খাজনা ও মহাজনের ঋণের চাপে। আর এই শোষণের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে জনসংখ্যার বিরাট অংশ সাফ হয়ে গিয়েছিল দুর্ভিক্ষে।

উনিশ শতকে এসে বাংলায় উদারনীতিবাদ আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাগে বাংলাকে প্রান্তিক অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আদর্শিক হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করেছিল। মুক্ত বাণিজ্য তত্ত্ব ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল বাংলার 

 


  • Guha, Ranajit. A Rule of Property for Bengal: An Essay on the Idea of Permanent Settlement. Paris: Mouton, 1963.
  • Marx, Karl. On Colonialism: Articles from the New York Tribune and Other Writings. New York: International Publishers, 1972.

​

সুপ্রাচীন বস্ত্রশিল্প।ব্রিটিশ শিল্পপতিরা নিজ দেশে শুল্ক সুরক্ষা পেতেন, আর ভারতে আরোপ করা হচ্ছিল তথাকথিত ‘মুক্ত বাণিজ্য’; ফলে সস্তা মেশিনে তৈরি কাপড় বন্যার মতো উপনিবেশে ঢুকে পড়ে। যন্ত্রচালিত শিল্পবিপ্লব চালিত হতে গেলে যে ধরনের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দরকার পড়ে, উপনিবেশের অধীনে থাকা বাংলায় তা পাওয়ার তেমন কোনও সম্ভাবনা বা সুযোগই থাকেনি। শুল্ক ব্যবস্থার সাথে সাথে ব্যবসায়িক পরিস্থির সার্বিক অনিশ্চিত অবস্থা দেশীয় শিল্প পুঁজিকে ধাবিত করে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জমিদারী এস্টেটে বিনিয়োগে।

বাংলার অর্থনীতিতে যখন শুল্ক, রেলপথ বা অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন চলেছে, একই সময়ে এই ঔপনিবেশিক কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি দার্শনিক কাঠামোও বিস্তার লাভ করেছিল। নতুন এই কাঠামোর আত্মপ্রকাশকে সচরাচর ইউরোপীয় রেনেসাঁর সাথে মিলিয়ে বঙ্গীয় নবজাগরণ বা বেঙ্গল রেনেসাঁ বলা হয়ে থাকে। তবে, এই নবজাগরণ স্বভাবতই বাংলা সমাজের অভ্যন্তরীণ বা স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ ছিল না (যেমনটা ইউরোপের ক্ষেত্রে দেখা যায়)। এটি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক প্রকার সংস্কারমূলক প্রকল্প। সামাজিক চিন্তায় যে অগ্রগতির কথা বলা হয়, সেগুলো এমন প্রতিষ্ঠান ও কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়েছিল, যেগুলোর উদ্দেশ্য ছিল শোষণের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে অক্ষত রেখে উপনিবেশকে আধুনিকতার সীমিত রূপে সাজানোর সামাজিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া একটি রূপান্তরমুখী দেশীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণি সৃষ্টি করেনি। এই সংস্কার গড়ে তুলেছিল এক ধরনের জমিদার, অভিজাত ও বেতনভোগী দালাল শ্রেণি, যারা উদার রাজনৈতিক চিন্তার কিছু অংশ আত্মস্থ করেছিলেন এবং যাদের ক্ষমতা টিকে ছিল জমিদারি আয়, আমলাতান্ত্রিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতি সহযোগিতার ওপর। ফলে নবজাগরণ ছিল একদিকে বৌদ্ধিক বিকাশের মুহূর্ত, আর অন্যদিকে ঔপনিবেশিক শ্রেণি-প্রভুত্ব ও বৈষম্য পুনরুৎপাদনের মাধ্যম। তারা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ও বাংলার সমাজের মধ্যবর্তী সেতু হয়ে ওঠেন; তাদের অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের দাবিও কাঠামোগতভাবে থেকে গিয়েছে ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল। তবুও, উনিশ শতকের শেষভাগে বাঙালি মধ্যবিত্তের কিছু অংশ এই আদর্শকে ব্যবহার করে ঔপনিবেশিক শাসনের সমালোচনা শুরু করে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশী আন্দোলন দেখায় কীভাবে উদার জাতীয়তাবাদ গণ-প্রতিরোধে রূপ নিতে পারে। তারপরও, এই জাতীয়তাবাদ সীমাবদ্ধই রয়ে গিয়েছিল। ভদ্রলোক জাতীয়তাবাদীরা রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি তুললেও কৃষক বা শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর কাঠামোগত শোষণ বা ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদকে প্রত্যাখ্যান করতে এগোয়নি। ফলে উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদ সমাজের কিছু অংশকে সক্রিয় করলেও, প্রায়ই বিচ্ছিন্ন ছিল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী থেকে। অন্যদিকে, বাংলার কৃষক, কারিগর, কৃষি শ্রমিকের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বিপুলায়তন জনগোষ্ঠী উদারনৈতিক বক্তব্যের আওতার বাইরে রয়ে গেল।



  • Bairoch, Paul. The Economic Development of the Third World since 1900. London: Methuen, 1975; Bagchi, Amiya Kumar. The Political Economy of Underdevelopment. Cambridge: Cambridge University Press, 1982; Sen, Binayak. “Industrial Entrepreneurship.” In History of Bangladesh, 1704–1971, Volume II: Economic History, edited by Sirajul Islam. Dhaka: Asiatic Society of Bangladesh, 1992.​
  • Marx, Karl. On Colonialism: Articles from the New York Tribune and Other Writings. New York: International Publishers, 1972; Sen, Binayak. “Industrial Entrepreneurship.” In History of Bangladesh, 1704–1971, Volume II: Economic History, edited by Sirajul Islam. Dhaka: Asiatic Society of Bangladesh, 1992
  • Razzaq, Abdur. Political Parties in India. Dhaka: The University Press Limited, 2022; Chatterji, Joya. Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932–1947. Cambridge: Cambridge University Press, 1994; van Bijlert, Victor A. Vedantic Hinduism in Colonial Bengal: Reformed

​

ঔপনিবেশিক উদারনীতিবাদের সবচেয়ে বিধ্বংসী পরিণতিগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে, যেখানে প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষ মারা যায়। অমর্ত্য সেন তার আলোচনায় দেখিয়েছেন, এই দুর্ভিক্ষ খাদ্যের অভাবে নয়, বরং ঔপনিবেশিক বাজারব্যবস্থা থেকেই উৎপন্ন হয়েছিল। যুদ্ধকালীন মুদ্রাস্ফীতি, মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট এবং উদারনীতিবাদ একসাথে মিলে কার্যকর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপকে অসম্ভব করে তোলে। এই দুর্ভিক্ষ ঔপনিবেশিক উদারনীতিবাদের দার্শনিক বৈপরীত্যকে উন্মোচন করে, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে মরলেও বাজারকে ছুঁয়ে দেখা যাবে না। মার্কসের যে অন্তর্দৃষ্টি ছিল, “পুঁজিবাদ একদিকে বিশাল সঞ্চয় এবং অপরদিকে গভীর নিঃস্বতা তৈরি করে”, তার মর্মান্তিক সত্যতা এই দুর্ভিক্ষে প্রমাণিত হয়।

ছবি: ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আঁকা ‘দুর্ভিক্ষের রেখাচিত্র’ সিরিজের একটি ছবি, যেখানে কাক ও মানুষ ডাস্টবিনে একত্রে খাবার খাচ্ছে

দুই শতকের দীর্ঘ শোষণের পরে উপমহাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সাম্রাজ্য ও মুক্তিকামী জনতার বিরোধকে ছাপিয়ে ওঠে জনতার আভ্যন্তরীণ শ্রেণিবিরোধ। এই বিরোধে সাম্রাজ্য ও তার অধীনস্ত অভিজাত শ্রেণিটির লক্ষ্য ছিল অভিন্ন—বৈদেশিক নির্ভরতা ও শোষণমূলক কাঠামো স্বাধীনতার পরেও বজায় রাখা। এতে করে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে লেগে যায় ভ্রাতৃহত্যার রক্ত ও স্বাধীনতা পর্যবসিত হয় একটি সমঝোতায়। ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর, 



Hinduism and Western Protestantism. Abingdon & New York: Routledge, 2020; Sarkar, Susobhan Chandra. On the Bengal Renaissance. Papyrus, 1979.

  • Sen, Amartya. Poverty and Famines: An Essay on Entitlement and Deprivation. Oxford: Clarendon Press, 1981.

​

উপনিবেশোত্তর (Post-colonial) রাষ্ট্রগুলো (বাংলাদেশ ও তার আগে পূর্ব পাকিস্তান) ঔপনিবেশিক উদারনৈতিক কাঠামো থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারেনি। আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণ, ব্যক্তিমালিকানার আধিপত্য, এবং রপ্তানিনির্ভর কৃষি অপরিবর্তিত থেকেছে। তদুপরি, যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি একসময় উদারনীতিবাদের ভাষায় সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনা করেছিল, তারাই দ্রুত উপনিবেশোত্তর পুঁজিবাদের ব্যবস্থাপক হয়ে ওঠে। গ্রামের দরিদ্র জনগণের জন্য ঔপনিবেশিক উদারনীতিবাদের যে কাঠামোগত বাস্তবতা ছিল, তা নতুন রূপে অব্যাহত থাকে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ঔপনিবেশিক শাসনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলেও, সাম্রাজ্যকেন্দ্র ও প্রাক্তন উপনিবেশগুলোর মধ্যকার কাঠামোগত সম্পর্ক বিলীন না হয়ে আধিপত্যের ধরন বদলে যায়। সরাসরি রাজনৈতিক শাসন থেকে সরে এসে অর্থনৈতিক, মতাদর্শিক ও ভূ-রাজনৈতিক পদ্ধতির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার চলমান থাকে। কেন্দ্র ও প্রান্তিক দেশে বিভাজিত বৈশ্বিক পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যে উপনিবেশোত্তর বাংলা (পূর্ব পাকিস্তান, অতঃপর বাংলাদেশ) বৈশ্বিক এমন এক ব্যবস্থার অংশ রয়ে যায়, যা শোষণ (Extraction), নির্ভরতা এবং বৈষম্যমূলক বিনিময়ের (Unequal Exchange) ধারা পুনরুৎপাদন করে। নয়া-উপনিবেশবাদ (Neo-colonialism) ঔপনিবেশিক উদারনীতিবাদের ধারাবাহিকতাই রক্ষা করে, তবে আরও জটিল বাজারব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং শ্রেণিজোটের মাধ্যমে। নির্ভরতার তত্ত্ব (Dependency Theory) অনুসারে পুঁজিবাদ অসমভাবে বিকাশ লাভ করে, যেখানে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রগুলো প্রান্তিক অঞ্চলকে পদ্ধতিগতভাবে অস্বচ্ছল রেখে উদ্বৃত্ত শোষণ করে। বৈশ্বিক পুঁজিবাদের বিস্তার যেভাবে ‘উপনিবেশ থেকে সম্পদ নিঃসরণ’-এর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, সেভাবেই উপনিবেশোত্তর যুগেও এই শোষণ নতুন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। উপনিবেশোত্তর অঞ্চলগুলি পণ্য রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল, মূল্যবান প্রস্তুত পণ্য আমদানিনির্ভর এবং উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক পুঁজির উপর নির্ভরশীলই রয়ে যায়। বৈশ্বিক বাজারের বিনিময় শর্ত উপনিবেশোত্তর অর্থনীতিগুলোর বিরুদ্ধে কাজ করে, তাদের নিম্ন মূল্যের উৎপাদনে আটকে রাখে।

নয়া-ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ সামরিক জোট, কৌশলগত সাহায্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যমেও কার্যকর হয়। সামরিক সহায়তা, অস্ত্রচুক্তি এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব প্রান্তিক রাষ্ট্রগুলোকে কেন্দ্রের ভূ-রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে। এর ফলে উন্নয়ন সামরিকীকরণে পরিণত হয়, যেখানে জনগণের কল্যাণের চেয়ে নিরাপত্তা প্রাধান্য পায়।


  • Alavi, Hamza. Social Forces and Ideology in the Making of Pakistan. Edited by Ravinder Kumar. Karachi: Oxford University Press, 2002.
  • Frank, Andre Gunder. Dependent Accumulation and Underdevelopment. London: The Macmillan Press Ltd., 1978; Amin, Samir. Unequal Development. Sussex: The Harvester Press Limited, 1976.
  • হামজা আলাভি তার আলোচনায় দেখান কীভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে পাকিস্তান একটি নির্ভরশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়। আর আয়েশা সিদ্দিকা দেখান, রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতা ব্যবহার করে কীভাবে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি গণতন্ত্রের ভিত্তিতে না দাঁড়িয়ে একটি মিলিটারি ব্যুরোক্রেসিতে পরিণত হয়। বিস্তারিত দেখুন: Alavi, Hamza. “The State in Post-Colonial Societies: Pakistan and Bangladesh.” New Left Review I/74 (1972): 59–81; Alavi, Hamza. “The Rural Elite and Agricultural Development in Pakistan.” In Peasants and Classes: A Study in Differentiation in a Pakistani Village, edited by Hamza Alavi, 1–43. Lahore: Vanguard, 1976; Alavi, Hamza. “The Post-Colonial State: Pakistan and Bangladesh.” In The Socialist Register 1972, edited by Ralph Miliband and John Saville, 144–170. London: Merlin Press, 1972; Siddiqa, Ayesha. Military Inc.: Inside Pakistan’s Military Economy (Karachi: Oxford University Press, 2007), 58–82.

​

নয়া-ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ সামরিক জোট, কৌশলগত সাহায্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যমেও কার্যকর হয়। সামরিক সহায়তা, অস্ত্রচুক্তি এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব প্রান্তিক রাষ্ট্রগুলোকে কেন্দ্রের ভূ-রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে। এর ফলে উন্নয়ন সামরিকীকরণে পরিণত হয়, যেখানে জনগণের কল্যাণের চেয়ে নিরাপত্তা প্রাধান্য পায়। নয়া-ঔপনিবেশিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে দেশীয় মিত্রের প্রয়োজন হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় শিল্পপতি, আমলা ও মধ্যবিত্ত পেশাজীবী দিয়ে গঠিত একটি লুম্পেন বুর্জোয়া শ্রেণি এক্ষেত্রে বৈশ্বিক পুঁজির দালাল হিসেবে কাজ করে। ঔপনিবেশিক ভদ্রলোক শ্রেণির মতো এই শ্রেণি জাতীয় উন্নয়নগত স্বায়ত্তশাসনের চেয়ে বহিরাগত স্বার্থের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম বলে মনে করে। ভূমি বৈষম্য, গ্রামীণ ঋণ-নির্ভরতা, দুর্বল শিল্পভিত্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক কাঠামো—এসব উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রগুলো দ্রুতই নতুন বৈশ্বিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তান ও পরবর্তীতে বাংলাদেশ হয়ে ওঠে নয়া-ঔপনিবেশিক নির্ভরতার প্রতীক, যার ভিত্তি সাহায্যনির্ভর অর্থনীতি, দুর্বল শিল্পায়ন, নিম্নদক্ষ রপ্তানির ওপর নির্ভরতা এবং এনজিওর বিরাট প্রভাব। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা রাষ্ট্রের রাজস্ব ও রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনকে সীমিত করে ফেলে।

তবে, এতকিছুর পরেও, উদারনীতিবাদ আবশ্যিকভাবেই নেতিবাচক কোন উন্নয়ন কৌশল নয়। কথাটি এই অর্থে বলা যে, আধুনিক সময়ে এসে বহির্বিশ্বের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার সুযোগ নেই। বাণিজ্য তো বটেই, জ্ঞান ও প্রযুক্তি বা জনগণের পারস্পারিক সহমর্মিতা ক্রমশই দেশীয় সীমানা ছাড়িয়েছে। সেক্ষেত্রে একটা উপনিবেশোত্তর দেশের আসলে স্মরণে রাখা দরকার, কীভাবে ইউরোপে কার্যকর স্মিথের ‘অদৃশ্য হাত’ বাংলার মুখে একটা ‘অদৃশ্য মুষ্ঠি’ হয়ে নেমে এসেছিল। অর্থাৎ নৈতিক ও উদারনৈতিক অর্থনীতির ভিত্তি হবে একটা স্বাধীন দেশের সাথে আরেকটা স্বাধীন দেশের পারস্পারিক আদানপ্রদান, যে সম্ভাবনা বাংলাদেশে তৈরি হয়েছিল একাত্তরে।

২. 

পূর্ববর্তী আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, বাংলাদেশসহ অন্যান্য প্রান্তিক দেশগুলোর অনুন্নয়ন বৈশ্বিক পুঁজিবাদের কেন্দ্রস্থিত রাষ্ট্রগুলোর পুঁজিসঞ্চয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে কাঠামোগতভাবে যুক্ত একটি ঐতিহাসিক পরিণতি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই কাঠামোগত দুর্বলতা বা সামর্থ্যহীনতা একটি দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শোষণ, পাকিস্তানি আমলে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক বৈষম্য এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়ার পরিণতি। আনুষ্ঠানিক ঔপনিবেশিক শাসন থেকে আইনগত স্বাধীনতায় উত্তরণ বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অধস্তন অবস্থানকে বিলোপ না করে কাঠামোগত অধীনতাকে পুনরুৎপাদনের নতুন পদ্ধতি তৈরি করেছে।

সাম্রাজ্যগুলির জন্য উপনিবেশ থেকে সম্পদ শোষণ যেমন আবশ্যিক ছিল, উপনিবেশগুলি আইনি স্বাধীনতা পাবার মধ্য দিয়ে সে প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায়নি। লেনিনের যুক্তি অনুসারে, অনুন্নত অঞ্চলে পশ্চিমা পুঁজির বিস্তার পুঁজিবাদের পরিণত পর্যায়ে পৌঁছানোর সাথে সাথে এটি একটি কাঠামোগত প্রয়োজনীয়তায় পরিণত হয়। লেনিনের বিশ্লেষণের কেন্দ্রে ছিল উন্নত দেশগুলোতে সঞ্চিত অতিরিক্ত পুঁজি। একচেটিয়া করপোরেশনগুলো উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজার থেকে সরিয়ে দিলে অভ্যন্তরীণ বাজার ক্রমশ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে এবং মুনাফার হার হ্রাস পায়। তুলনামূলক উচ্চ মজুরি, নিয়ন্ত্রিত শ্রম-সম্পর্ক ও সীমিত অভ্যন্তরীণ চাহিদা দেশে আরো লাভজনক বিনিয়োগকে কঠিন করে তোলে। ফলে পুঁজি এমনসব অনুন্নত অঞ্চলে প্রবাহিত হয় যেখানে শ্রম সস্তা, প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ আছে এবং নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ কম, কেননা এই শর্তগুলি ঐসব অঞ্চলকে স্বাভাবিকভাবে উচ্চ মুনাফার ক্ষেত্র করে তোলে। সাম্রাজ্যবাদ ক্রমবর্ধমানভাবে 


  • ​Fanon, Frantz. The Wretched of the Earth. Translated by Constance Farrington. New York: Grove Press, 1963.
  • লুম্পেন এই অর্থে যে, এরা আদতে নিজেদের সৃষ্টিশীলতা থেকে ধনী হয়নি, বরং রাষ্ট্রীয় সুবিধা নিয়ে সরাসরি লুটপাটের মধ্য দিয়ে সম্পদ আহরণ করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই টাকায় সম্পদের পাহাড় গড়া ধনীদের কথা।

শিল্পোৎপাদনের জন্য অপরিহার্য এসব অঞ্চলে কাঁচামালের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এভাবেই উপনিবেশোত্তর সময়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার খনি ও বিভিন্ন শিল্পের ওপর দখল পশ্চিমা দেশগুলোর শিল্পায়নের জন্য কাঁচামালের ধারাবাহিক ও একচেটিয়া যোগান নিশ্চিত করে। এভাবে বিদেশে বিনিয়োগ আর্থিক লেনদেনের সাথে সাথে, বৈশ্বিক সম্পদ প্রবাহকে কেন্দ্রস্থিত দেশের শিল্পের স্বার্থে পুনর্গঠনের একটি উপায় হয়ে ওঠে। এছাড়া, বৈশ্বিক পুঁজির বিস্তার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গেও অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। বিদেশে বিনিয়োগ প্রভাববলয় সৃষ্টি করে, যার সুরক্ষায় সামরিক সম্প্রসারণ, উপনিবেশ দখলের প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রশক্তি প্রদর্শনের প্রয়োজন হয়। এই গতিশীলতা পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও আন্তঃরাষ্ট্রিক সংঘাতকে একত্রে বেঁধে ফেলে, যার চূড়ান্ত প্রতিফলন ছিল বিশ্বের পুনঃবিভাজনকে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মধ্যে সংঘটিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

সাম্রাজ্যবাদ থেকে আসা নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে গিয়ে একটা আত্মনির্ভর অর্থনীতি তৈরি করতে প্রথমেই আসলে স্বীকার করে নিতে হয়, কেবলমাত্র পশ্চিমের পুঁজিবাদের ইতিহাসের অনুসরণ আবশ্যিক গতিপথ নয়। বরং সামির আমিন যেমন বলেন, ‘নির্ভরতা থেকে বিযুক্ততা’ (Delinking) দরকার। কেননা ইতিপূর্বে দেখানো হয়েছে, উপনিবেশ কেবল অর্থনৈতিক কাঠামোই তৈরি করেনি, দাসত্বের একটা মানসিক কাঠামোও তৈরি করেছে। সেই কাঠামো থেকে বিযুক্ত না হতে পেরে উপনিবেশোত্তর দেশের মধ্যবিত্ত পূর্বতন প্রভুদেরই অনুসরণ করে—ফানোঁ যাকে ‘কালো’ মানুষের অন্তরের গভীরতর বাসনায় ‘সাদা’ হয়ে ওঠার চেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে নানান রকমের বিযুক্ততার পথ অনুসন্ধান ও প্রয়োগ নতুন স্বাধীন হওয়া দেশগুলিতে দেখা গিয়েছে। তার মধ্যে একটি প্রভাবশালী পদ্ধতি ছিল দক্ষিণ এশীয় উন্নয়ন মডেল। প্রথম প্রজন্মের এই উন্নয়ন মডেলে দ্রুত কৃষি নির্ভরতা থেকে শিল্পায়ন ঘটানোর জন্য রাষ্ট্রকে মুখ্য পরিচালকের ভূমিকায় রাখা হয়েছিল। ঔপনিবেশিকতার রেশ থেকে ছেদ ঘটানোর লক্ষ্যে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই বাংলাদেশ এক স্বতন্ত্র, স্থানীয়ভাবে রাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন এরকম একটি শিল্পায়ন মডেল গ্রহণ করে, যা মুক্তিযুদ্ধের অন্তর্নিহিত উন্নয়নচিন্তা ও আত্মনির্ভরতার আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করত। পাকিস্তান আমল থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জাতীয়কৃত পাটকল, চিনিকল এবং প্রাথমিক উৎপাদনশিল্পগুলোকে রাষ্ট্র-নির্দেশিত পুনর্গঠনের বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এক্ষেত্রে লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভরতা, যুক্তিসঙ্গত প্রবৃদ্ধি এবং জাতীয় উন্নয়নের জন্য উৎপাদনশীল শক্তির সংগঠিত ব্যবহার। কিন্তু এই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কৌশলের বাস্তবায়ন কঠিন কাঠামোগত বাধার সম্মুখীন হয়। নতুন রাষ্ট্রটি তীব্র প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি, প্রশিক্ষিত ব্যবস্থাপনা কর্মীর অভাব, এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতায় ভুগছিল, যা পাকিস্তানকর্তৃক পূর্ববাংলাকে পরিকল্পিতভাবে অনুন্নত অবস্থায় রেখে যাওয়ার ফল ছিল। এই প্রশাসনিক শূন্যতার মধ্যেই সক্রিয় হয়ে ওঠে উদীয়মান লুম্পেন বুর্জোয়া শ্রেণি। ফলে সদিচ্ছাপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগগুলোও দক্ষতার অভাব, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এবং সাংগঠনিক দুর্বলতায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলো বহিরাগত চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।


  • ​Lenin, V. I. Imperialism, the Highest Stage of Capitalism. Peking: Foreign Languages Press, 1972.
  • Amin, Samir. Delinking: Towards a Polycentric World. London: Zed Books, 1990.
  • Fanon, Frantz. Black Skin, White Mask. Translated by Charles Lam Markmann. London: Penguin Books, 2008.
  • Sahota, Gian S., Mahfuzul Huq, Niaz Hossain, and Kalyan K. Sanyal. “South Asian Development Model and Productivity in Bangladesh.” The Bangladesh Development Studies 19, no. 1/2 (1991): 51–87.
  • Islam, Muinul. Role of State in Bangladesh’s Underdevelopment. Dhaka: The University Press Limited, 2020; Islam, Nurul. Economist’s Tale: Making of a Nation Bangladesh. Dhaka: The University Press Limited, 2003.

এধরণের বিযুক্ততার জন্য একটি বিপ্লবী শ্রেণির শাসক দরকার হয়, যারা জনতার পক্ষে দাঁড়িয়ে উপনিবেশের রেশ কাটাতে বৈপ্লবিক প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণি ক্ষমতায় উত্তীর্ণ হয়ে মেকি জাতীয়তাবাদ অথবা ধর্মীয় মনোভাবে শোষণের ছলাকলা ঢেকে রেখেছে। ফানোঁ যেভাবে বলেছেন, উপনিবেশের প্রস্থানে তাদের শূন্যতা পূরণে সক্রিয় হয় দেশীয় লুম্পেন বুর্জোয়ারা, যাদের ঐ মাপের দক্ষতা বা যোগ্যতা নেই। একইসাথে তাদের নেই কোনও বৈপ্লবিক অনুপ্রেরণাও। ফলত, তারা আবার শরণাপন্ন হয় তাদের পুরনো প্রভুদের। রাজস্ব অস্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক পণ্যমূল্যের ধাক্কা আর দীর্ঘস্থায়ী বৈদেশিক লেনদেন ঘাটতির মতো দুর্বলতাগুলোকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগিয়ে সত্তরের দশকের শেষভাগে আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠী নতুন অর্থনৈতিক কর্মসূচি সামনে আনে। কাঠামোগত সংস্কারের প্রকল্পে বাংলাদেশকে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের বেসরকারীকরণ, ভর্তুকি হ্রাস, বাণিজ্য উদারীকরণ, এবং অভ্যন্তরীণ বাজার গঠনের পরিবর্তে রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির দিকে উন্নয়ন কৌশল পুনঃসংগঠনের জন্য চাপ দেওয়া হয়। নিরপেক্ষ কৌশলগত সংস্কার হিসেবে উপস্থাপিত হলেও এসব পদক্ষেপ দেশের শিল্প-অগ্রাধিকারকে পুনর্গঠিত করে, স্বাধীনতা-উত্তর দেশীয় উন্নয়ন প্রকল্প থেকে দাতা-নির্দেশিত নব্য-উদারনীতিবাদী (Neo-liberal) ব্যবস্থার দিকে একটি নির্ধারণমূলক মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

লুম্পেন এই শ্রেণিটির পরবর্তী পাঁচ দশকের গতিপথ থেকে দেখা যায়, তাদের বিপুলায়তন সম্পদের উৎস ব্যবসা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যবহার করে বা ব্যাংক থেকে ঋণের টাকা আত্মসাৎ করে গড়ে ওঠা পুঁজি। আবার এই কাঠামো চালানোর মতো স্বাধীন গণতান্ত্রিক ভিত্তিও তার ছিল না, ফলত সে মুখাপেক্ষি থেকেছে সাম্রাজ্যবাদের। সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকে অনুন্নত ও ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পিত ও চাপিয়ে দেওয়া নীতিমালার একটি ছিল ‘স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’ (SAP)। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন পরামর্শের ভাষায় প্রণীত SAP এই প্রকল্প গ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলোকে বাণিজ্য উদারীকরণ, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বেসরকারীকরণ, ভর্তুকি হ্রাস, রাজস্ব কৃচ্ছ্রসাধন, এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন পুনর্গঠনের মতো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।



  • Fanon, Frantz. The Wretched of the Earth. Translated by Constance Farrington. New York: Grove Press, 1963.
  • Humphrey, Clare E. Privatization in Bangladesh: Economic Transition in a Poor Country. Boulder, CO: Westview Press, 1990.

সত্তরের দশকের শেষভাগ এবং আশির দশকের শুরুতে বাংলাদেশ ধারাবাহিক বৈদেশিক লেনদেন সংকট, নিম্ন অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় এবং স্থায়ী বাজেট ঘাটতির মুখে পড়ে। স্বাধীনতা-উত্তর রাষ্ট্রায়ত্তকরণ ও রাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন উন্নয়নপ্রয়াসগুলো দাতা ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চোখে ক্রমশ অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। তারা দেশের সমস্যাগুলোকে রাষ্ট্রীয় ‘অদক্ষতা’ ও অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করতে থাকে। এই ব্যাখ্যা কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অসম বিনিময় ও প্রযুক্তিগত নির্ভরতা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিয়ে যায় এবং দোষ চাপায় রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও হস্তক্ষেপের ওপর।

বিশ্বব্যাপী নব্য-উদারনীতিবাদের উত্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে যে নীতিসমূহ প্রস্তাব করে, তা ছিল এক পরিচিত প্যাকেজ: বাণিজ্য উদারীকরণ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বেসরকারীকরণ, আর্থিক খাতের উদারীকরণ, রাজস্ব মিতব্যয়ীতা (Fiscal Austerity) এবং ভর্তুকি কমানো। এসব নীতি ধারাবাহিক ঋণচুক্তির সঙ্গে সংযুক্ত ছিল, ফলে বৈদেশিক মুদ্রা ও উন্নয়ন অর্থায়নে প্রবেশাধিকার নির্ভর করছিল এসব শর্ত মেনে চলার উপর। বাংলাদেশের কাঠামোগত সমন্বয়ের অন্যতম কেন্দ্রীয় স্তম্ভ ছিল বাণিজ্য উদারীকরণ এবং রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধি কৌশলকে অগ্রাধিকার দেওয়া। এর ফলে শুল্কধারাগুলো ধীরে ধীরে কমানো হয়, পরিমাণগত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়, এবং আমদানি-প্রতিস্থাপন নীতির বিপরীত পথ নেওয়া হয়।

SAP-এর সংস্কারগুলোকে কৌশলগত ও নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক সংস্কার হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, এগুলো বাস্তবে ছিল বৈদেশিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উপায়। এখানে, ঋণের শর্তের মাধ্যমে চাপ দিয়ে জাতীয় নীতি কাঠামো গঠিত হয়। এই পরামর্শভিত্তিক হস্তক্ষেপ স্বদেশীয় উন্নয়ন কৌশলকে দুর্বল করে এবং সামাজিক বা উন্নয়নমূলক লক্ষ্যের চেয়ে বাজারকেন্দ্রিক অগ্রাধিকার চাপিয়ে রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে ক্ষয় করে। নির্ভরতা তত্ত্ব অনুসারে, SAP অনুন্নত দেশগুলোকে বৈশ্বিক পুঁজিবাদী সঞ্চালনে অসম শর্তে আরও গভীরভাবে একীভূত করে, ফলে এমন একটি নির্ভরতার চক্র সৃষ্টি হয়, যেখানে এসব দেশ বিদেশী পুঁজি ও অস্থির রপ্তানিবাজারের ওপর কাঠামোগতভাবে নির্ভরশীল থাকে।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ ছিল পাট খাত। একসময় পূর্ব পাকিস্তানের রপ্তানি অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত পাট বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও সিনথেটিক পণ্যের বিস্তারে চাহিদাহ্রাসের মুখে পড়ে। কৌশলগত পুনর্গঠন বা প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের বদলে SAP রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়, ফলে পাট খাত বৈশ্বিক মূল্যচাপের মুখে পড়ে এবং বিনিয়োগ ছাড়াই ‘বাণিজ্যিকভাবে’ টিকে থাকতে বাধ্য হয়। বেসরকারীকরণ প্রায়ই পুনরুজ্জীবনের বদলে সম্পদ-লুণ্ঠনের কৌশলে পরিণত হয় এবং বাণিজ্য উদারীকরণের ফলে সিনথেটিক বিকল্প ও আমদানিকৃত পণ্য এমনকি দেশীয় বাজারেও পাটপণ্যকে প্রতিস্থাপন করতে থাকে। বেসরকারিকরণের প্রতিক্রিয়ায় পূর্বতন নীতিমালার কোনোরকম সমালোচনা বা পর্যালোচনা ছাড়াই গণহারে বেসরকারিকরণ চলে। এমনকি যেসব ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি বা দক্ষতার অভাবের কারণে লাভজনক খাতের প্রতিষ্ঠান ভালো করতে পারছিল না, তাদেরকে লাভজনক করার কোন পরিকল্পনা ছাড়াই ব্যক্তি মালিকানায় দিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে ঐসব প্রতিষ্ঠান ঘুরে না দাঁড়িয়ে সম্পদ লুণ্ঠনের ক্ষেত্র হয়ে যায়। ফলে, পুনরুদ্ধারযোগ্য পাটশিল্প, যা বর্তমানে বৈশ্বিক পরিবেশগত সচেতনতার প্রেক্ষিতে একটি সম্ভাবনাময় খাত হতে পারতো, নীতিগত অবহেলা ও ভুল পথে পরিচালনার মাধ্যম একে দীর্ঘমেয়াদী পতনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

চিনি খাতের পরিণতিও একই রকম ছিল। বাংলাদেশের চিনিকলগুলো বহুদিন ধরে গ্রামীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখে স্থিতিশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু SAP-চালিত উদারীকরণ দেশীয় বাজারকে ব্রাজিল ও ভারতের মতো দেশ থেকে আমদানিকৃত সস্তা চিনি দিয়ে পূর্ণ করে দেয়, অপরদিকে আখ উন্নয়ন ও মিল আধুনিকায়নে সরকারি বিনিয়োগ শুকিয়ে যায়।


  • Humphrey, Clare E. Privatization in Bangladesh: Economic Transition in a Poor Country. Boulder, CO: Westview Press, 1990; কল্লোল মোস্তফা, বাংলাদেশের উন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতি, ঢাকা: সংহতি, ২০২১।

ভর্তুকি প্রত্যাহার করে এবং সুরক্ষা কমিয়ে দিয়ে, নিজস্ব দক্ষতার ঘাটতি পরিপূরণের প্রকল্প গ্রহণের বদলে নীতিগতভাবে তাদের পরিত্যাগ করার কারণে দেশীয় মিলগুলো ধ্বংস হয়। ২০০০-এর দশকে এসে, একটি কার্যকর আখ-ভিত্তিক শিল্পব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত চিনি-নির্ভর হয়ে পড়ে, ফলে একটি টিকে থাকার মতো খাত বহিরাগত নির্দেশনার বলি হয়ে যায়।

স্থানীয় শিল্পখাত দুর্বল হয়ে পড়ার সময়কালে রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির SAP-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় পোশাক খাতে দ্রুত উত্থান ঘটে। তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) জন্য স্থায়ী মূলধনের প্রয়োজন কম ছিল, প্রচুর নিম্ন মজুরির নারীশ্রমের ওপর নির্ভর করা যেত, এবং মাল্টি-ফাইবার অ্যারেঞ্জমেন্ট (Multi-Fiber Arrangement)-এর কারণে বৈশ্বিক চাহিদাও শক্তিশালী ছিল। বাণিজ্য উদারীকরণ টেক্সটাইল, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণের শুল্কমুক্ত আমদানি অনুমোদন করে এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (EPZ) শ্রমিক সংগঠন থেকে সুরক্ষিত উৎপাদনক্ষেত্র সৃষ্টি করে। পাট বা চিনি খাতে যে উদাসীনতা দেখা গিয়েছিল, তার বিপরীতে তৈরি পোশাক খাতে দেয়া হয় কর ছাড়, লজিস্টিক সহায়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন। এই বৈষম্য ছিল কাঠামোগত: SAP ভারী শিল্প বা কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা নিরুৎসাহিত করলেও শ্রমনির্ভর খাতে বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে একীভূতকরণকে উৎসাহিত করেছিল।

এই পুনর্বিন্যাস বাংলাদেশের রপ্তানি পোর্টফোলিওকে অত্যন্ত সংকুচিত করে ফেলে। একসময় পাট, চা, চামড়া, চিনি, মৌলিক উৎপাদনশিল্পসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি ২০০০-এর দশকের শুরুতে এসে মোট রপ্তানির ৭৫ শতাংশেরও বেশি তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা বর্তমানে ৮০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। উচ্চ মূল্য-সংযোজিত শিল্পে বহুমুখীকরণ বা টেক্সটাইল ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’ গড়ে তোলার পরিবর্তে বাংলাদেশ একটি একক রপ্তানিখাতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। একইসঙ্গে, তৈরি পোশাক শিল্পের সাফল্যের ফলে আমদানি-নির্ভরতা আরও দৃঢ় হয়—সুতা, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি, কাপড়, এমনকি প্যাকেজিং সামগ্রীও আমদানি করার মাধ্যমে। ফলে রপ্তানি খাত নিজেই বিদেশি উপকরণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, আর দেশীয় ভোক্তা বাজার শুল্ক হ্রাসের ফলে আমদানিকৃত পণ্যের দিকে ধাবিত হয়। দাতা সংস্থাগুলোর প্রচারে তৈরি পোশাক খাতকে সাফল্যের গল্প হিসেবে তুলে ধরা হলেও, নির্ভরতা তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নিম্ন-মজুরি, নিম্ন মূল্য-সংযোজিত বিশেষায়নকে স্থায়ী করে। পোশাক খাত আমদানিকৃত যন্ত্রপাতি, বিদেশি ক্রেতা এবং মূলদেশ-নিয়ন্ত্রিত বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের ওপর নিবিড়ভাবে নির্ভরশীল। এই খাতটি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনে দেশীয় নিয়ন্ত্রণের ওপর ভর না করে  কেবল সস্তাশ্রমের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর ফলে যে ধরনের শিল্পায়ন গড়ে ওঠে তা হলো নির্ভরশীল শিল্পায়ন, যেখানে বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কে একীভূত হলেও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বা বহুমুখীকরণ ঘটে না।

এই রপ্তানি সংকোচন ও আমদানি উদারীকরণের পরিস্থিতি বাংলাদেশকে কার্যত একটি ভোক্তা রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেছে। চিনিকল বন্ধ হয়, পাটকল সংকটে পড়ে, এবং স্টিল রি-রোলিং, হালকা প্রকৌশল ও মৌলিক পণ্যের দেশীয় উৎপাদকরা বিদেশি পণ্যের তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে না। এর পেছনে ভোক্তার পছন্দ যতোটা না ক্রিয়া করেছে, তার চাইতে বেশি নীতিগত কাঠামোর ফলে দেশীয় উৎপাদন প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠাই দায়ী। দেশের ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন চালিত হয় আমদানিনির্ভর ভোগ ও উৎপাদন দ্বারা, যার কেন্দ্রে থেকেছে রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাকশিল্প খাতের সংকীর্ণ আয়, যা সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে পারে নি।

এখানে লক্ষণীয় ব্যাপার হল, রাষ্ট্র অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে যায়নি। তার বিপরীতে, বৈশ্বিক পুঁজির পছন্দনীয় খাতগুলোকে বাছাই করে সমর্থন দিয়েছে। এই পুনর্গঠনের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে গ্রামীণ উৎপাদন ও দেশীয় মূল্যশৃঙ্খলার মেরুদণ্ড কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (CMSME) খাত এগিয়ে যেতে পারেনি, কেননা এটি সুরক্ষামূলক নীতি বা প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা—কোনোটিই পায়নি। শুল্ক ও অন্যান্য সুরক্ষা কমিয়ে দেওয়ায় দেশীয় উৎপাদকরা আমদানিকৃত পণ্যের তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে, ফলে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ছাড়া ক্ষুদ্র শিল্পগুলোর টিকে থাকা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। যে জায়গায় বিস্তৃত শিল্প-ইকোসিস্টেম গড়ে উঠতে পারত, সেখানে অপরিকল্পিত উদারীকরণ একটি শূন্যতা তৈরি করে। ফলে বাণিজ্য উদারীকরণ বাংলাদেশকে কম মজুরির শ্রম ও প্রাথমিক বা আধা-প্রক্রিয়াজাত পণ্যের সরবরাহকারী একটি প্রান্তিক অর্থনীতি হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে এবং স্থানীয়ভাবে বহুমুখী শিল্পভিত্তি গড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হয়।

SAP-এর আরেকটি প্রধান নির্দেশনা ছিল আর্থিক খাতের উদারীকরণ। এর অধীনে ছিল সুদের হার মুক্তকরণ, মূলধন প্রবাহের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা, এবং বেসরকারি ও বিদেশি অংশগ্রহণের জন্য ব্যাংকিং খাত খুলে দেওয়া। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয়েছিল দক্ষতা বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ আকর্ষণের উপায়। কিন্তু দুর্বল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর নেটওয়ার্ক, এবং ভঙ্গুর আর্থিক শাসনব্যবস্থার অধীন একটি প্রান্তিক অর্থনীতিতে, এর ফলে জোরদার হয় ঋণঘনত্ব ও মূলধন পাচার। উদারীকৃত আর্থিক শাসনব্যবস্থা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক আর্থিক অস্থিরতার প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তোলে এবং বিচাক্রিক নীতি (Counter-Cyclical) গ্রহণের সক্ষমতা সীমিত করে। SAP রাজস্ব কঠোরতার নির্দেশও দেয়, যার মধ্যে ছিল সরকারি ব্যয় হ্রাস, ভর্তুকি কমানো, এবং সরকারি কর্মসূচির পুনর্গঠন। বাংলাদেশে এর অর্থ দাঁড়ায়: কৃষি উপকরণে এবং খাদ্যবিতরণে ভর্তুকি কমানো, অবকাঠামো ও শিল্পে সরকারি বিনিয়োগ সংকুচিত করা, এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে চাপ বৃদ্ধি।

এই সমন্বয়ের বোঝা বহন করতে হয় মূলত গ্রামীণ দরিদ্র, ক্ষুদ্র কৃষক ও শহুরে শ্রমজীবী শ্রেণিকে। নিত্য প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার সংকোচন একসাথে মিলে আগে থেকে ভঙ্গুর সামাজিক পুনরুৎপাদনের (Social Reproduction) ভিত্তিকে আরও দুর্বল করে তোলে। ১৯৭১ সালের পর থেকে বাংলাদেশের উন্নয়ন পথচলা এক অস্বস্তিকর ত্রিভুজের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। যার একদিকে এক দুর্বল উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্র, একদিকে ক্রমবর্ধমান প্রভাবশালী দাতা ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এবং আরেকদিকে দ্রুত বিস্তৃত হওয়া এনজিও খাত। প্রাথমিক রাষ্ট্রনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি দ্রুতই প্রতিস্থাপিত হয় বাজারমুখী সংস্কারের দ্বারা, যার ফলে পোশাক খাত-নির্ভর রপ্তানি বৃদ্ধি ঘটলেও একই সঙ্গে তৈরি হয় কাঠামোগত দুর্বলতা, দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য ঘাটতি ও আমদানি-নির্ভরতা এবং আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা। এই শূন্যস্থান পূরণে এনজিও বিস্তার লাভ করে, রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক ভূমিকাকে প্রতিস্থাপন করে নানা প্রকল্পভিত্তিক, আধা-বেসরকারি ব্যবস্থায়। এটি আদতে দাতা-চালিত নব্য-উদারনীতিবাদী সংস্কারেরই অংশ, যেখানে জনসেবা প্রদান করা হয় প্রকল্পের মাধ্যমে, আর বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ থাকে গণতান্ত্রিক পরিধির বাইরে।

১৯৭২ সালের পরিকল্পনা কমিশন মিশ্র অর্থনীতি ও সাহায্যের বদলে সার্বভৌমত্বের পক্ষে মত দিয়েছিল, কিন্তু উদারনীতির প্রয়োগের মধ্য দিয়ে নব্বইয়ের দশকে মাইক্রোক্রেডিট হয়ে ওঠে এনজিও খাতের প্রধান প্রযুক্তি। প্রাথমিকভাবে ত্রাণকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠা ব্র্যাক, গ্রামীণ, আশা প্রভৃতি সংগঠন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনি সহায়তা ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে বিস্তার লাভ করে। দাতারা ক্রমবর্ধমান অর্থ তাদের মাধ্যমে প্রবাহিত করে, কারণ এনজিওগুলোকে তারা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও কার্যকর মনে করে। কিন্তু এদের ব্যাপক বিস্তার নাগরিক ও রাষ্ট্রিক সীমানাকে অস্পষ্ট করে, SAP-পরবর্তী লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার মতো সমান্তরাল শাসন কাঠামো তৈরি করে। নারীদের পুঁজিতে প্রবেশাধিকারের প্রসারে এর অবদান থাকলেও, গবেষণা থেকে দেখা যায়, এ ধরনের সংগঠনের অন্যতম প্রধান ফলাফল (অথবা সীমাবদ্ধতা) ছিল—ঋণনির্ভর শৃঙ্খলাবদ্ধতা, উচ্চ কার্যকর সুদহার এবং সীমিত ঊর্ধ্বমুখী গতিশীলতা। মাইক্রোফাইন্যান্স দারিদ্র্যকে পুনর্ব্যাখ্যা করে উদ্যোক্তাবৃত্তির অর্থায়ন-ঘাটতি হিসেবে, যা ভূমি, মজুরি বা শিল্পনীতির প্রশ্ন থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেয়। নির্ভরতা তত্ত্বের ভাষায়, এটি দরিদ্রকে অর্থ-প্রবাহে যুক্ত করে, কিন্তু সম্পত্তি বা বিনিময় সম্পর্ক বদলায় না। রাষ্ট্র-এনজিও সম্পর্ক সহযোগিতা ও দ্বন্দ্বের মধ্যে দোদুল্যমান থেকেছে। সরকার একদিকে এনজিও অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যদিকে দাতা প্রকল্প ও সেবা প্রদানের জন্য তাদের উপর নির্ভরশীল থাকে, যার ফলে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি রাষ্ট্র’, যেখানে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীভূত হলেও গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ সীমিত। সামগ্রিকভাবে, এনজিওগুলো গুরুত্বপূর্ণ সেবার বিস্তৃতি এবং সেবাপ্রদানে নতুনত্ব আনলেও এগুলো  স্থিতিশীল অগ্রগতি নয়, ফলত, প্রান্তিক উন্নয়নের মূল কাঠামো (আমদানি-নির্ভরতা, আর্থিক ভঙ্গুরতা, এবং অসম ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক) অক্ষুণ্ণ থাকে। মাইক্রোক্রেডিটের প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য তার সীমিত কাঠামোগত প্রভাবকে আড়াল করে। নির্ভরতা তত্ত্ব এই ফলাফলকে যথার্থভাবে ব্যাখ্যা করে: এনজিওরা উন্নয়নের সংকট সমাধান করে না, বরং পরিচালনা করে।

কাঠামোগত সংস্কারের মতো সাম্রাজ্যবাদী কলাকৌশল আদতে তিনটি পর্যায়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনে অনুভূত হয়। প্রথম পর্যায়টি হলো, ঋণ দ্বারা অর্থায়িত প্রকল্পগুলো। এমন নয় যে, এসব প্রকল্প থেকে মানুষ কখনও কোনো সুবিধা পায় না। অবশ্যই কিছু দরিদ্র প্রকৃতপক্ষে উপকৃত হয়। কিন্তু মাত্র কয়েকজনের আর্থিক অবস্থার উন্নতি দারিদ্র্য দূর করে না বা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে না। দাতা সংস্থাগুলোর নিজেদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ীই, এ পর্যন্ত তাদের প্রকল্পগুলো সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়নি। আবার জাতীয় নীতির সামগ্রিক দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ‘লিভারেজ’ ব্যবহার করে। এধরণের নিয়ন্ত্রক সংস্থা সরকারের সঙ্গে কাজ করে তাকে প্রগতিশীল নীতি পরিত্যাগ করে কঠোর ব্যয় সংকোচনের প্রোগ্রামের দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য করতে পারে। এর নমুনা দেখা যায় বাংলাদেশে জাতীয়করণের আওতায় আনা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাইকারি হারে বেসরকারিকরণে, যেখানে এই প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে লাভজনক হয়ে উঠবে তার কোন রুপরেখা উপস্থাপন করা হয়নি। দ্বিতীয় পর্যায় হলো, খাতভিত্তিক সংস্কার। উদাহরণস্বরূপ, দেশের যেকোনো অবকাঠামো প্রকল্পে ঋণ দেওয়ার সময় সংস্থাগুলো প্রায়শই আইন ও করনীতিতে পরিবর্তন চায়, যাতে বিদেশি বিনিয়োগ সহজ হয়। অন্যান্য ক্ষেত্রেও অনুরূপ প্রক্রিয়া চলে। যেখানে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণের চেয়ে বিদেশি বিনিয়োগকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, সেখানে সেক্টর ও সমাজে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেতে পারে, যদিও ব্যাংকের নীতি এ ধরনের সম্ভাবনা প্রায়শই বিবেচনা করে না। সবশেষে থাকে দেশের কাঠামোগত শর্তাবলী। অনেক প্রকল্প দরিদ্রদের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে, যা সরাসরি এধরণের সংস্কারের ভুল নয়, বরং সমাজের অভ্যন্তরীণ অসমতা, দুর্নীতি ও অবিচারের ফল। তবুও, এধরণের সংস্কার এখানেও দায়বদ্ধ: অসম বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা বজায় রেখে এবং বিদেশি বিনিয়োগকে প্রাধান্য দিয়ে তারা যখন সরকারকে ঋণ দেয় বা সংস্কার প্রকল্প হাতে নেয়, তখন সেই সংস্কার এমন ব্যবস্থাকে সমর্থন করে যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষে চাপ সৃষ্টি করার পরিবর্তে বরং দারিদ্র্য ও বৈষম্য বজায় রাখে। 

সবমিলিয়ে, একটি অতি দীর্ঘকালীন উদারনীতিবাদের ইতিহাসের প্রেক্ষিত বিবেচনায়, ঔপনিবেশিক যুগ এবং বর্তমান সময়কার কাঠামোগত সংস্কারকে সমান্তরালে রেখে বিবেচনা করলে স্বস্তির জায়গা সীমিত। এখানে এখনও বিবেচনা করা দরকার উপনিবেশের রেশ কাটিয়ে ওঠার মতো স্থানীয় ইতিহাসপ্রসূত উন্নয়নের রূপরেখা।


লেখক পরিচিত: আবিদ নাহার খন্দকার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের স্নাতক। পেশাগতভাবে ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ের সাথে যুক্ত, পাশাপাশি একজন স্বাধীন অর্থনীতি বিশ্লেষক। অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও প্রয়োগ, অর্থনৈতিক ইতিহাস, এবং মার্কসবাদী শ্রেণি বিশ্লেষণের প্রতি আগ্রহী। প্রকাশিত বই: একুশ শতকে পুঁজি (মূল: থমাস পিকেটি; ২০২২, দ্যু প্রকাশনী ও সমাজপাঠ)। বর্তমানে Economic History of Bangladesh শিরোনামের একটি বই প্রকাশনার জন্য পর্যালোচনাধীন রয়েছে। ই-মেইল: abid.cuniv@gmail.com

আবিদ নাহার খন্দকার 27 সেপ্টেম্বর, 2026
Share this post
Sign in to leave a comment